{{ news.section.title }}
ইরানের ৫০ কোটি ডলারের ক্রিপ্টো জব্দের দাবি যুক্তরাষ্ট্রের, পাল্টা ব্যঙ্গ তেহরানের
ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়াতে এবার দেশটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ৫০ কোটি ডলার সমমূল্যের ক্রিপ্টোকারেন্সি বা ডিজিটাল সম্পদ জব্দের দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেছেন, ওয়াশিংটনের ‘অপারেশন ইকোনমিক ফিউরি’ বা অর্থনৈতিক চাপ অভিযানের কারণে তেহরান সরকার এখন বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়েছে। তবে ইরান এই দাবিকে উপহাস করে বলছে, মার্কিন অবরোধের ফল উল্টো বিশ্ববাজারে তেলের দাম আরও বাড়িয়ে দেবে।
ফক্স বিজনেসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বেসেন্ট দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ৩৫ কোটি ডলারের ক্রিপ্টো সম্পদ নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। এর আগে আরও প্রায় ১০ কোটি ডলারের সম্পদ জব্দ করা হয়েছিল। সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত ইরান-সংশ্লিষ্ট প্রায় ৫০ কোটি ডলারের ডিজিটাল সম্পদ যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলে দাবি করেন তিনি। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে ইরানি ব্যাংক হিসাব জব্দ বা ফ্রিজ করার কার্যক্রমও চলছে বলে জানান মার্কিন অর্থমন্ত্রী।
তবে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের আগের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক ক্রিপ্টো ওয়ালেটের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ৩৪ কোটি ৪০ লাখ ডলারের ডিজিটাল সম্পদ ফ্রিজ করেছে। অর্থাৎ ফক্স বিজনেসে বেসেন্টের সাম্প্রতিক বক্তব্যে আগের জব্দকৃত সম্পদসহ মোট পরিমাণ প্রায় ৫০ কোটি ডলারের কাছাকাছি বলা হয়েছে।
কী এই ‘অপারেশন ইকোনমিক ফিউরি’
‘অপারেশন ইকোনমিক ফিউরি’ মূলত ইরানের অর্থনীতি, তেল রপ্তানি, আন্তর্জাতিক লেনদেন, ক্রিপ্টো নেটওয়ার্ক এবং তথাকথিত ‘শ্যাডো ব্যাংকিং’ কাঠামোর ওপর চাপ বাড়ানোর মার্কিন অভিযান। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই অভিযানের লক্ষ্য ইরানের তেল পরিবহন, মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান, ক্রেতা এবং গোপন আর্থিক নেটওয়ার্ককে সংকুচিত করা। বেসেন্ট বলেন, ইরানের আঞ্চলিক আগ্রাসন এবং পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা সীমিত করতেই এই অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে।
বেসেন্টের দাবি, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বছরের মার্চে এই অর্থনৈতিক চাপ অভিযান শুরু করার নির্দেশ দেন। প্রায় তিন সপ্তাহ আগে তিনি ইরানের ওপর চাপ আরও বাড়ানোর নির্দেশ দেন। এর পর থেকেই ট্রেজারি বিভাগ ক্রিপ্টো সম্পদ, ব্যাংক হিসাব, তেলবাহী জাহাজ, শিপিং কোম্পানি এবং ইরানি তেলের ক্রেতাদের লক্ষ্য করে নতুন নিষেধাজ্ঞা জারি করছে।
ক্রিপ্টো কেন যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যবস্তু
যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ইরান ক্রিপ্টোকারেন্সি ও বিকল্প আর্থিক চ্যানেল ব্যবহার করছে। প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় নিষেধাজ্ঞা থাকায় ডিজিটাল ওয়ালেট, মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান, শিপিং নেটওয়ার্ক এবং ছদ্মবাণিজ্য ব্যবস্থার মাধ্যমে তেল বিক্রির অর্থ লেনদেনের চেষ্টা করছে তেহরান-এমন দাবি ওয়াশিংটনের। ট্রেজারি বিভাগের ভাষায়, ইরানের “আন্তর্জাতিক শ্যাডো ব্যাংকিং অবকাঠামো”, ক্রিপ্টো অ্যাক্সেস, শ্যাডো ফ্লিট এবং তেল ক্রেতাদের ওপর সমন্বিত চাপ দেওয়া হচ্ছে।
ক্রিপ্টো খাতকে লক্ষ্য করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নতুন নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উত্তর কোরিয়া, রাশিয়া, ইরানসহ বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞাভুক্ত দেশ ও গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ডিজিটাল সম্পদ ব্যবহারের অভিযোগ তুলেছে ওয়াশিংটন। তবে ইরান যুদ্ধ ও হরমুজ সংকটের মধ্যে এত বড় অঙ্কের ক্রিপ্টো ফ্রিজের দাবি এই চাপ অভিযানের নতুন মাত্রা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইরানি তেলের ক্রেতাদেরও সতর্কবার্তা
ক্রিপ্টো জব্দের পাশাপাশি ইরানি তেলের ক্রেতা বিদেশি প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকের ওপরও চাপ বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। বেসেন্ট বলেছেন, কোনো দেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠান বা ব্যাংক যদি ইরানি তেলের লেনদেনে যুক্ত থাকে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধেও ‘সেকেন্ডারি স্যাংশন’ বা দ্বিতীয় পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হতে পারে। এর অর্থ, সরাসরি ইরানি প্রতিষ্ঠান না হলেও ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা তৃতীয় দেশের কোম্পানি, ব্যাংক বা শিপিং প্রতিষ্ঠানের ওপরও মার্কিন নিষেধাজ্ঞা পড়তে পারে।
