{{ news.section.title }}
ধেয়ে আসছে ভয়াবহ তাপদাহ খ্যাত সুপার এল নিনো, জেনে নিন এই সময়ে করণীয় কি কি
বিশ্বজুড়ে জলবায়ুর বড় পরিবর্তনের অন্যতম চালিকা শক্তি এল নিনো, আর সেই প্রভাব বাংলাদেশে পড়বে কি না, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সাম্প্রতিক আবহাওয়া বিশ্লেষণ ও আন্তর্জাতিক জলবায়ু সংস্থাগুলোর পূর্বাভাসে ইঙ্গিত মিলছে, প্রশান্ত মহাসাগরে তাপমাত্রার অস্বাভাবিক পরিবর্তন আবারও সক্রিয় হতে পারে, যা এল নিনো পরিস্থিতির দিকে এগোচ্ছে। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, এল নিনো মূলত তখনই তৈরি হয়, যখন মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়ে যায়। এর প্রভাব শুধু সেই অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়ার ধরণ পাল্টে দেয়। বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়ে, বিশেষ করে বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা এবং মৌসুমি বায়ুর আচরণে পরিবর্তন দেখা যায়।
জাতিসংঘের আবহাওয়া ও জলবায়ু সংস্থা বলেছে, মে থেকে জুলাইয়ের মধ্যেই এল নিনোর পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) জানিয়েছে, প্রাথমিক লক্ষণ দেখে মনে হচ্ছে এবারের ঘটনাটি বিশেষভাবে শক্তিশালী হতে পারে। ডব্লিউএমওর জলবায়ু পূর্বাভাস প্রধান উইলফ্রান মুফুমা-ওকিয়া বলেন, ‘বছরের শুরুতে কিছুটা স্বাভাবিক পরিস্থিতির পর এখন এল নিনো শুরু হওয়ার ব্যাপারে আমরা অনেকটাই নিশ্চিত, এবং এরপর এটি আরও তীব্র হবে। এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে এল নিনো শক্তিশালী হবে।’
ডব্লিউএমওর সর্বশেষ মাসিক বৈশ্বিক মৌসুমি জলবায়ু আপডেটে বলা হয়েছে, বিষুবীয় প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ছে। এটি মে থেকে জুলাইয়ের মধ্যে এল নিনো ফিরে আসার ইঙ্গিত দিচ্ছে। পূর্বাভাসে বলা হচ্ছে, আগামী তিন মাসে প্রায় সারা বিশ্বের স্থলভাগের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকবে।
এল নিনোর ইতিহাস কী, কিভাবে শুরু হয়ে বিশ্বজুড়ে প্রভাব বিস্তার করল?
বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার বড় পরিবর্তনের অন্যতম কারণ এল নিনো, কিন্তু এই ঘটনাটির ইতিহাস অনেক পুরোনো। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্রশান্ত মহাসাগর ঘিরে বসবাসকারী মানুষজন এর প্রভাব অনুভব করলেও, বৈজ্ঞানিকভাবে এটি বোঝা ও বিশ্লেষণ শুরু হয় অনেক পরে।
এল নিনো শব্দটির উৎপত্তি দক্ষিণ আমেরিকার দেশ পেরু ও ইকুয়েডরের উপকূলীয় জেলেদের কাছ থেকে। তারা লক্ষ্য করতেন, প্রতি কয়েক বছর পর পর ডিসেম্বর মাসের দিকে সমুদ্রের পানি অস্বাভাবিকভাবে গরম হয়ে যায় এবং মাছের সংখ্যা কমে যায়। এই ঘটনাকে তারা “এল নিনো” নামে ডাকতেন, যার অর্থ স্প্যানিশ ভাষায় “ছোট ছেলে” বা “খ্রিস্ট শিশু”, কারণ এটি বড়দিনের সময়ের কাছাকাছি দেখা দিত। ১৯শ শতকের শেষ দিকে প্রথমবারের মতো এই ঘটনাটি নিয়ে বৈজ্ঞানিকভাবে আগ্রহ তৈরি হয়। তবে ২০শ শতকের শুরুতে ব্রিটিশ আবহাওয়াবিদ গিলবার্ট ওয়াকার ভারতীয় উপমহাদেশের মৌসুমি বায়ুর পরিবর্তন নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ খুঁজে পান। তিনি দেখান, প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা ও বায়ুচাপের পরিবর্তনের সঙ্গে ভারত ও দক্ষিণ এশিয়ার বৃষ্টিপাতের সম্পর্ক রয়েছে। এই সম্পর্ককে পরে “সাউদার্ন অসিলেশন” বলা হয়।
পরবর্তীতে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন, এল নিনো এবং সাউদার্ন অসিলেশন একসঙ্গে কাজ করে। ফলে এর পূর্ণ নাম হয় “এল নিনো সাউদার্ন অসিলেশন” বা ENSO। ১৯৫০-এর দশক থেকে এই বিষয়ে আরও বিস্তারিত গবেষণা শুরু হয় এবং স্যাটেলাইট প্রযুক্তির উন্নতির ফলে সমুদ্রের তাপমাত্রা ও বায়ুমণ্ডলের পরিবর্তন আরও নির্ভুলভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়। ইতিহাসে বেশ কয়েকটি শক্তিশালী এল নিনো ঘটনা বিশ্বজুড়ে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। ১৯৮২-৮৩ সালের এল নিনোকে অন্যতম শক্তিশালী হিসেবে ধরা হয়, যা দক্ষিণ আমেরিকায় বন্যা এবং অস্ট্রেলিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় ভয়াবহ খরার সৃষ্টি করে। এরপর ১৯৯৭-৯৮ সালের এল নিনো আরও শক্তিশালী আকারে দেখা দেয়, যার ফলে বিশ্বজুড়ে চরম আবহাওয়া পরিস্থিতি তৈরি হয় এবং ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে ২০১৫-১৬ সালের এল নিনোও অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল। এই সময় বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা রেকর্ড মাত্রায় পৌঁছে যায় এবং বিভিন্ন দেশে খরা, বন আগুন ও বন্যার ঘটনা বেড়ে যায়। