{{ news.section.title }}
১৬ ঘণ্টা আকাশে উড়ল রাশিয়ার তুপোলেভ টিইউ-১৬০
রাশিয়ার পরমাণু অস্ত্র বহনে সক্ষম কৌশলগত টিইউ–১৬০ বোমারু বিমান ব্যারেন্টস সাগর ও নরওয়েজিয়ান সাগরের ওপর আন্তর্জাতিক আকাশসীমায় টানা ১৬ ঘণ্টা টহল দিয়েছে। দীর্ঘ এই ফ্লাইটে আকাশে উড়ন্ত অবস্থায় জ্বালানি ভরার সক্ষমতাও পরীক্ষা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।
মঙ্গলবার ভোরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টেলিগ্রামে দেওয়া এক বিবৃতিতে রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, এটি ছিল রাশিয়ার দূরপাল্লার বিমান চলাচল বাহিনীর একটি পরিকল্পিত টহল মিশন। টিইউ–১৬০ ক্ষেপণাস্ত্রবাহী কৌশলগত বোমারু বিমানের সঙ্গে মিগ–৩১ যুদ্ধবিমানও অংশ নেয়।
রাশিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, পুরো ফ্লাইটটি আন্তর্জাতিক আকাশসীমার ভেতর পরিচালিত হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক উড্ডয়ন বিধিমালা পুরোপুরি অনুসরণ করা হয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফ্লাইট চলাকালে বিভিন্ন পর্যায়ে বিদেশি যুদ্ধবিমান রুশ বোমারু বিমানগুলোকে অনুসরণ ও নজরদারি করেছে। যদিও মস্কো কোন দেশের যুদ্ধবিমান এসব নজরদারিতে অংশ নিয়েছে, তা উল্লেখ করেনি।
টিইউ–১৬০ বিশ্বের সবচেয়ে বড় সুপারসনিক কৌশলগত বোমারু বিমানগুলোর একটি। ন্যাটোর কাছে এটি “ব্ল্যাকজ্যাক” নামে পরিচিত। এই বিমান পরমাণু ও প্রচলিত-উভয় ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র বহন করতে সক্ষম। দীর্ঘ পাল্লার ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের সক্ষমতার কারণে এটি রাশিয়ার কৌশলগত পারমাণবিক ত্রয়ীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
মস্কোর দাবি অনুযায়ী, ১৬ ঘণ্টার এই মিশনের সময় বিমানটিতে আকাশেই জ্বালানি ভরার মহড়া চালানো হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ পরিস্থিতি বা দূরপাল্লার অভিযানের ক্ষেত্রে এ ধরনের সক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে সামরিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন।
ব্যারেন্টস সাগর ও নরওয়েজিয়ান সাগর দীর্ঘদিন ধরেই রাশিয়া ও ন্যাটোর সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। রাশিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় সামরিক ঘাঁটি এবং পারমাণবিক সাবমেরিন বহরের একটি বড় অংশ এই অঞ্চলে অবস্থান করছে।
ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর উত্তর ইউরোপে সামরিক উত্তেজনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে ফিনল্যান্ড ও সুইডেনের ন্যাটোতে যোগদানের পর রাশিয়ার উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে ন্যাটোর উপস্থিতি আরও শক্তিশালী হয়েছে।
রাশিয়ার সঙ্গে নরওয়ের দীর্ঘ আর্কটিক সীমান্ত রয়েছে। অন্যদিকে ফিনল্যান্ড ন্যাটো সদস্য হওয়ার পর রাশিয়ার সঙ্গে জোটটির স্থলসীমান্ত আরও বেড়েছে। ফলে ব্যারেন্টস অঞ্চলে রুশ সামরিক তৎপরতা এখন পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য বাড়তি উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একাধিকবার রুশ বোমারু বিমান নরওয়ে ও উত্তর ইউরোপের আকাশসীমার কাছাকাছি উড্ডয়ন করেছে। এর প্রতিক্রিয়ায় নরওয়ে, ফিনল্যান্ড ও অন্যান্য ন্যাটো দেশ নিজেদের যুদ্ধবিমান পাঠিয়ে সেগুলোকে অনুসরণ করেছে।
নরওয়ের সংবাদমাধ্যম ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরও একাধিকবার নরওয়ের এফ–৩৫ যুদ্ধবিমান রুশ কৌশলগত বোমারু বিমান শনাক্ত ও অনুসরণ করেছে। কিছু ক্ষেত্রে এসব বিমানে দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র বহনের প্রমাণও পাওয়া গেছে।
রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিদেশি যুদ্ধবিমানগুলো কিছু সময় রুশ বিমানের পাশে উড়লেও কোনো ধরনের সংঘাত বা বিপজ্জনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়নি।
সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের টহল কেবল নিয়মিত মহড়া নয়; বরং এটি একটি শক্তি প্রদর্শনের অংশ। বিশেষ করে ন্যাটো ও রাশিয়ার সম্পর্ক বর্তমানে যে পর্যায়ে রয়েছে, সেখানে কৌশলগত বোমারু বিমানের দীর্ঘ টহল মিশন একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তাও বহন করে।
এর আগে ২০২৪ সালেও রুশ টিইউ–১৬০ বোমারু বিমান ব্যারেন্টস ও নরওয়েজিয়ান সাগরের ওপর মহড়া চালিয়েছিল। তখন রাশিয়া বৃহৎ নৌ মহড়া ‘ওশান–২০২৪’-এর অংশ হিসেবে এসব উড্ডয়ন পরিচালনা করেছিল। ২০২৩ ও ২০২১ সালেও একই ধরনের দীর্ঘমেয়াদি উড্ডয়ন এবং আকাশে জ্বালানি ভরার মহড়া চালানো হয়েছিল। সে সময়ও ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর যুদ্ধবিমান রুশ বোমারু বিমানগুলোকে অনুসরণ করেছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধ, ন্যাটোর সম্প্রসারণ এবং আর্কটিক অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান সামরিক উপস্থিতির কারণে উত্তর ইউরোপ এখন বিশ্বের অন্যতম সংবেদনশীল সামরিক অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। রাশিয়ার এই ১৬ ঘণ্টার ফ্লাইটকে অনেকেই কেবল একটি সামরিক মহড়া হিসেবে দেখছেন না। বরং এটি ন্যাটোকে উদ্দেশ করে দেওয়া একটি কৌশলগত বার্তা বলেই মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যারেন্টস সাগর ও নরওয়েজিয়ান সাগরের আকাশে রুশ বোমারু বিমানের উপস্থিতি এবং ন্যাটোর নজরদারি কার্যক্রম আগামী দিনগুলোতে আরও বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।