এই নীতির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি চীনের হেংলি পেট্রোকেমিক্যালের দালিয়ান রিফাইনারির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ওয়াশিংটনের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটি ইরান থেকে বিলিয়ন ডলারের তেল কিনেছে। রয়টার্স জানিয়েছে, ২০১৯ সালে ইরান নিষেধাজ্ঞা পুনরায় জোরদারের পর এটি চীনের সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মার্কিন পদক্ষেপগুলোর একটি। চীন এই নিষেধাজ্ঞাকে অবৈধ ও একতরফা বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
রয়টার্স আরও জানিয়েছে, চীন ইরানি তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা। ২০২৫ সালে ইরানের সমুদ্রপথে রপ্তানি হওয়া তেলের ৮০ শতাংশের বেশি চীনে গেছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। অনেক সময় তেলের উৎস আড়াল করতে তা মালয়েশিয়া বা ইন্দোনেশিয়ার তেল হিসেবে দেখানোর অভিযোগও রয়েছে।
তেল অবরোধ ও জ্বালানি বাজারের চাপ
ইরানের তেল রপ্তানি বন্ধ বা সীমিত করতে যুক্তরাষ্ট্র শুধু আর্থিক নিষেধাজ্ঞা নয়, বন্দর ও সমুদ্রপথের ওপরও চাপ বাড়িয়েছে। হরমুজ প্রণালি ঘিরে চলমান অচলাবস্থা এবং ইরানি বন্দরগামী জাহাজ আটকে দেওয়ার হুমকি বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এই অবরোধ ইরানের অর্থনীতিকে চাপে ফেলছে। অন্যদিকে ইরান বলছে, অবরোধ দীর্ঘ হলে তেলের দাম আরও বাড়বে এবং পশ্চিমা ভোক্তারাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
আল জাজিরার লাইভ আপডেটে বলা হয়েছে, মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের বক্তব্যের পর ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপ অভিযানের কার্যকারিতা নিয়ে ব্যঙ্গ করেছেন। তিনি বেসেন্টের বক্তব্যকে ‘অসার’ বলে ইঙ্গিত করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এমন নীতিই তেলের দাম ১২০ ডলারের ওপরে তুলেছে, পরবর্তী লক্ষ্য ১৪০ ডলার।
গালিবাফের পাল্টা বার্তা
গালিবাফের বক্তব্যে ইরানের অবস্থান স্পষ্ট-তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধকে ভয় দেখানোর কৌশল হিসেবে দেখছে এবং দাবি করছে, ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো ভেঙে পড়েনি। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, তেল জমে যাওয়ার চাপে ইরানের তেলকূপ ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সেই মন্তব্যের জবাবেই গালিবাফ বলেন, তিন দিন পেরিয়ে গেলেও কোনো কূপ বিস্ফোরিত হয়নি, চাইলে সেটি ৩০ দিন পর্যন্ত “লাইভস্ট্রিম” করা যাবে। এই ব্যঙ্গাত্মক বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ইরান বোঝাতে চাইছে, যুক্তরাষ্ট্র অবরোধের প্রভাব অতিরঞ্জিত করছে। একই সঙ্গে তেহরান পশ্চিমা বাজারে মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানি সংকটের ভয়কে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।
ওয়াশিংটনের কৌশল: অর্থনৈতিক শ্বাসরোধ
বেসেন্টের ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র এখন ইরানের “সব আর্থিক লাইফলাইন” অনুসরণ করছে। অর্থাৎ তেল রপ্তানি, ক্রিপ্টো লেনদেন, ব্যাংকিং চ্যানেল, শিপিং নেটওয়ার্ক, মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান, বিদেশি ক্রেতা-সব ক্ষেত্রেই চাপ বাড়ানো হচ্ছে। ট্রেজারি বিভাগের বিবৃতিতেও বলা হয়েছে, ইরানের তেল পরিবহন বা গোপন অর্থায়নে যুক্ত যেকোনো ব্যক্তি, কোম্পানি বা জাহাজ মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিতে পড়বে।
এই কৌশলের উদ্দেশ্য হলো সরাসরি সামরিক সংঘাত আরও না বাড়িয়ে ইরানের অর্থনৈতিক সক্ষমতা কমিয়ে আনা। তবে এর ঝুঁকিও বড়। ইরানের তেল সরবরাহ কমে গেলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে। এতে যুক্তরাষ্ট্রসহ আমদানিনির্ভর অর্থনীতিগুলোর ভোক্তা, শিল্প ও পরিবহন খরচ বেড়ে যেতে পারে।
সংকটের বড় প্রেক্ষাপট
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত এখন আর শুধু সামরিক বা কূটনৈতিক ইস্যুতে সীমাবদ্ধ নেই। এটি ক্রিপ্টোকারেন্সি, তেল, ব্যাংকিং, শিপিং, বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি এবং জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ক্রিপ্টো সম্পদ জব্দ ও ব্যাংক হিসাব ফ্রিজের মাধ্যমে ইরানের অর্থনীতি সংকটে পড়ছে। কিন্তু ইরানের পাল্টা বক্তব্য, এই চাপের ফলেই তেলের দাম বেড়ে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর নতুন বোঝা তৈরি হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক যত বেশি লক্ষ্যবস্তু হবে, তত বেশি বিকল্প আর্থিক পথ, ছদ্ম তেলবাণিজ্য, ক্রিপ্টো লেনদেন ও তৃতীয় দেশের মধ্যস্থতা বাড়তে পারে। ফলে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে যুক্তরাষ্ট্রকে শুধু ইরান নয়, চীনসহ বড় ক্রেতা দেশ ও আন্তর্জাতিক শিপিং নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধেও কঠোর হতে হবে।
তথ্যসূত্র: ফক্স বিজনেস