প্রকল্প বাস্তবায়নে সংসদ সদস্যপ্রতি ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিচ্ছে এলজিইডি

প্রকল্প বাস্তবায়নে সংসদ সদস্যপ্রতি ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিচ্ছে এলজিইডি
ছবির ক্যাপশান, ছবি: জাগরণ

নিজ নিজ সংসদীয় আসনের রাস্তাঘাট ও গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য সংসদ সদস্যদের প্রতি আসনে ৫০ কোটি টাকা করে বরাদ্দ দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে সরকার। পাঁচ বছরের মেয়াদে প্রতিবছর ১০ কোটি টাকা করে এই অর্থ ব্যয় করা হবে। এর মাধ্যমে সংসদ সদস্যরা নিজেদের অগ্রাধিকার অনুযায়ী বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়নকাজের প্রস্তাব দিতে পারবেন।

নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের জন্য এই বরাদ্দ নিশ্চিত করতে ‘অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ পল্লি অবকাঠামো উন্নয়ন (বিভাগওয়ারি)’ নামে একটি প্রকল্প প্রস্তাব করেছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। প্রকল্পটি ইতোমধ্যে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা।

 

এলজিইডির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সংসদ সদস্যরা তাদের নির্বাচনী এলাকার প্রয়োজন অনুযায়ী রাস্তাঘাট, সেতু, কালভার্ট, হাটবাজার, ঘাটসহ বিভিন্ন অবকাঠামোর তালিকা দেবেন। সেই তালিকার ভিত্তিতে এলজিইডি উন্নয়নকাজ বাস্তবায়ন করবে।

 

সংসদ সদস্যদের জন্য এ ধরনের বিশেষ বরাদ্দ প্রথম চালু হয় ২০০৫-০৬ অর্থবছরে। সে সময় সরকার ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে প্রত্যেক সদস্যের জন্য দুই কোটি টাকার তহবিল বরাদ্দের প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। পরে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন পায়।

 

পরবর্তী সময়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও একাধিকবার সংসদ সদস্যদের জন্য এ ধরনের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর একই ধরনের একটি প্রকল্প নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল, যেখানে প্রতি আসনের জন্য ২৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব ছিল। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের কারণে প্রকল্পটি অনুমোদন পায়নি।

 

এ ধরনের প্রকল্প নিয়ে অতীতেও নানা বিতর্ক ও সমালোচনা হয়েছে। বিশেষ করে সংসদ সদস্যদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততা থাকলে স্বজনপ্রীতি, অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

 

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে যদি সংসদ সদস্যদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকা থাকে, তাহলে অতীতের মতোই বিভিন্ন অভিযোগ পুনরায় উঠতে পারে।

 

সংসদ সদস্যদের পছন্দ অনুযায়ী রাস্তাঘাট ও গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে বরাদ্দ দেওয়ার ক্ষেত্রে অতীতে মূলত দুটি প্রশ্ন সামনে এসেছে। প্রথমত, এসব প্রকল্পে স্বজনপ্রীতি, অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে কাজের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। দ্বিতীয়ত, স্থানীয় উন্নয়নের দায়িত্ব যেহেতু স্থানীয় সরকারের, আর সংসদ সদস্যদের মূল দায়িত্ব আইন প্রণয়ন করা, তাই তাদের পছন্দমতো উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া কতটা যৌক্তিক-তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।

 

আট বিভাগে আটটি পৃথক প্রকল্প

নতুন প্রস্তাবিত প্রকল্প নিয়ে গত ২৩ মে সচিবালয়ে প্রকল্প যাচাই কমিটির একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার পদ্ধতির পরিবর্তে এবার ভিন্ন কাঠামোয় প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে বিএনপি সরকার।

 

