ইরান ইস্যুতে ট্রাম্পকে থামাতে সিনেটে বিল পাস

ইরান ইস্যুতে ট্রাম্পকে থামাতে সিনেটে বিল পাস
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানবিষয়ক সামরিক নীতির বিরুদ্ধে এবার সরাসরি অবস্থান নিয়েছে মার্কিন কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেট। ইরানের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে কোনো সামরিক অভিযান চালাতে হলে প্রেসিডেন্টকে অবশ্যই কংগ্রেসের অনুমোদন নিতে হবে অথবা চলমান সামরিক তৎপরতা বন্ধ করতে হবে- এমন একটি ‘ওয়ার পাওয়ারস রেজোলিউশন’ বা যুদ্ধক্ষমতা সংক্রান্ত প্রস্তাব সিনেটে পাস হয়েছে।

স্থানীয় সময় মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত ভোটাভুটিতে বিলটি ৫০–৪৮ ভোটে অনুমোদন পায়। এর মাধ্যমে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে তার নিজের দল রিপাবলিকান পার্টির ভেতরেও উল্লেখযোগ্য ভাঙনের চিত্র দেখা গেছে। চারজন রিপাবলিকান সিনেটর ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে একযোগে বিলটির পক্ষে ভোট দিয়েছেন।

 

এর আগে চলতি মাসের শুরুতে প্রতিনিধি পরিষদে ২১৫–২০৮ ভোটে একই প্রস্তাব পাস হয়েছিল। পরে তা অনুমোদনের জন্য সিনেটে পাঠানো হয়। সিনেটে পাসের মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষ ট্রাম্প প্রশাসনের ইরান নীতির বিরুদ্ধে একই অবস্থান নিল।

 

সিনেটে বিলটির পক্ষে ভোট দেন রিপাবলিকান সিনেটর বিল ক্যাসিদি, সুসান কলিন্স, লিসা মুরকোওস্কি এবং র্যান্ড পল। অন্যদিকে পেনসিলভানিয়ার ডেমোক্র্যাট সিনেটর জন ফেটারম্যান বিলের বিপক্ষে ভোট দেন। রিপাবলিকান সিনেটর মিচ ম্যাককনেল ও ডেভ ম্যাককরমিক ভোটদানে অংশ নেননি।

 

মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এটি শুধু একটি রাজনৈতিক ভোট নয়; বরং কংগ্রেস ও হোয়াইট হাউসের মধ্যে যুদ্ধ ঘোষণা ও সামরিক ক্ষমতা নিয়ে দীর্ঘদিনের সাংবিধানিক বিরোধের নতুন অধ্যায়। ১৯৭৩ সালের ‘ওয়ার পাওয়ারস অ্যাক্ট’-এর আওতায় কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান চালানোর ক্ষমতা নিয়ে বহুদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে।

 

ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমার ভোটের পর বলেন, “ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের সামরিক অভিযান নিয়ন্ত্রণে আনতে এটি ছিল সিনেটের দশম প্রচেষ্টা। অবশেষে যুদ্ধক্ষমতা সংক্রান্ত প্রস্তাবটি পাস হলো।”

 

তিনি আরও বলেন, “বছরের পর বছর ট্রাম্প ইরানের ওপর সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি মার্কিন জনগণের জন্য সর্বোচ্চ পর্যায়ের বিভ্রান্তি, বিশৃঙ্খলা ও ব্যয় সৃষ্টি করেছেন।”

 

ফেব্রুয়ারির শেষদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান শুরুর পর ইরানের সঙ্গে সংঘাত দ্রুত বিস্তৃত হয়। পরবর্তী সময়ে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা, জ্বালানি সংকট এবং আন্তর্জাতিক উদ্বেগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। পরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতা স্মারকে সই করে এবং সুইজারল্যান্ডে শান্তি আলোচনা শুরু হয়।

 

বর্তমানে পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় ৬০ দিনের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তির লক্ষ্যে আলোচনা চলছে। তবে কংগ্রেসের অনেক সদস্য মনে করছেন, স্থায়ী সমঝোতার আগে প্রেসিডেন্টকে এককভাবে সামরিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত নয়।

 

তবে বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করছেন, এই প্রস্তাব পাস হলেও ট্রাম্পের সামরিক ক্ষমতা পুরোপুরি সীমিত হয়ে যাবে না। কারণ প্রেসিডেন্ট চাইলে এ ধরনের পদক্ষেপে ভেটো দিতে পারেন। সেক্ষেত্রে কংগ্রেসের উভয় কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন প্রয়োজন হবে, যা বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় অর্জন করা কঠিন।

 

হোয়াইট হাউস ইতোমধ্যে এই প্রস্তাবকে “অর্থহীন” এবং “ভুল সময়ে নেওয়া সিদ্ধান্ত” বলে আখ্যা দিয়েছে। ট্রাম্প নিজেও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, এই ভোট ইরানের সঙ্গে চলমান কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে দুর্বল করতে পারে।

 

মার্কিন বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, ইরান যুদ্ধ নিয়ে সাধারণ মার্কিন জনগণের মধ্যেও সমর্থন কমে এসেছে। অনেক রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাও এখন প্রকাশ্যে যুদ্ধ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বিষয়টি শুধু পররাষ্ট্রনীতি নয়, বরং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জেও পরিণত হয়েছে।

 

বিশ্লেষকদের মতে, সিনেটের এই ভোট তাৎক্ষণিকভাবে যুদ্ধ বন্ধ না করলেও এটি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা। কংগ্রেস স্পষ্ট করে দিয়েছে, ভবিষ্যতে ইরান নিয়ে বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নিতে গেলে আইনপ্রণেতাদের ভূমিকা উপেক্ষা করা সহজ হবে না।

 

তথ্যসূত্র: রয়টার্স, দ্য গার্ডিয়ান


সম্পর্কিত নিউজ