{{ news.section.title }}
বিশ্বজুড়ে ইরানের জব্দ সম্পদের পরিমাণ কত?
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সরাসরি আলোচনার আগে নিজেদের জব্দ থাকা সম্পদ ফেরত দেওয়ার দাবি নতুন করে সামনে এনেছে তেহরান। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক যুদ্ধে অবকাঠামো, শিল্প-কারখানা ও অর্থনীতিতে যে ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য ক্ষতিপূরণও দাবি করছে ইরান। দেশটির সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, এই ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক হিসাব প্রায় ২৭০ বিলিয়ন ডলার, তবে চূড়ান্ত মূল্যায়নে এই অঙ্ক আরও বাড়তে পারে বলে দাবি করা হয়েছে।
ইরানের পক্ষ থেকে এই দাবিগুলো এমন সময়ে সামনে আনা হলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংলাপে হরমুজ প্রণালি, নিষেধাজ্ঞা, জব্দ সম্পদ এবং যুদ্ধ-পরবর্তী নিরাপত্তা ব্যবস্থা-সবই আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের সঙ্গে সম্পর্কিত তাসনিম নিউজ জানিয়েছে, আলোচনায় ক্ষতিপূরণের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করতে যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়ন করছে তেহরান। রুশ সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইরান সরকারের মুখপাত্র ফাতিমা মাহাজিরানি বলেছেন, “প্রাথমিক ও সতর্কভাবে করা হিসাব অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৭০ বিলিয়ন ডলারের, তবে এই অংক আরও বাড়তে পারে।”
ইরানের দাবি অনুযায়ী, ক্ষয়ক্ষতির এই হিসাবের মধ্যে ভবন ও অবকাঠামোর ক্ষতি, শিল্প-কারখানা বন্ধ থাকার আর্থিক ক্ষতি এবং যুদ্ধের কারণে অর্থনীতিতে সৃষ্ট পরোক্ষ লোকসানও যুক্ত করা হয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা দাবি করেছে, ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকে ক্ষতিপূরণের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। তবে বিবিসি স্বতন্ত্রভাবে এই দাবির সত্যতা যাচাই করতে পারেনি বলে আপনার দেওয়া পাঠ্যেও উল্লেখ আছে।
জব্দ সম্পদ কেন ইরানের বড় শর্ত
ইরানের জব্দ থাকা সম্পদের প্রশ্ন নতুন নয়। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর যুক্তরাষ্ট্রে মার্কিন জিম্মি সংকট শুরু হলে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার ইরানের সরকারি সম্পদ জব্দের নির্বাহী আদেশ দেন। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংক ও যুক্তরাষ্ট্র-সংযুক্ত আর্থিক ব্যবস্থায় থাকা ইরানি সম্পদের বড় অংশ আটকে যায়। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের ভাষ্য অনুযায়ী, সেই সময় প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার মূল্যের সরকারি সম্পদ জব্দ করা হয়।
পরবর্তী সময়ে ১৯৮১ সালের আলজিয়ার্স চুক্তির আওতায় জব্দ সম্পদের কিছু অংশ ইরান ফেরত পায়। তবে এই প্রক্রিয়া ছিল আংশিক এবং শর্তসাপেক্ষ। ইরান প্রায় ৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার ফেরত পেয়েছিল বলে প্রেস টিভির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাকি অর্থ মার্কিন কোম্পানি ও নাগরিকদের দাবির নিষ্পত্তির জন্য রাখা হয়। একই চুক্তির আওতায় হেগে গঠিত হয় ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ক্লেইমস ট্রাইব্যুনাল, যা এখনো দুই দেশের আর্থিক ও বাণিজ্যিক বিরোধ শুনানি করে।
পারমাণবিক চুক্তির পরও কেন সংকট কাটেনি
২০১৫ সালে ইরান ও বিশ্বশক্তির মধ্যে পারমাণবিক চুক্তি বা জেসিপিওএ সই হওয়ার পর ইরানের জব্দ সম্পদ ফেরত পাওয়ার আশা তৈরি হয়েছিল। তবে ঠিক কত অর্থ ইরান ব্যবহার করতে পারবে, তা নিয়ে সে সময়ও বিভিন্ন পক্ষের হিসাব আলাদা ছিল। ওবামা প্রশাসনের হোয়াইট হাউস আর্কাইভে বলা হয়েছিল, ১৫০ বিলিয়ন ডলারের দাবি অতিরঞ্জিত, নিষেধাজ্ঞা শিথিলের পর ইরান বাস্তবে প্রায় “৫০ বিলিয়ন ডলারের একটু বেশি” বিদেশি রিজার্ভে স্বাধীনভাবে প্রবেশাধিকার পেতে পারে।
অন্যদিকে, ২০১৫ সালে ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর ভালি আসেফ জানান, বিদেশে ইরানের জব্দ থাকা সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ২৩ বিলিয়ন ডলার ছিল জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে এবং বাকি ৬ বিলিয়ন ডলার ছিল ভারতের কাছে তেল বিক্রির রাজস্ব।
পারমাণবিক চুক্তির ফলে ইরান কিছু অর্থ ব্যবহারের সুযোগ পেলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রকে জেসিপিওএ থেকে সরিয়ে নেয় এবং ইরানের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করে। এর ফলে মাত্র কয়েক বছর আগে যে সম্পদের ওপর তেহরান আংশিক প্রবেশাধিকার পেয়েছিল, তার বড় অংশ আবারও কার্যত অচল হয়ে পড়ে।
