{{ news.section.title }}
জলাতঙ্কের রোগী বাড়ছে, বন্ধ কুকুরের টিকাদান কর্মসূচি
রাজধানীতে পথকুকুরের আক্রমণ ও জলাতঙ্ক ঝুঁকি নতুন করে আলোচনায় এসেছে এক শিশুকে কামড়ানোর ঘটনার পর। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, এ ধরনের ঘটনার সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় উদ্বেগ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
উত্তরখানে শিশুকে কামড়
গত ১৫ এপ্রিল সকালে উত্তরখান এলাকায় তিন বছর বয়সী শিশু আনাসের হাতে থাকা খাবারের দিকে আকৃষ্ট হয়ে একটি কুকুর কাছে আসে। ভয় পেয়ে শিশুটি দৌড়ে পালাতে গেলে কুকুরটি তার বাঁ হাতে কামড় বসায়। পরবর্তীতে তাকে দ্রুত নিয়ে যাওয়া হয় সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল মহাখালী–এ, যেখানে তাকে জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকা দেওয়া হয়।
শিশুটির বাবা ইমন বলেন, ‘কুকুরটা কার, জানি না। হঠাৎ করেই এসে কামড় দেয়। জলাতঙ্কের ভয়ে আছি। স্থানীয় চিকিৎসকের পরামর্শে তাই দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে এসেছি।’
বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা
হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, কুকুর ও বিড়ালের আক্রমণে চিকিৎসা নেওয়া মানুষের সংখ্যা গত কয়েক বছরে দ্রুত বেড়েছে-
২০২৩ সালে: ৯৪,৩৮০ জন, ২০২৪ সালে: ১,২২,২৬৩ জন, ২০২৫ সালে: ১,৪৬,২৪৩ জন, ২০২৬ সালের ১৭ মার্চ পর্যন্ত: ৩৬,৭৫১ জন
হাসপাতাল–সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রোগীর এই বৃদ্ধি মূলত পথকুকুরের সংখ্যা বাড়া এবং টিকাদান কার্যক্রমের স্থবিরতার সঙ্গে সম্পর্কিত। একজন দায়িত্বরত চিকিৎসক (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, ‘অনেকেই দেরিতে আসেন। কেউ প্রথমে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নিয়ে পরে আসেন। এতে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।’
জলাতঙ্ক: লক্ষণ দেখা দিলে প্রায় নিশ্চিত মৃত্যু
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, জলাতঙ্ক এমন একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যার লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার পর প্রায় শতভাগ ক্ষেত্রে মৃত্যু ঘটে। ফলে কামড় বা আঁচড়ের পর দ্রুত চিকিৎসা ও টিকা নেওয়াই একমাত্র কার্যকর প্রতিরোধ।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে জলাতঙ্কে মৃত্যুও বেড়েছে-
২০২৩ সালে মৃত্যু: ৪২ জন, ২০২৪ সালে: ৫৮ জন, ২০২৫ সালে: ৫৯ জন, ২০২৬ সালের প্রথম আড়াই মাসে: ১৯ জন
কুকুর নিয়ন্ত্রণ ও টিকাদান কার্যক্রম স্থবির
জলাতঙ্ক নির্মূলে ২০১০ সাল থেকে দেশে একটি সমন্বিত কর্মসূচি চালু ছিল। এতে কুকুরকে টিকা দেওয়া, জন্মনিয়ন্ত্রণ, জনসচেতনতা এবং আক্রান্তদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা হতো। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ কর্মসূচির আওতায় ৬০টির বেশি জেলায় প্রায় ২৯ লাখ কুকুরকে টিকা দেওয়া হয়েছিল। ৬৪ জেলায় প্রথম ধাপ, ৪৬ জেলায় দ্বিতীয় ধাপ এবং ৮ জেলায় তৃতীয় ধাপ সম্পন্ন হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, কোনো এলাকায় টানা তিন বছর অন্তত ৭০ শতাংশ কুকুরকে টিকা দেওয়া গেলে সেই এলাকা কার্যত জলাতঙ্কমুক্ত করা সম্ভব। তবে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ২০২৪ সালের পর অর্থায়ন ও নীতিগত কারণে এই কার্যক্রম কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে টিকা না পাওয়া কুকুরের সংখ্যা বাড়ছে এবং ঝুঁকিও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সমন্বয়ের অভাবে স্থবির পরিস্থিতি
রাজধানীতে পথকুকুর নিয়ন্ত্রণে কার্যকর সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বর্তমানে সক্রিয় কোনো কুকুর নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি নেই, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকেও উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম চলছে না।
দুই সিটি করপোরেশনের উদ্যোগও সীমিত
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন জানিয়েছে, অভিযোগ পেলে নির্দিষ্ট এলাকায় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে আগে বছরে ৫০০টির বেশি কুকুর বন্ধ্যাকরণ করা হলেও গত প্রায় ২০ মাসে হয়েছে মাত্র ১৫০টির মতো।
ডিএসসিসির ভেটেরিনারি কর্মকর্তা শরণ কুমার সাহা বলেন, ‘টিকা সরবরাহ নেই, সমন্বয়ের অভাব আছে। তাই নিয়মিত কার্যক্রম চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।’ অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন জানিয়েছে, তাদের সক্ষমতা সীমিত এবং কুকুরের সংখ্যা বা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা সম্পর্কেও নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই। ডিএনসিসির জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ লুৎফর রহমান বলেন, জনবল ও কাঠামো না থাকায় কুকুর নিয়ন্ত্রণে কাজ করা যাচ্ছে না।
পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবায়ন নেই
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক মো. হালিমুর রশিদ বলেন, ‘জলাতঙ্ক প্রতিরোধে নতুন করে একটি পরিকল্পনা করছি। তবে এর আওতায় শুধু মানুষকে টিকা দেওয়া হবে। কুকুরকে টিকা দেওয়া বা কুকুর নিয়ন্ত্রণের কোনো পরিকল্পনা এই মুহূর্তে নেই।’
তিনি আরও বলেন, কুকুর নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হওয়া উচিত। তবে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকেও বর্তমানে কার্যকর কোনো কর্মসূচি চালু নেই বলে জানা গেছে।
পথকুকুরদের নিয়মিত খাবার দেন এমন ব্যক্তিদের একজন মাহফুজা হক বলেন, কুকুরকে দোষ দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না।তিনি বলেন, কুকুর কথা বলতে পারে না। তাই তাদের ভাষা বোঝারও কেউ নেই। কুকুর কাউকে কামড় বা আক্রমণ করলে ওই কুকুরের ওপর ক্ষোভ ঝাড়া সহজ। কিন্তু এটা কোনো সমাধান নয়। দরকার নিয়ন্ত্রণ ও জলাতঙ্কপ্রতিরোধী টিকা দেওয়া।
তিনি আরও বলেন, সিটি করপোরেশন ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সমন্বিত উদ্যোগে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রেখে কুকুর নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে শহরে কুকুরের আক্রমণ এবং জলাতঙ্কের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। দ্রুত টিকাদান, জন্মনিয়ন্ত্রণ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে সমস্যা নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়বে।