১০ হাজার কোটি টাকা ধার চায় ইসলামী ব্যাংক

১০ হাজার কোটি টাকা ধার চায় ইসলামী ব্যাংক
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

দেশের সবচেয়ে বড় শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি আবারও তারল্য চাপে পড়েছে। গ্রাহকদের ব্যাপক আমানত উত্তোলন, চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে চলমান অস্থিরতা এবং ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ অনিশ্চয়তার মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ১০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তারল্য সহায়তা (লিকুইডিটি সাপোর্ট) চেয়েছে ব্যাংকটি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র মোহাম্মদ শাহরিয়ার সিদ্দিকী গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ইসলামী ব্যাংক ১০ হাজার কোটি টাকা সহায়তা চেয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখনো এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি।

 

ব্যাংক সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, গত ২৪ মে সাবেক বাংলাদেশ ব্যাংক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশিদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পর থেকেই গ্রাহকদের একাংশের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। এর জেরে ঈদের ছুটির পর ১ জুন থেকে বিভিন্ন শাখার সামনে বিক্ষোভ শুরু হয় এবং অল্প সময়ের মধ্যেই আমানত উত্তোলনের চাপ বাড়তে থাকে।

 

ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তথ্য অনুযায়ী, ১ জুন থেকে ৭ জুন পর্যন্ত মাত্র এক সপ্তাহে আমানত কমেছে প্রায় ৪ হাজার ২৪১ কোটি টাকা। একই সময়ে ব্যাংকের মোট আমানত ১ লাখ ৮৪ হাজার ৩৮২ কোটি টাকা থেকে কমে ১ লাখ ৮০ হাজার ১৪১ কোটিতে নেমে এসেছে।

 

ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আলতাফ হোসেনও স্বীকার করেছেন যে, চলমান অস্থিরতার কারণে অনেক গ্রাহক আমানত তুলে নিচ্ছেন। তার মতে, অনিশ্চয়তা ও বিভিন্ন ধরনের প্রচারণা গ্রাহকদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

 

সূত্র জানায়, ব্যাপক নগদ উত্তোলনের কারণে বাংলাদেশ ব্যাংকে ইসলামী ব্যাংকের চলতি হিসাবের স্থিতিও দ্রুত কমে গেছে। কিছুদিন আগেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকে তাদের হিসাবের স্থিতি ছিল ৭ হাজার কোটির বেশি। বর্তমানে তা নেমে এসেছে প্রায় ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকায়। এর ফলে ব্যাংকটির নগদ জমা সংরক্ষণ হার (সিআরআর) রক্ষায় চাপ তৈরি হয়েছে।

 

বর্তমান সংকটকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে ইসলামী ব্যাংকের সাম্প্রতিক ইতিহাস। ২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপ ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর বিপুল পরিমাণ ঋণ বিতরণ, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি এবং তারল্য সংকট নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২০২৪ সালে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয় এবং ধীরে ধীরে ব্যাংকটি সংকট কাটিয়ে উঠতে শুরু করেছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রিজার্ভ অবস্থানও কিছুটা শক্তিশালী হয়েছিল।

 

কিন্তু নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগকে ঘিরে সৃষ্ট বিরোধ পরিস্থিতিকে আবারও অস্থিতিশীল করে তুলেছে। "সচেতন গ্রাহক ফোরাম" ব্যানারে কয়েকদিন ধরে বিক্ষোভ চলছে। আন্দোলনকারীরা চেয়ারম্যানের নিয়োগ বাতিল, সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওমর ফারুক খানের পুনর্বহাল এবং গ্রাহকদের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে আসছেন।

 

ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতি শুধু একটি ব্যাংকের সংকট নয়; এটি দেশের আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার সঙ্গেও জড়িত। কারণ আমানত, গ্রাহকসংখ্যা এবং শাখা নেটওয়ার্কের দিক থেকে ইসলামী ব্যাংক দেশের অন্যতম বৃহৎ আর্থিক প্রতিষ্ঠান। ফলে গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং দ্রুত তারল্য পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।


সম্পর্কিত নিউজ