কাতারে থাকা ৬ বিলিয়ন ডলারও আলোচনার কেন্দ্রে
ইরানের আটকে থাকা সম্পদের সাম্প্রতিক সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ হলো কাতারে থাকা ৬ বিলিয়ন ডলার। ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বন্দি বিনিময় চুক্তির অংশ হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়ার ব্যাংকে আটকে থাকা ইরানি তেলের রাজস্ব কাতারের নিয়ন্ত্রিত ব্যাংক অ্যাকাউন্টে স্থানান্তরের অনুমতি দেওয়া হয়। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাইডেন প্রশাসন পাঁচ মার্কিন নাগরিকের মুক্তির বিনিময়ে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে কাতারে ৬ বিলিয়ন ডলার স্থানান্তরে আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলোর জন্য নিষেধাজ্ঞা ছাড়পত্র দেয়।
তবে এই অর্থ ইরানের হাতে সরাসরি যাওয়ার কথা ছিল না। মার্কিন কর্মকর্তারা বারবার জানিয়েছেন, কাতারে থাকা অর্থ শুধু খাদ্য, ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও কৃষিপণ্যের মতো মানবিক কাজে ব্যবহার করা যাবে এবং প্রতিটি লেনদেন মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের তদারকিতে থাকবে। এপি-র আরেক প্রতিবেদনে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেন বলেন, এই অর্থ ইরান “ব্যয় বা ব্যবহার” করেনি, এটি মানবিক পণ্যের জন্য সীমিত এবং “ইরানের হাতে কখনো সরাসরি যায় না।”
রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক জ্যেষ্ঠ ইরানি সূত্র দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্র কাতারসহ বিদেশি ব্যাংকে থাকা ইরানি সম্পদ ছাড়ে সম্মত হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা দ্রুত সেই দাবি অস্বীকার করেন। একই প্রতিবেদনে দ্বিতীয় ইরানি সূত্র জানায়, আলোচনায় থাকা অর্থের মধ্যে কাতারে থাকা ৬ বিলিয়ন ডলার অন্তর্ভুক্ত। রয়টার্স আরও জানায়, এই অর্থ মূলত দক্ষিণ কোরিয়ায় আটকে থাকা ইরানি তেল বিক্রির আয়, যা ২০১৮ সালে ট্রাম্প প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালের পর আটকে যায়।
আলোচনায় আস্থার সংকট
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সম্প্রতি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর তেহরানের আস্থা তৈরি করা সহজ হবে না। তার যুক্তি, ইরান বিভিন্ন সময় আন্তর্জাতিক চুক্তিতে নিজেদের দায়িত্ব পালন করলেও যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে ইরানের আটকে থাকা সম্পদ ফেরত দেওয়া এখন তেহরানের কাছে শুধু অর্থনৈতিক দাবি নয়, বরং ওয়াশিংটনের “আন্তরিকতা” যাচাইয়ের পরীক্ষাও।
ইরানের অবস্থান হলো, জব্দ সম্পদ ফেরত দেওয়া একটি নন-নেগোশিয়েবল বা আলোচনার বাইরে থাকা শর্ত। অর্থাৎ, তেহরান মনে করছে, এই অর্থ ফেরত না পেলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বড় কোনো চুক্তি বা দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতার সম্ভাবনা কম। তবে ওয়াশিংটনের অবস্থান ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্র সাধারণত দাবি করে, নিষেধাজ্ঞা আর জব্দ সম্পদের বিষয়টি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক কার্যক্রম এবং নিরাপত্তা উদ্বেগের সঙ্গে সম্পর্কিত।
সম্ভাব্য চিত্র
বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানের জব্দ সম্পদ ও যুদ্ধক্ষতিপূরণের দাবি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। একদিকে তেহরান বলছে, যুদ্ধের ক্ষতি ও বছরের পর বছর আটকে থাকা সম্পদ ফেরত না দিলে আলোচনায় বাস্তব অগ্রগতি কঠিন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র সম্পদ ছাড়ের দাবি মানলেও তা মানবিক ব্যবহারের কঠোর শর্তের মধ্যে রাখতে চাইবে-যেমনটি ২০২৩ সালের কাতার অ্যাকাউন্টের ক্ষেত্রে দেখা গেছে।
সব মিলিয়ে, ইরানের দাবিটি এখন তিনটি স্তরে দাঁড়িয়ে আছে-প্রথমত, ১৯৭৯ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে জব্দ হওয়া রাষ্ট্রীয় সম্পদ ফেরত, দ্বিতীয়ত, কাতারসহ বিদেশি ব্যাংকে থাকা সাম্প্রতিক তেল-রাজস্বের ওপর প্রবেশাধিকার, তৃতীয়ত, সাম্প্রতিক যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ। এই তিন দাবির কোনোটিই সহজ নয়। তাই ইসলামাবাদ বা ভবিষ্যতের যেকোনো আলোচনায় এগুলো শুধু অর্থনৈতিক প্রশ্ন নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আস্থার সংকটের কেন্দ্রীয় ইস্যু হয়ে উঠতে পারে।