ইউরোপে ভয়াবহ তাপপ্রবাহ: ফ্রান্স-বেলজিয়াম-নেদারল্যান্ডসে ৩,৭০০ মৃত্যু

ইউরোপে ভয়াবহ তাপপ্রবাহ: ফ্রান্স-বেলজিয়াম-নেদারল্যান্ডসে ৩,৭০০ মৃত্যু
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

ইউরোপজুড়ে গত জুন মাসে বয়ে যাওয়া নজিরবিহীন তাপপ্রবাহে শুধু ফ্রান্স, বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডসেই অন্তত ৩ হাজার ৭০০ অতিরিক্ত মানুষের মৃত্যু হয়েছে। দেশ তিনটির স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এসব মৃত্যু সরাসরি তাপমাত্রাজনিত জটিলতার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করা হচ্ছে। তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এই সংখ্যা এখনো প্রাথমিক এবং পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশিত হলে প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

গত ২০ জুন থেকে ২৮ জুন পর্যন্ত ইউরোপের বড় অংশজুড়ে চলা এই তাপপ্রবাহকে সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ জলবায়ুগত দুর্যোগ হিসেবে বর্ণনা করছেন আবহাওয়াবিদ ও জলবায়ু গবেষকেরা। তাদের মতে, এটি শুধু মানুষের প্রাণহানিই ঘটায়নি; বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা, পরিবহন অবকাঠামো, হাসপাতাল, কৃষি ও পানিসম্পদের ওপরও ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO) এবং জলবায়ুবিজ্ঞানীরা বলছেন, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন ছাড়া জুন মাসে এমন মাত্রার তাপপ্রবাহ কার্যত অসম্ভব ছিল।

 

সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে ফ্রান্সে। দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্টেফানি রিস্ট জানিয়েছেন, জুনের শেষ সপ্তাহের তাপপ্রবাহে এখন পর্যন্ত ২ হাজার ২৫টি অতিরিক্ত মৃত্যু নথিভুক্ত হয়েছে। আক্রান্তদের বড় অংশই ৪৫ বছরের বেশি বয়সী হলেও সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বের মানুষ। স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের হিসাবে, ২২ থেকে ২৮ জুনের মধ্যে মৃত্যুহার আগের সপ্তাহের তুলনায় প্রায় ২৯ শতাংশ বেড়েছে।

 

আরও পড়ুন: নতুন পে-স্কেল নিয়ে বড় আপডেট: ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন

 

ফরাসি জনস্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, শুধু হাসপাতালেই নয়, নিজ বাড়িতে মৃত্যুর ঘটনা ৯১ শতাংশ বেড়েছে। বৃদ্ধাশ্রমে মৃত্যুহার বেড়েছে প্রায় ৩৭ শতাংশ এবং হাসপাতালেও উল্লেখযোগ্য হারে মৃত্যু বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে রাজধানী প্যারিস অঞ্চল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যেখানে মৃত্যুর সংখ্যা এক সপ্তাহের ব্যবধানে ৬০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে।

 

স্টেফানি রিস্ট বলেছেন, সরকারের হাতে যে তথ্য রয়েছে, প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা সম্ভবত তার চেয়েও বেশি। কারণ অনেক মৃত্যুর তথ্য এখনো সংগ্রহ ও যাচাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে। ফ্রান্সের জনস্বাস্থ্য সংস্থাও একই সতর্কবার্তা দিয়ে জানিয়েছে, পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ করতে আরও সময় লাগবে।

 

বেলজিয়ামেও পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ জুন থেকে ২৯ জুন পর্যন্ত সময়ে প্রায় ১ হাজার ২০০ অতিরিক্ত মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে ৫৩০ জনের বয়স ছিল ৮৫ বছরের বেশি। এছাড়া ১৮০ জনের বয়স ছিল ৬৫ বছরের কম, যা বিশেষজ্ঞদেরও উদ্বিগ্ন করেছে। বেলজিয়ামের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একে দেশের ইতিহাসে গ্রীষ্মকালীন তাপপ্রবাহজনিত ‘অভূতপূর্ব’ অতিরিক্ত মৃত্যুর ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করেছে।

 

নেদারল্যান্ডসেও একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা গেছে। দেশটির স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাপপ্রবাহের সময় প্রায় ৪৮০ অতিরিক্ত মৃত্যু হয়েছে, যাদের অধিকাংশের বয়স ছিল ৮০ বছরের বেশি। দেশটির জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রবীণ জনগোষ্ঠীই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে ছিলেন এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে তাদের মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

 

শুধু এই তিন দেশই নয়, স্পেন, ইতালি, জার্মানি, পোল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, চেক প্রজাতন্ত্র, স্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরি ও যুক্তরাজ্যেও জুনের শেষ সপ্তাহে একের পর এক তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙেছে। অনেক শহরে দিনের পাশাপাশি রাতের তাপমাত্রাও ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়।

 

তাপপ্রবাহের কারণে ইউরোপজুড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়। নদীর পানি অতিরিক্ত উষ্ণ হয়ে যাওয়ায় কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়। কোথাও কোথাও রেললাইন বেঁকে যায়, সড়কের পিচ গলে যায় এবং গণপরিবহন চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। হাসপাতালগুলোতে হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা, কিডনি জটিলতা ও হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে যায়।

 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) সতর্ক করে জানিয়েছে, ইউরোপে তীব্র তাপপ্রবাহ এখন আর ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়; বরং ভবিষ্যতে আরও ঘন ঘন এবং আরও ভয়াবহ আকারে ফিরে আসতে পারে। সংস্থাটি বলছে, ইউরোপের অর্ধেকেরও বেশি দেশে এখনো পূর্ণাঙ্গ হিট-হেলথ অ্যাকশন প্ল্যান নেই। তাই ভবিষ্যতে প্রাণহানি কমাতে দ্রুত জাতীয় পর্যায়ে প্রস্তুতি জোরদার করা প্রয়োজন।

 

জলবায়ুবিজ্ঞানীদের আন্তর্জাতিক জোট ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন (World Weather Attribution) বলেছে, এবারের তাপপ্রবাহ মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণগুলোর একটি। তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বর্তমান বৈশ্বিক উষ্ণায়ন না থাকলে জুন মাসে এমন ভয়াবহ তাপমাত্রা প্রায় অসম্ভব ছিল।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপের জনসংখ্যা দ্রুত বয়স্ক হয়ে উঠছে। ফলে ভবিষ্যতে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ প্রবীণ, হৃদরোগী, ডায়াবেটিস ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য আরও বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করবে। তাই কেবল জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নয়, নগর পরিকল্পনা, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, পানি সরবরাহ এবং জনস্বাস্থ্য অবকাঠামোকেও জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে গড়ে তোলার বিকল্প নেই।

 

তথ্যসূত্র: রয়টার্স


সম্পর্কিত নিউজ