{{ news.section.title }}
প্রধানমন্ত্রী ও লেবার পার্টির নেতা পদ থেকে পদত্যাগ করলেন কিয়ার স্টারমার
অবশেষে জল্পনার অবসান ঘটিয়ে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ও লেবার পার্টির নেতা কিয়ার স্টারমার পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। সোমবার ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের সামনে দেওয়া এক আবেগঘন বক্তব্যে তিনি জানান, তিনি প্রধানমন্ত্রী এবং লেবার পার্টির নেতার পদ ছাড়বেন। তবে নতুন নেতা নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করে যাবেন।
মাত্র দুই বছর আগেই ২০২৪ সালের নির্বাচনে ঐতিহাসিক বিজয়ের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছিল লেবার পার্টি। দীর্ঘ ১৪ বছরের কনজারভেটিভ শাসনের অবসান ঘটিয়ে প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন স্টারমার। কিন্তু সেই বিজয়ের দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে দলীয় বিদ্রোহ, জনপ্রিয়তার পতন, স্থানীয় নির্বাচনে বড় ধাক্কা এবং দলীয় এমপিদের চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে হলো তাকে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েকদিন ধরে লেবার পার্টির ভেতরে স্টারমারের নেতৃত্ব নিয়ে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে অ্যান্ডি বার্নহ্যামের ওয়েস্টমিনস্টারে প্রত্যাবর্তন এবং সাম্প্রতিক উপনির্বাচনে তার জয়ের পর নেতৃত্ব পরিবর্তনের দাবি জোরালো হয়ে ওঠে। দলটির একাধিক মন্ত্রী, জ্যেষ্ঠ নেতা, ট্রেড ইউনিয়ন প্রতিনিধি এবং দাতারা স্টারমারকে সরে দাঁড়ানোর পরামর্শ দেন।
যদিও গত শুক্রবার পর্যন্ত স্টারমার প্রকাশ্যে বলেছিলেন তিনি নেতৃত্বের লড়াইয়ে অংশ নিতে প্রস্তুত এবং পদত্যাগের কোনো পরিকল্পনা নেই, তবে সপ্তাহান্তে স্ত্রী ভিক্টোরিয়ার সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা এবং ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের সঙ্গে বৈঠকের পর তার অবস্থান বদলে যায়। জানা গেছে, একাধিক মন্ত্রিসভার সদস্য ব্যক্তিগতভাবে তাকে জানিয়েছিলেন যে তার নেতৃত্বের সময় শেষ হয়ে এসেছে।
পদত্যাগের ঘোষণার সময় স্টারমার বলেন, “ডাউনিং স্ট্রিটে প্রবেশের দিনটি ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে গর্বের মুহূর্ত। আমি রাজনীতিতে এসেছিলাম লাখো মানুষের জীবন পরিবর্তনের সুযোগ পাওয়ার জন্য।”
নিজের রাজনৈতিক যাত্রার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ক্ষমতায় আসার আগে লেবার পার্টিকে অনেকে “রাজনৈতিকভাবে, আর্থিকভাবে এবং নৈতিকভাবে দেউলিয়া” বলে মনে করতেন। কিন্তু তিনি সেই পরিস্থিতি বদলে দিয়েছিলেন। দল থেকে ইহুদিবিদ্বেষের বিষাক্ত সংস্কৃতি দূর করা, অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং সরকার গঠনের সক্ষমতা তৈরি করাকে তিনি নিজের অন্যতম অর্জন হিসেবে তুলে ধরেন।
স্টারমার বলেন, “আমার দল এখন একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে-পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনে দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য আমি কি এখনও সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি? আমি আমার দলের উত্তর শুনেছি এবং সেই উত্তর আমি সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করছি।”
এরপর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন, “আমি লেবার পার্টির নেতার পদ থেকে পদত্যাগ করছি।”
তিনি জানান, সকালে রাজা তৃতীয় চার্লসের সঙ্গে কথা বলে নিজের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে অবহিত করেছেন। একই সঙ্গে লেবার পার্টির ন্যাশনাল এক্সিকিউটিভ কমিটিকে (এনইসি) নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের সময়সূচি নির্ধারণের নির্দেশ দিয়েছেন। আগামী ৯ জুলাই থেকে মনোনয়ন গ্রহণ শুরু হবে এবং পার্লামেন্টের গ্রীষ্মকালীন বিরতির আগেই পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে সেপ্টেম্বর মাসে পার্লামেন্ট পুনরায় বসার আগেই নতুন প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।
নতুন নেতা নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন এবং ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করতে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবেন বলেও জানান। নিজের উত্তরসূরিকে পূর্ণ সমর্থন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বলেন, “তারা এমন একটি ব্রিটেনের দায়িত্ব নেবে, যা দুই বছর আগের তুলনায় আরও শক্তিশালী এবং আরও ন্যায্য।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্টারমারের পতনের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করেছে। সাম্প্রতিক স্থানীয় নির্বাচনে লেবার পার্টি ব্যাপক আসন হারিয়েছে। অনেক ঐতিহ্যগত লেবার ঘাঁটিতেও দলটি ধাক্কা খেয়েছে। একই সময়ে নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বাধীন রিফর্ম ইউকে দল দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করতে থাকে। দলীয় এমপিদের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয় যে বর্তমান নেতৃত্ব ধরে রাখলে পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনে লেবার বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে।
এদিকে স্টারমারের উত্তরসূরি হিসেবে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন গ্রেটার ম্যানচেস্টারের সাবেক মেয়র ও সদ্য নির্বাচিত এমপি অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। ব্রিটিশ গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, লেবার পার্টির প্রায় দুই শতাধিক এমপি ইতোমধ্যেই তার প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। যদিও আনুষ্ঠানিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখনও শুরু হয়নি, তবুও দলীয় ভেতরে তাকে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বার্নহ্যামের পাশাপাশি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার, ওয়েস স্ট্রিটিং, অ্যাঞ্জেলা রেইনার এবং শাবানা মাহমুদের নামও সম্ভাব্য নেতৃত্বপ্রত্যাশীদের তালিকায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে বার্নহ্যামই সবচেয়ে এগিয়ে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
স্টারমারের পদত্যাগের প্রভাব শুধু রাজনীতিতেই নয়, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও পড়েছে। তার পদত্যাগের জল্পনা ছড়িয়ে পড়ার পর ব্রিটিশ পাউন্ডের মূল্য কিছুটা কমে যায় এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। নতুন নেতৃত্ব অর্থনীতি, করনীতি ও সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে কী ধরনের অবস্থান নেবে, তা নিয়ে বাজারে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বক্তব্যের শেষ অংশে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন স্টারমার। তিনি বলেন, দেশের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব পালন করার পর এবার তিনি আরও বেশি সময় দিতে চান জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে।
“আমি আমার অসাধারণ স্ত্রী ভিক্টোরিয়ার আরও ভালো স্বামী হতে চাই। তিনি ভালো-মন্দ সব সময় আমার পাশে ছিলেন। আর আমি আমার সন্তানদের আরও ভালো বাবা হতে চাই। ওরাই আমার গর্ব, ওরাই আমার আনন্দ।”
এরপর স্ত্রী ভিক্টোরিয়াকে আলিঙ্গন করে আবারও ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের ভেতরে ফিরে যান তিনি। সেই মুহূর্তে উপস্থিত সমর্থক ও কর্মীদের করতালি এবং উচ্ছ্বাসে বিদায় নেন ব্রিটিশ রাজনীতির সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম আলোচিত এই নেতা।
তথ্যসূত্র: বিবিসি