সারা দেশের জন্য একটি প্রকল্প না নিয়ে আটটি বিভাগের জন্য আলাদা আটটি প্রকল্প গ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়েছে। সভায় আলোচনা হয়, একক প্রকল্পের আওতায় পুরো দেশের কাজ পরিচালনা করা কঠিন। একই সঙ্গে বিপুল অর্থের একটি প্রকল্প ব্যবস্থাপনা এবং একজন প্রকল্প পরিচালকের মাধ্যমে সারা দেশের কাজ তদারকি করাও জটিল হয়ে পড়ে।

 

 

নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ঢাকা বিভাগের ৫৫টি সংসদীয় আসন, রাজশাহী বিভাগের ৩৮টি, রংপুর বিভাগের ৩৩টি, খুলনা বিভাগের ৩৪টি, বরিশাল বিভাগের ২১টি, ময়মনসিংহ বিভাগের ২৪টি, সিলেট বিভাগের ১৯টি এবং চট্টগ্রাম বিভাগের ৫৫টি সংসদীয় আসনের জন্য পৃথক প্রকল্প নেওয়া হবে। প্রতিটি প্রকল্পের জন্য একজন করে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হবে।

 

এলজিইডির পরিকল্পনা শাখার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবু সালেহ মোহাম্মদ হানিফ বলেন, প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হবে। আগে যেসব সড়কের উন্নয়নকাজ সম্পন্ন হয়েছে, সেগুলোর জন্য নতুন করে বরাদ্দ দেওয়া হবে না।

 

বরাদ্দ পাবেন ২৭৯ জন সংসদ সদস্য

নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকার উন্নয়নের জন্য মোট ২৭৯ জন সংসদ সদস্য এই বরাদ্দের আওতায় আসবেন। তবে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের আওতাধীন ১৫টি আসন, চট্টগ্রামের ৩টি, রাজশাহীর ১টি এবং খুলনার ২টি-মোট ২১টি আসনের জন্য কোনো বরাদ্দ রাখা হবে না। কারণ এসব এলাকা সিটি করপোরেশনের অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া সংরক্ষিত নারী আসনের ৫০ জন সংসদ সদস্যও এ বরাদ্দের আওতায় থাকবেন না।

 

সূত্র জানায়, ২৭৯টি সংসদীয় আসনের জন্য পাঁচ বছরে মোট ব্যয় হবে ১৩ হাজার ৯৫০ কোটি টাকা। এর বাইরে প্রকল্প পরিচালনা, জনবল নিয়োগ, বেতন-ভাতা ও অন্যান্য প্রশাসনিক ব্যয়ের জন্য আরও প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে।

 

প্রতি আসনে বরাদ্দ কেন দ্বিগুণ করা হচ্ছে-এ বিষয়ে এলজিইডির পরিকল্পনা শাখার একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নির্মাণসামগ্রীর মূল্য বেড়েছে এবং মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় ব্যয় আরও বাড়তে পারে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই আসনপ্রতি ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।

 

সংসদ সদস্যদের অনেকে মনে করেন, এ ধরনের প্রকল্পের প্রয়োজন রয়েছে। লক্ষ্মীপুর-২ (সদর আংশিক ও রায়পুর) আসনের সংসদ সদস্য আবুল খায়ের ভূঁইয়া বলেন, বিগত সরকারের সময়ে তাঁর এলাকায় রাস্তাঘাটের উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন হয়নি। তাই জরুরি ভিত্তিতে এসব অবকাঠামোর উন্নয়ন প্রয়োজন।

 

দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ

দুর্নীতি প্রতিরোধবিষয়ক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ২০২০ সালে ‘অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ পল্লি অবকাঠামো উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতায় বাস্তবায়িত ৬২৮টি কর্মসূচি পর্যবেক্ষণ করে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

 

প্রতিবেদনে বহুমাত্রিক দুর্নীতি, অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির চিত্র উঠে আসে। এতে বলা হয়, পর্যবেক্ষণ করা প্রকল্পগুলোর ৩৩ শতাংশের কাজের মান সন্তোষজনক ছিল না।

 

