কীটনাশকে শীর্ষ তালিকায় বাংলাদেশ - প্রতি হেক্টরে কতটা ব্যবহার হয়?

কীটনাশকে শীর্ষ তালিকায় বাংলাদেশ - প্রতি হেক্টরে কতটা ব্যবহার হয়?
ছবির ক্যাপশান, কীটনাশকে শীর্ষ তালিকায় বাংলাদেশ - প্রতি হেক্টরে কতটা ব্যবহার হয়?

বাংলাদেশে গত কয়েক দশকে কৃষিতে রাসায়নিক সারের ব্যবহার অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও গবেষণা তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে প্রতি হেক্টরে প্রায় ৭০০ কেজি রাসায়নিক সার ব্যবহার করা হয়, যেখানে কয়েক দশক আগে এই পরিমাণ ছিল মাত্র ৮.৫ কেজি। অর্থাৎ স্বল্প সময়ে প্রায় ৮০ গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে এই ব্যবহার।

তুলনামূলকভাবে, আফ্রিকার দেশ উগান্ডায় সারের ব্যবহার এখনো খুবই সীমিত-প্রতি হেক্টরে গড়ে মাত্র ৩.৩ কেজি, যা বৈশ্বিক গড়ের তুলনায়ও অনেক কম (সূত্র: FAO ও বিশ্বব্যাংক ডেটা বিশ্লেষণ)।

 

কীটনাশক ব্যবহারের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যায়। বাংলাদেশে প্রতি হেক্টরে প্রায় ১.৮ কেজি কীটনাশক প্রয়োগ করা হয় এবং এই সূচকে দেশটি বিশ্বে শীর্ষ ৩০-এর মধ্যে রয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয় ও আমদানি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৫ সালে যেখানে কীটনাশক আমদানি ছিল প্রায় ১২ হাজার টন, ২০২০ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৭ হাজার টনে। গড়ে প্রায় ১০ শতাংশ বার্ষিক হারে এই বৃদ্ধি ঘটেছে, যা দীর্ঘ তিন দশকের বেশি সময় ধরে অব্যাহত।

 

২০২৪ সাল নাগাদ এই খাতে ৮০০-এর বেশি কোম্পানি সক্রিয় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট শিল্প সূত্রে জানা গেছে।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো কৃষকদের সচেতনতার অভাব। বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশের প্রায় ৯০ শতাংশের বেশি কৃষক নিষিদ্ধ কীটনাশক সঠিকভাবে শনাক্ত করতে পারেন না। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিকের ব্যবহার অব্যাহত রয়েছে।

 

স্বাস্থ্য খাতে এর প্রভাবও দৃশ্যমান। গ্লোবাল ক্যান্সার অবজারভেটরি (GLOBOCAN) ২০২২ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১.৬৭ লাখ নতুন ক্যান্সার রোগী শনাক্ত হয় এবং মৃত্যুর সংখ্যা এক লাখের বেশি। ফুসফুস, স্তন এবং পাচনতন্ত্রের ক্যান্সার সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।

 

বিশ্বব্যাংকের একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশে প্রায় ২৭ শতাংশ কৃষক প্রতি বছর কীটনাশকজনিত স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত হন। দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শ ক্যান্সার, স্নায়বিক জটিলতা এবং হরমোনজনিত সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।

 

ঢাকার কয়েকটি বিশেষায়িত ক্যান্সার হাসপাতালের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, রক্তের ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের ক্ষেত্রে কীটনাশক ব্যবহারের ইতিহাস রয়েছে-যা বিষয়টিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।

 

আরো পড়ুন : ত্বক ভালো রাখতে কী ধরনের পুষ্টি দরকার? - জেনে নিন

 

অন্যদিকে, উগান্ডায় ক্যান্সারের ধরণ ভিন্ন। সেখানে প্রতি লাখে প্রায় ৭৪ জন ক্যান্সারে আক্রান্ত হন, যা বাংলাদেশের তুলনায় কম (বাংলাদেশে প্রায় ১০৬ জন)। উগান্ডায় অধিকাংশ ক্যান্সার সংক্রমণজনিত-যেমন HIV/AIDS, HPV এবং হেপাটাইটিস B-এর সঙ্গে সম্পর্কিত (সূত্র: WHO ও আন্তর্জাতিক ক্যান্সার গবেষণা সংস্থা)।

 

খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের প্রায় ৭০ শতাংশের বেশি সবজিতে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ পাওয়া যায়, যার একটি বড় অংশ নিরাপদ সীমা অতিক্রম করে। এছাড়া কাঁচা দুধের উল্লেখযোগ্য অংশে অ্যান্টিবায়োটিক, ডিটারজেন্ট বা ফরমালিনের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে খাদ্য তদারকির জনবল অত্যন্ত সীমিত-প্রায় ১৫০ জন পরিদর্শক দিয়ে পুরো দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন।

 

অন্যদিকে, উগান্ডা ২০০৪ সালে জাতীয় অর্গানিক মানদণ্ড এবং ২০০৭ সালে আঞ্চলিক অর্গানিক স্ট্যান্ডার্ড গ্রহণ করে। দেশটি ধীরে ধীরে জৈব কৃষির দিকে ঝুঁকছে এবং রাসায়নিক নির্ভরতা সীমিত রাখার চেষ্টা করছে।

 

কৃষি ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে টেকসই কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে সচেতনতা বৃদ্ধি, কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনা জরুরি হয়ে উঠেছে।

 


সম্পর্কিত নিউজ