{{ news.section.title }}
হরমুজে আটকা ১১ হাজারের বেশি নাবিককে উদ্ধারে জাতিসংঘের অভিযান
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর হরমুজ প্রণালিতে আটকা পড়া ১১ হাজারের বেশি নাবিককে নিরাপদে সরিয়ে নিতে বড় ধরনের উদ্ধার অভিযান শুরু করেছে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশন (আইএমও)। কয়েক মাস ধরে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে আটকে থাকা শত শত বাণিজ্যিক জাহাজ ও হাজারো নাবিককে নিরাপদে ফিরিয়ে আনার জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এবং আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালিতে বর্তমানে কয়েকশ বাণিজ্যিক জাহাজ এবং প্রায় ১১ হাজার নাবিক আটকা পড়ে আছেন। জাতিসংঘের শিপিং সংস্থা আইএমও ইতোমধ্যে উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করেছে এবং ধাপে ধাপে জাহাজগুলোকে নিরাপদে প্রণালি অতিক্রমের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
আইএমওর মহাসচিব আর্সেনিও ডোমিঙ্গুয়েজ এক বিবৃতিতে বলেন, এই অভিযান অত্যন্ত জটিল এবং বহু দেশের সহযোগিতার মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। তিনি জানান, ইরান, ওমান, যুক্তরাষ্ট্র, উপসাগরীয় উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলো এবং আন্তর্জাতিক শিপিং শিল্পের সঙ্গে সমন্বয় করে পুরো কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, নাবিকদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চয়তা সংগ্রহ করা হয়েছে এবং নৌপথের নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিস্তারিতভাবে যাচাই করা হয়েছে। কয়েক মাস ধরে চলা আলোচনার পর এই উদ্ধার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পর্যায়ে এসেছে।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল এবং বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই সংকট দ্রুত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও প্রভাব ফেলে।
আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের পূর্ববর্তী মূল্যায়নে বলা হয়েছিল, উপসাগরীয় অঞ্চজুড়ে প্রায় ২০ হাজার নাবিক বিভিন্ন সময়ে আটকা পড়েছিলেন। যদিও বর্তমানে উদ্ধার কার্যক্রমের প্রথম ধাপে ১১ হাজারের বেশি নাবিককে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আর্সেনিও ডোমিঙ্গুয়েজ আগে সতর্ক করে বলেছিলেন, সমুদ্রে আটকে পড়া নাবিকদের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছেন। কেউ সন্তান জন্মের সময় উপস্থিত থাকতে পারেননি, কেউ আবার স্বজন হারিয়েও দেশে ফিরতে পারেননি। তিনি জোর দিয়ে বলেন, নাবিকদের কখনোই ভূরাজনৈতিক সংঘাতের বলি বানানো উচিত নয়।
আইএমওর তথ্য অনুযায়ী, চলমান সংঘাতে অন্তত ১৪ জন নাবিক প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়া বিভিন্ন জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং কয়েকটি জাহাজে হামলার ঘটনাও ঘটেছে।
ওমানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বর্তমানে প্রচলিত ট্রাফিক সেপারেশন স্কিম পুরোপুরি নিরাপদ নয়। ফলে সাময়িকভাবে উত্তর ও দক্ষিণ দিকে বিকল্প রুট ব্যবহার করে জাহাজগুলোকে সরিয়ে নেওয়া হবে। প্রতিটি জাহাজকে আলাদাভাবে যোগাযোগ করে নির্দিষ্ট দিনে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হবে।
মেরিটাইম বিশ্লেষক ক্যাপ্টেন কিস বাকেন্স বলেছেন, ওমান সরকারের নতুন নিরাপত্তা পরিকল্পনা অত্যন্ত সুসংগঠিত। এর ফলে ধীরে ধীরে জাহাজ চলাচল পুনরায় শুরু করা সম্ভব হচ্ছে এবং তেলবাহী জাহাজগুলোও আবার সমুদ্রে ফিরতে শুরু করেছে।
শিপিং নজরদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত সোমবার অন্তত ৩৬টি বাণিজ্যিক জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। যুদ্ধ শুরুর পর এটি একদিনে সর্বোচ্চ জাহাজ চলাচলের রেকর্ড হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ডেনমার্ক ইতোমধ্যে জানিয়েছে যে তারা ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের নেতৃত্বাধীন একটি আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা মিশনে অংশ নেবে। এই মিশনের লক্ষ্য হচ্ছে হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌচলাচল পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সম্প্রতি বলেছেন, হরমুজ প্রণালি একটি আন্তর্জাতিক জলপথ এবং এখানে কোনো দেশকে টোল বা নিয়ন্ত্রণ আরোপের সুযোগ দেওয়া হবে না। অপরদিকে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, হরমুজের পরিস্থিতি আর কখনো যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় পুরোপুরি ফিরে যাবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক সমঝোতা পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল করলেও হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা ঝুঁকি পুরোপুরি শেষ হয়নি। ভাসমান মাইন, ক্ষতিগ্রস্ত নৌপথ এবং সামরিক উত্তেজনার কারণে এখনো সতর্ক অবস্থান বজায় রাখা হচ্ছে।
বিশ্ব অর্থনীতির জন্য হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যের বড় অংশ এই নৌপথের ওপর নির্ভরশীল। ফলে এখানকার যেকোনো অস্থিতিশীলতা বৈশ্বিক তেলের বাজার, জ্বালানি মূল্য এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় সরাসরি প্রভাব ফেলে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ১১ হাজারের বেশি নাবিককে নিরাপদে সরিয়ে আনার এই অভিযান শুধু মানবিক উদ্যোগ নয়, বরং বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্য পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা, রয়টার্স