অতীত অভিজ্ঞতা কী বলছে

সংসদ সদস্যদের পছন্দ অনুযায়ী অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য ২০১০ সালে ৪ হাজার ৮৯২ কোটি টাকা, ২০১৫ সালে ৬ হাজার ৭৬ কোটি টাকা এবং ২০২০ সালে ৬ হাজার ৫২৬ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। নবম জাতীয় সংসদের সদস্যরা প্রতি আসনে ১৫ কোটি টাকা করে এবং দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদের সদস্যরা ২০ কোটি টাকা করে বরাদ্দ পেয়েছিলেন।

 

২০২০ সালে নেওয়া ‘অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ পল্লি অবকাঠামো উন্নয়ন-৩’ প্রকল্পের কাজ আগামী ৩০ জুন শেষ হওয়ার কথা। তবে এলজিইডির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত প্রকল্পে ৫ হাজার ৮৪৭ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এখনও ৮২৩টি প্যাকেজের কাজ চলমান রয়েছে এবং আরও ৭৭টি কর্মসূচির জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্প শেষ করা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

 

টিআইবির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এসব প্রকল্পে মোট ব্যয়ের ৮ থেকে প্রায় ১৩ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এতে এলজিইডির কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্পৃক্ততার কথা উঠে এসেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যরা তাদের প্রভাব খাটিয়ে প্রকল্পের কাজ পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন, দলীয় কর্মী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে বণ্টন করে দিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে ১ থেকে ২ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে।

 

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অতীতে পরিচালিত গবেষণায় দলীয়করণ, অর্থের অপচয় ও দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। তাই এবারও যদি সংসদ সদস্যদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততা থাকে, তাহলে একই ধরনের অভিযোগ পুনরায় উঠতে পারে।

 

সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক বিতর্ক

বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব আইন প্রণয়ন করা। অন্যদিকে ৫৯ অনুচ্ছেদে স্থানীয় উন্নয়নকাজকে স্থানীয় সরকারের দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার আওতায় জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদ এবং শহরাঞ্চলে সিটি করপোরেশন রয়েছে। যদিও বিশেষজ্ঞদের মতে, জেলা ও উপজেলা পরিষদের অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকারিতা সীমিত।

 

স্থানীয় উন্নয়নকাজে সংসদ সদস্যদের সম্পৃক্ত করা উচিত কি না, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। সংসদ সদস্য, জেলা প্রশাসক, জেলা পরিষদ ও উপজেলা চেয়ারম্যানদের মধ্যে ক্ষমতা ও দায়িত্ব নিয়ে দ্বন্দ্বও নতুন নয়।

 

অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা

টিআইবির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ ছাড়াও বিশ্বের অন্তত ২৩টি দেশে সংসদীয় আসনের উন্নয়নের জন্য সংসদ সদস্যদের থোক বরাদ্দ দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।

 

ভারত, ভুটান, কেনিয়া, ঘানা, উগান্ডা, জ্যামাইকা, পাপুয়া নিউগিনি ও সলোমন আইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করে টিআইবি জানিয়েছে, এসব দেশে আইনি কাঠামো, বরাদ্দের ধরন, বাস্তবায়ন পদ্ধতি, পরিচালনা ব্যবস্থা, তদারকি এবং তথ্য উন্মুক্ততার ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন চর্চা রয়েছে।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক সালাহউদ্দিন এম আমিনুজ্জামান বলেন, তাত্ত্বিকভাবে সংসদ সদস্যদের প্রধান দায়িত্ব আইন প্রণয়ন করা। তবে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক বাস্তবতায় দেখা যায়, রাজনীতিবিদরা আইন প্রণয়নের পাশাপাশি নিজ নিজ এলাকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডেও যুক্ত থাকেন। জনগণও সাধারণত চায় তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধি এলাকার উন্নয়নে ভূমিকা রাখুক। তবে এই চর্চা কতটা কাঙ্ক্ষিত এবং সাংবিধানিকভাবে কতটা উপযুক্ত, তা নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে।


সম্পর্কিত নিউজ