{{ news.section.title }}
লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় নিহত ছাড়াল ৪ হাজার ৩০০
লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান শুরুর চার মাস পার হতে না হতেই দেশটিতে মানবিক সংকট আরও গভীর হয়েছে। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলি হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৪ হাজার ৩০১ জনে পৌঁছেছে। আহত হয়েছেন আরও ১২ হাজার ১৯৯ জন। নিহতদের মধ্যে নারী, শিশু, স্বাস্থ্যকর্মী ও বেসামরিক মানুষের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যে বলা হয়েছে, দক্ষিণ লেবানন, নাবাতিয়েহ, বেকা উপত্যকা, টাইর এবং বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় টানা বিমান হামলা, ড্রোন হামলা ও গোলাবর্ষণের ফলে হতাহতের সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। সংঘাতের কারণে দেশটির স্বাস্থ্যব্যবস্থা, বিদ্যুৎ, পানি সরবরাহ এবং জরুরি সেবাও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের নাবাতিয়েহ জেলায় এখনো ইসরায়েলি সামরিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। স্থানীয় গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, সেখানে ড্রোন নজরদারি, গোলাবর্ষণ এবং বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। সীমান্তবর্তী কয়েকটি এলাকায় সাধারণ মানুষের চলাচলও সীমিত হয়ে পড়েছে।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী শুক্রবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, নিরাপত্তা অঞ্চলে তাদের সেনাদের ওপর হামলার জবাবে বিনতে জবেইল জেলার বিভিন্ন স্থানে হিজবুল্লাহর প্রায় ১০টি সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালানো হয়েছে। ইসরায়েলের দাবি, এসব স্থাপনা থেকে তাদের বাহিনীর বিরুদ্ধে হামলার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল।
অন্যদিকে হিজবুল্লাহ বলেছে, দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের চলমান সামরিক উপস্থিতি এবং বিমান হামলার জবাব দিতেই তারা প্রতিরোধ অব্যাহত রেখেছে। যদিও সংগঠনটি যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া সাম্প্রতিক নিরাপত্তা চুক্তিকে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং একে লেবাননের সার্বভৌমত্বের পরিপন্থী বলে অভিহিত করেছে।
গত ২৬ জুন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটনে লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে একটি কাঠামোগত নিরাপত্তা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ওই চুক্তিতে ধাপে ধাপে দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার, নির্দিষ্ট এলাকায় লেবাননের সেনাবাহিনীর মোতায়েন এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার রূপরেখা অন্তর্ভুক্ত ছিল।
তবে চুক্তি স্বাক্ষরের পরও বাস্তব পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসেনি। ইসরায়েল জানিয়েছে, হিজবুল্লাহর সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় না হওয়া পর্যন্ত তারা দক্ষিণ লেবাননের নিরাপত্তা অঞ্চলে অবস্থান বজায় রাখবে। অন্যদিকে হিজবুল্লাহ স্পষ্ট করে দিয়েছে, ইসরায়েলি বাহিনী সম্পূর্ণভাবে লেবানন ত্যাগ না করা পর্যন্ত তারা অস্ত্র সমর্পণ করবে না।
লেবাননের পার্লামেন্ট স্পিকার নাবিহ বেরিও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া এই চুক্তির সমালোচনা করেছেন। তাঁর অভিযোগ, এটি লেবাননের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন আরও বাড়াতে পারে এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে বাস্তবায়নযোগ্য নয়।
এদিকে সংঘাতের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা কয়েক লাখ ছাড়িয়ে গেছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা এবং লেবাননের সামাজিক বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের শুরুতে প্রায় ১০ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছিল। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে কিছু মানুষ নিজ এলাকায় ফিরতে শুরু করলেও বহু গ্রাম ও শহর সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় এখনো হাজার হাজার পরিবার আশ্রয়কেন্দ্র কিংবা অস্থায়ী ক্যাম্পে বসবাস করছে।
লেবাননের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলের বহু ঐতিহাসিক স্থাপনা, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এবং ধর্মীয় উপাসনালয় ইসরায়েলি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সরকার ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চেয়ে ইউনেস্কোর সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো সংঘাতপূর্ণ এলাকায় বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উভয় পক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও দ্রুত যুদ্ধবিরতি কার্যকর এবং মানবিক সহায়তা নির্বিঘ্নে পৌঁছে দেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছে। তবে সীমান্তে বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ এবং বিমান হামলা চলতে থাকায় পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত অস্থির বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটনের মধ্যস্থতায় হওয়া চুক্তি কার্যকর না হলে দক্ষিণ লেবাননে নতুন করে বড় ধরনের সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী নিরাপত্তা অঞ্চল, হিজবুল্লাহর অস্ত্র ইস্যু এবং ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থান এখনো একেবারেই বিপরীত।