{{ news.section.title }}
যুদ্ধের জেরে বাজারে আসেনি ১০০ কোটি ব্যারেলের বেশি তেল, কী প্রভাব পড়বে?
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সমঝোতা স্মারকে সই হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও হরমুজ প্রণালি ঘিরে অনিশ্চয়তা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক না হওয়ায় তেল সরবরাহ ও বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি আনুষ্ঠানিকভাবে খুলে দেওয়া হলেও বাস্তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। চার মাসেরও বেশি সময় ধরে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল পরিবহন কার্যত বাধাগ্রস্ত থাকায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, চলমান আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে বিশ্ববাজারে প্রায় ১১৫ কোটি ব্যারেল তেল সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যেতে পারে-এই আশঙ্কায় মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি তেল উৎপাদনকারী দেশ উৎপাদন কমিয়ে দেয়। ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশকে তাদের বিদ্যমান মজুত ব্যবহার করে পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়েছে।
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং এশিয়ার কয়েকটি দেশ তাদের কৌশলগত মজুত থেকে তেল সরবরাহ অব্যাহত রাখে। তবে দীর্ঘ সময় ধরে মজুত ব্যবহার করায় বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা এখন নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
কৌশলগত মজুত এখন কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ)-এর তথ্য অনুযায়ী, উন্নত দেশগুলোর কৌশলগত তেল মজুত ১৯৯০ সালের পর সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভও গত ৪৩ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম পর্যায়ে পৌঁছেছে।
বাণিজ্যিক মজুতের অবস্থাও উদ্বেগজনক। বিশ্বের বিভিন্ন সংরক্ষণাগারে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে অনেক স্থানে স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যবস্থাই চাপের মুখে পড়েছে। জি-৭ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পরিস্থিতির গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, ‘বিশৃঙ্খলা দেখতে চান? আমাদের যে মজুত আছে, তা দিয়ে আর চার সপ্তাহ চলবে।’
ট্রাম্পের এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করে। কারণ বিশ্লেষকদের মতে, সরবরাহ ব্যবস্থায় আরেকটি বড় ধাক্কা এলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার দ্রুত অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে।
তেলের দামে স্বস্তি এলেও ঝুঁকি পুরোপুরি শেষ হয়নি
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতার খবর প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড ও ডব্লিউটিআই তেলের দাম দ্রুত কমে আসে। যুদ্ধের সময় যেখানে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২৬ ডলার ছাড়িয়েছিল, বর্তমানে তা ৮০ ডলারের নিচে অবস্থান করছে। তবে জ্বালানি বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এই মূল্যহ্রাস মূলত বাজারের আশাবাদী মনোভাবের ফল। বাস্তবে সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।
গত কয়েক মাসে বৈশ্বিক তেলের মজুত প্রায় ১৯ কোটি ব্যারেল কমে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমায় অবস্থিত কুশিং তেলকেন্দ্র, যাকে বৈশ্বিক তেলবাজারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংরক্ষণাগার হিসেবে বিবেচনা করা হয়, সেখানেও মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে।
সংরক্ষণাগারের নিচের অংশে অব্যবহারযোগ্য অবশিষ্টাংশ জমে থাকায় পাইপলাইনের চাপ ঠিক রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। এর ফলে গ্রাহকদের কাছে সরবরাহ বজায় রাখাও অনেক ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে
বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালি খুলে দিলেই সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান হবে না। প্রথমে সমুদ্রপথে থাকা মাইন অপসারণ করতে হবে। এরপর দীর্ঘদিন আটকে থাকা জাহাজগুলোকে চলাচলের অনুমতি দিতে হবে। এছাড়া অনেক তেলক্ষেত্রে উৎপাদন আবার স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরিয়ে আনতেও সময় প্রয়োজন হবে। এরপর নতুন উৎপাদিত তেল বিভিন্ন দেশে পৌঁছাতে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।
জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পুরো সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হতে কয়েক মাস পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে।
১১৫ কোটি ব্যারেলের ঘাটতি পূরণে লাগতে পারে এক বছর
কেপলারের হিসাব অনুযায়ী, যদি বিশ্ববাজারে দৈনিক অতিরিক্ত ৫০ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহও করা হয়, তাহলেও বর্তমান ঘাটতি পূরণে প্রায় এক বছর সময় লাগতে পারে। কেপলারের বিশ্লেষক ম্যাট স্মিথ বলেন, আগামী গ্রীষ্মে যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাদের আরও বেশি দামে জ্বালানি কিনতে হতে পারে। বর্তমানে বাজারে আশাবাদ থাকলেও শেষ পর্যন্ত বাস্তব সরবরাহ পরিস্থিতিই দামের ওপর প্রভাব ফেলবে।
তেল বিশ্লেষক ড্যান পিকারিংও একই ধরনের সতর্কতা দিয়েছেন। তার মতে, এক সময় বাস্তব তেল সরবরাহই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যদি বাজারে পর্যাপ্ত তেল না আসে, তাহলে তার প্রভাব অনিবার্য।
ওপেকের উৎপাদন বাড়ানোর সম্ভাবনা
অন্যদিকে কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন, ওপেক ও ওপেক প্লাসভুক্ত কয়েকটি দেশ দ্রুত উৎপাদন বাড়াতে পারে। বিশেষ করে আর্থিক চাপে থাকা উৎপাদক দেশগুলো রাজস্ব বাড়ানোর জন্য অতিরিক্ত তেল বাজারে ছাড়তে আগ্রহী হতে পারে। এতে সরবরাহ বাড়লে দামের ওপর চাপ কমতে পারে।
জ্বালানি বিশ্লেষক বিকাশ দ্বিবেদি বলেছেন, ‘আমাদের হাতে যথেষ্ট সুরক্ষা ছিল এবং আমরা সেই সুরক্ষার বড় অংশ ব্যবহার করেছি। কিন্তু পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়নি।’
তার মতে, অনেক ক্ষেত্রেই বাজারের কিছু অংশ বাস্তব পরিস্থিতির চেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি করছে।
ডিজেল ও পেট্রোলের মজুতেও চাপ
যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের মজুত বর্তমানে ২০০৩ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। যদিও পাঁচ বছরের গড়ের তুলনায় ঘাটতি প্রায় ১২.৪ শতাংশ। অন্যদিকে পেট্রলের মজুতও আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৫ শতাংশ কম রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি বাজার এখন এমন এক অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে যেখানে যেকোনো নতুন ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা আবারও দামের ঊর্ধ্বগতি তৈরি করতে পারে।
বাজারে এখনো বড় প্রশ্ন হরমুজ
বর্তমানে বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে পরিবহন হয়। ফলে এই নৌপথে সামান্য অস্থিরতাও বিশ্ববাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। অনেক বিনিয়োগকারী মনে করছেন, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতার কারণে সংকট শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু বহু জ্বালানি বিশেষজ্ঞের মতে, প্রকৃত পরীক্ষা এখনো বাকি।
হরমুজ প্রণালিতে পূর্ণাঙ্গ ও নিরাপদ জাহাজ চলাচল নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের ঝুঁকি পুরোপুরি কাটবে না। সরবরাহ ঘাটতি, কমে যাওয়া মজুত এবং উৎপাদন পুনরুদ্ধারের ধীরগতি আগামী কয়েক মাস আন্তর্জাতিক তেলবাজারকে অস্থির রেখেই যেতে পারে।
তথ্যসূত্র: সিএনএন