ক্ষেপণাস্ত্র না থাকলে ইরানের পরিণতিও গাজার মতো হতো: পেজেশকিয়ান

ক্ষেপণাস্ত্র না থাকলে ইরানের পরিণতিও গাজার মতো হতো: পেজেশকিয়ান
ছবির ক্যাপশান, ছবি: রয়টার্স

ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে কোনো ধরনের আপস করা হবে না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। পাকিস্তান সফরকালে তিনি বলেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা না থাকলে দেশটির পরিণতিও গাজার মতো হতো এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানকে ধ্বংস করে দিত।

পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে বিভিন্ন বৈঠক ও আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি বলেন, ইরানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা দেশটির অস্তিত্বের প্রশ্নের সঙ্গে জড়িত এবং এ বিষয়ে তেহরান কোনো ধরনের সমঝোতায় যাবে না।

 

পেজেশকিয়ান বলেন, ‘আমাদের প্রতিরক্ষার জন্য যে ক্ষেপণাস্ত্রগুলো রয়েছে, সেগুলো না থাকলে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র গাজার মতোই ইরানকেও তছনছ করে দিত। তারা বৃদ্ধ, শিশু কিংবা সাধারণ মানুষের প্রতিও কোনো দয়া দেখাত না।’

 

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আমাদের আত্মরক্ষার সক্ষমতা নিয়ে কখনো, কোনো পরিস্থিতিতেই, কারও সঙ্গে আপস করব না।’

 

এই বক্তব্য এমন সময় এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান কূটনৈতিক আলোচনায় তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি অন্যতম আলোচিত বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে। পশ্চিমা দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলে দাবি করে আসছে। তবে তেহরান বরাবরই বলে আসছে, তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক।


পাকিস্তান সফরে উষ্ণ অভ্যর্থনা

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের আমন্ত্রণে সরকারি সফরে মঙ্গলবার ইসলামাবাদ পৌঁছান প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। একই দিনে পৃথক ফ্লাইটে পাকিস্তানে পৌঁছান ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি।

 

পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম ডনের তথ্য অনুযায়ী, রাওয়ালপিন্ডির নূর খান বিমানঘাঁটিতে পেজেশকিয়ানকে স্বাগত জানান পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারি, প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ, উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি, পিপিপি চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টো-জারদারি এবং পাকিস্তানে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত রেজা আমিরি মোগাদ্দাম।

 

ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশনের খবরে বলা হয়েছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিও নিজ দেশের প্রেসিডেন্টকে স্বাগত জানাতে বিমানঘাঁটিতে উপস্থিত ছিলেন।


যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলকে সরাসরি বার্তা

পাকিস্তান সফরে পেজেশকিয়ানের বক্তব্যকে অনেক বিশ্লেষক সরাসরি ওয়াশিংটন এবং তেল আবিবের উদ্দেশে দেওয়া রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখছেন। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর এবং সুইজারল্যান্ডে চলমান আলোচনা সত্ত্বেও তেহরান বারবার বলছে, পারমাণবিক কর্মসূচি কিংবা ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নিয়ে তারা কোনো চাপ মেনে নেবে না।


আল-আরাবিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পেজেশকিয়ান স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের অভিজ্ঞতা ইরানকে আরও সতর্ক করেছে। তার মতে, শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা না থাকলে ইরানও একই ধরনের হামলার মুখোমুখি হতে পারত।


আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপট

গত কয়েক মাসে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে সংঘাতের কারণে পুরো অঞ্চল অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি ও আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে ইরানের শীর্ষ নেতারা বারবার বলে আসছেন, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা দুর্বল করার কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না।


ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিও সম্প্রতি বলেছিলেন, দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং এটি নিয়ে কোনো আলোচনা হবে না।


পাকিস্তান-ইরান সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হচ্ছে

বিশ্লেষকদের মতে, পেজেশকিয়ানের এই সফর শুধু কূটনৈতিক নয়, বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। সীমান্ত নিরাপত্তা, জ্বালানি সহযোগিতা, বাণিজ্য বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হয়েছে বলে পাকিস্তানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।


বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় ইরান এখন প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে এবং পাকিস্তান সেই কৌশলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একই সঙ্গে পেজেশকিয়ানের বক্তব্য স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, চলমান কূটনৈতিক আলোচনা সত্ত্বেও ইরান তার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে দেশের নিরাপত্তার প্রধান ভিত্তি হিসেবেই বিবেচনা করছে।


সম্পর্কিত নিউজ