ইউক্রেনের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় প্রস্তুত রাশিয়া

ইউক্রেনের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় প্রস্তুত রাশিয়া
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

ইউক্রেনের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের অবসান ঘটাতে আবারও শান্তি আলোচনায় বসার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। মস্কোতে সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে তিনি জানান, ইস্তাম্বুলে পূর্ববর্তী আলোচনার ভিত্তি, অ্যাঙ্কোরেজে গঠিত সমঝোতার কাঠামো এবং যুদ্ধক্ষেত্রের বর্তমান বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করেই নতুন করে আলোচনা শুরু করা যেতে পারে।

পুতিন বলেন, রাশিয়া শান্তি চুক্তির জন্য প্রস্তুত রয়েছে, তবে আলোচনাকে অবশ্যই বাস্তব পরিস্থিতির ওপর দাঁড়াতে হবে। তার মতে, যুদ্ধক্ষেত্রে যে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, সেটি উপেক্ষা করে কোনো স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

 

রুশ প্রেসিডেন্ট একই সঙ্গে অভিযোগ করেন, ইউক্রেনের অনমনীয় অবস্থান এবং আলোচনায় প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবের কারণেই পূর্ববর্তী শান্তি প্রচেষ্টাগুলো সফল হয়নি। তিনি দাবি করেন, আলোচনা শুরুর আগমুহূর্তে ইউক্রেন রাশিয়ার অভ্যন্তরে ড্রোন হামলা ও বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছে, যাতে কূটনৈতিক আলোচনায় নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করা যায়।

 

রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভও সম্প্রতি বলেছেন, মস্কো ইস্তাম্বুলে যেখানে আলোচনা থেমে গিয়েছিল, সেখান থেকেই পুনরায় সংলাপ শুরু করতে প্রস্তুত। তবে ডনবাস অঞ্চল এবং দখলকৃত ভূখণ্ডের প্রশ্নে রাশিয়ার অবস্থানে কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেননি তিনি।

 

২০২২ সালে যুদ্ধ শুরুর পর তুরস্কের ইস্তাম্বুলে প্রথম বড় আকারের শান্তি আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সেই সময় একটি প্রাথমিক চুক্তির খসড়াও তৈরি হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০২৫ সালে নতুন করে আলোচনা শুরু হলে কয়েক দফা বৈঠকে যুদ্ধবন্দি বিনিময় এবং মানবিক করিডোর নিয়ে অগ্রগতি হয়। তবে ভূখণ্ড সংক্রান্ত বিরোধের কারণে চূড়ান্ত সমঝোতা সম্ভব হয়নি।

 

গত বছর ইস্তাম্বুলে ১৬ মে, ২ জুন এবং ২৩ জুলাই অনুষ্ঠিত বৈঠকগুলো থেকে একটি সম্ভাব্য শান্তি কাঠামো তৈরি হয়েছিল। পরে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্টদের মধ্যে আলাস্কার অ্যাঙ্কোরেজে অনুষ্ঠিত বৈঠককে কেন্দ্র করেও নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগ শুরু হয়। রাশিয়ান কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে “স্পিরিট অব অ্যাঙ্কোরেজ” শব্দটি ব্যবহার করে আসছেন, যার মাধ্যমে তারা ওই বৈঠকে হওয়া অনানুষ্ঠানিক বোঝাপড়ার কথা উল্লেখ করেন।

 

তবে সাম্প্রতিক সময়ে মস্কো অভিযোগ করছে যে ওয়াশিংটন সেই বোঝাপড়া বাস্তবায়ন করেনি। রুশ কর্মকর্তাদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র পরবর্তীতে তাদের অবস্থান পরিবর্তন করেছে এবং ইউক্রেনকে আরও সামরিক সহায়তা দিয়ে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করেছে।

 

চলতি বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় আবুধাবি ও জেনেভায় রাশিয়া, ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের মধ্যে নতুন আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে ইরান সংকট এবং মার্কিন-ইসরায়েল সংঘাতের কারণে সেই কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ধীর হয়ে পড়ে।

 

অন্যদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সম্প্রতি পুতিনকে সরাসরি আলোচনার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি একটি উন্মুক্ত চিঠিতে যুদ্ধবিরতি, বন্দি বিনিময় এবং আন্তর্জাতিক গ্যারান্টির ভিত্তিতে আলোচনার প্রস্তাব দেন। তবে মস্কো তখন সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে এবং নিজেদের শর্তে আলোচনার কথা জানায়।

 

রাশিয়া বর্তমানে ডনবাস, জাপোরিঝিয়া এবং খেরসনের অধিকাংশ অঞ্চলকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা হিসেবে বিবেচনা করছে। মস্কো বারবার বলছে, নতুন আলোচনায় এই বাস্তবতাকে স্বীকার করতেই হবে। অন্যদিকে কিয়েভ এখনো দখলকৃত ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়ার বিপক্ষে অবস্থান বজায় রেখেছে।

 

এদিকে যুদ্ধক্ষেত্রেও উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইউক্রেন রাশিয়ার ভেতরে বিভিন্ন ড্রোন হামলা চালিয়েছে। ক্রিমিয়া, মস্কো অঞ্চল এবং বিভিন্ন তেল স্থাপনায় হামলার ঘটনা ঘটেছে। পুতিন নিজেও স্বীকার করেছেন যে ইউক্রেনের ড্রোন হামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

 

ইউক্রেন দাবি করছে, রাশিয়ার ওপর সামরিক চাপ বজায় রেখেই কূটনৈতিক সমাধান সম্ভব। অপরদিকে মস্কো মনে করছে, যুদ্ধক্ষেত্রে বর্তমান অবস্থানকে ভিত্তি করেই আলোচনা এগিয়ে নিতে হবে।

 

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, পুতিনের সাম্প্রতিক বক্তব্য নতুন শান্তি উদ্যোগের ইঙ্গিত দিলেও এখনো দুই পক্ষের অবস্থানের মধ্যে বড় ধরনের দূরত্ব রয়ে গেছে। বিশেষ করে ভূখণ্ড, নিরাপত্তা গ্যারান্টি এবং ন্যাটো ইস্যুতে সমঝোতা না হলে চূড়ান্ত চুক্তি করা অত্যন্ত কঠিন হবে।

 

তবে চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধে বিপুল প্রাণহানি, অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং আন্তর্জাতিক চাপের কারণে নতুন কূটনৈতিক প্রচেষ্টা আবারও গতি পাচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, মস্কো ও কিয়েভ বাস্তবিক অর্থে আলোচনার টেবিলে ফিরতে পারে কিনা।

 

তথ্যসূত্র: রয়টার্স


সম্পর্কিত নিউজ