অবশেষে ১১৫ দিন আটকে থাকা ক্রুড অয়েল নিয়ে আসছে ‘নর্ডিক পোলাক্স’

অবশেষে ১১৫ দিন আটকে থাকা ক্রুড অয়েল নিয়ে আসছে ‘নর্ডিক পোলাক্স’
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

প্রায় চার মাসেরও বেশি সময় ধরে আটকে থাকার পর অবশেষে বাংলাদেশের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছে ১ লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেলবাহী জাহাজ ‘নর্ডিক পোলাক্স’। সৌদি আরবের রাস তানুরা বন্দর থেকে গত ১ মার্চ অপরিশোধিত তেল বোঝাই করার পর হরমুজ প্রণালিতে সৃষ্ট অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে জাহাজটি দীর্ঘদিন আটকে ছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে নৌপথে চলাচলের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ কিছুটা শিথিল হওয়ায় গত ২৪ জুন জাহাজটি নিরাপদে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছে।

বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি) জানিয়েছে, সবকিছু স্বাভাবিক থাকলে আগামী ৬ জুলাই জাহাজটি চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছাবে। জাহাজটিতে থাকা ১ লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন করে স্বস্তি ফিরিয়ে আনবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক বলেন, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার পর দেশের জ্বালানি সরবরাহে কোনো বড় ধরনের সংকট তৈরি না হয়, সে জন্য সরকার দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা নেয়। তখন সৌদি আরবের লোহিত সাগর তীরবর্তী ইয়ানবু এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরা বন্দর থেকে অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখা হয়।

 

তিনি আরও জানান, প্রায় ১১৫ দিন জাহাজটি আটকে থাকায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ডেমারেজ (অতিরিক্ত অবস্থানজনিত ব্যয়) তৈরি হয়েছে। তবে সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) কিংবা বিএসসিকে এই অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হবে না। সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) চুক্তির শর্ত অনুযায়ী পুরো ডেমারেজ ব্যয় বহন করবে জ্বালানি তেল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান।

 

বাংলাদেশ সরকার দীর্ঘদিন ধরেই সরকারি পর্যায়ের জিটুজি চুক্তির আওতায় সৌদি আরবের আরামকো এবং আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি (এডনক) থেকে বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে থাকে। সাধারণত এসব তেল সৌদি আরবের রাস তানুরা এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলী বন্দর থেকে হরমুজ প্রণালি হয়ে চট্টগ্রামে পৌঁছায়।

 

কিন্তু চলতি বছরের শুরুতে মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি এবং হরমুজ প্রণালিতে নৌচলাচল ব্যাহত হওয়ায় এই গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুট কার্যত অচল হয়ে পড়ে। এর ফলে নর্ডিক পোলাক্স জাহাজটি ১ লাখ টন অপরিশোধিত তেলসহ সৌদি আরবেই আটকে যায়। একই সঙ্গে বাংলাদেশে অপরিশোধিত জ্বালানির সরবরাহে চাপ তৈরি হয়।

 

পরিস্থিতির প্রভাব পড়ে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডে (ইআরএল)। পর্যাপ্ত কাঁচামাল না থাকায় গত ১৪ এপ্রিল অপরিশোধিত তেলের সংকটে রিফাইনারির উৎপাদন কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। এর ফলে দেশের মোট জ্বালানি সরবরাহ প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায় এবং বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হয়।

 

সংকট মোকাবিলায় সরকার তুলনামূলক বেশি দামে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি শুরু করে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমাতে সৌদি আরবের ইয়ানবু এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরা বন্দরকে বিকল্প রুট হিসেবে ব্যবহার করে অপরিশোধিত তেল আমদানি অব্যাহত রাখা হয়। এই উদ্যোগের ফলে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয়েছে।

 

বর্তমানে বিকল্প রুট দিয়েও নিয়মিত অপরিশোধিত তেল দেশে আসছে। ফলে ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদন কার্যক্রম আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরেছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতিও ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে যাচ্ছে। এমন অবস্থায় দীর্ঘদিন আটকে থাকা নর্ডিক পোলাক্সের বাংলাদেশে পৌঁছানো দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করেছে যে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে একটি মাত্র নৌপথের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ। ভবিষ্যতে জ্বালানি সরবরাহ নিরাপদ রাখতে বিকল্প রুট, কৌশলগত মজুত বৃদ্ধি এবং বহুমুখী আমদানি ব্যবস্থার ওপর আরও জোর দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।


সম্পর্কিত নিউজ