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এল নিনোর প্রভাব আরও তীব্র হতে পারে।বাংলাদেশেও অতীতে এল নিনোর প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে। সাধারণত এ সময় দেশে বৃষ্টিপাত কমে যায়, তাপমাত্রা বেড়ে যায় এবং খরার ঝুঁকি বাড়ে। ফলে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং পানির সংকট দেখা দেয়।
সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বাড়ছে। যদিও এখনো পূর্ণমাত্রার এল নিনো ঘোষণা করা হয়নি, তবে পরিস্থিতি সেই দিকেই অগ্রসর হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। যদি এই প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তাহলে চলতি বছরের মাঝামাঝি বা শেষ নাগাদ এল নিনো সক্রিয় হতে পারে।
.gif)
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এল নিনোর প্রভাব সাধারণত বৃষ্টিপাত কমে যাওয়া এবং তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার মাধ্যমে দেখা যায়। এতে খরার ঝুঁকি বাড়ে, কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে এবং পানির সংকটও দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে আমন ধানসহ মৌসুমি ফসলের ওপর এর প্রভাব বেশি পড়ে। এছাড়া এল নিনোর সময় দক্ষিণ এশিয়ায় মৌসুমি বায়ু দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে বর্ষাকালে স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টি হতে পারে। এতে নদ-নদীর পানির প্রবাহ কমে যায় এবং সেচনির্ভর কৃষিতে চাপ সৃষ্টি হয়। একই সঙ্গে শহরাঞ্চলে তাপপ্রবাহের মাত্রাও বাড়তে পারে।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এখনো চূড়ান্তভাবে এল নিনো ঘোষণা না হলেও, সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতির পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। কৃষি খাত, পানি ব্যবস্থাপনা এবং স্বাস্থ্য খাতে সতর্কতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, এল নিনো একা আসে না, বরং এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যুক্ত হয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে। ফলে আগের তুলনায় তাপমাত্রা বৃদ্ধি বা বৃষ্টিপাতের ঘাটতি আরও তীব্র হতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে কৃষকদের জন্য পরামর্শ হচ্ছে, কম পানিতে টিকে থাকতে পারে এমন ফসলের দিকে ঝোঁক বাড়ানো এবং সেচ ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বৃদ্ধি করা। একই সঙ্গে পানি সংরক্ষণ এবং ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন।সব মিলিয়ে, এল নিনোর সম্ভাবনা নিয়ে এখনই সতর্ক হওয়ার সময় বলছেন বিশেষজ্ঞরা। পরিস্থিতি পুরোপুরি নিশ্চিত না হলেও, প্রাথমিক লক্ষণগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার আবহাওয়ায় আবারও বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।

এল নিনো হলে কী করবেন, আগাম প্রস্তুতি নিয়ে কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা?
বিশ্বজুড়ে জলবায়ুর বড় পরিবর্তনের কারণ এল নিনো, আর এটি সক্রিয় হলে বাংলাদেশেও এর প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা যায়। বিশেষ করে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বৃষ্টিপাত কমে যাওয়া এবং খরার ঝুঁকি বাড়ে। তাই এল নিনোর সম্ভাবনা দেখা দিলে আগে থেকেই প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
আবহাওয়াবিদদের মতে, এল নিনোর সময় সাধারণত বর্ষাকালে বৃষ্টিপাত কম হয়। এতে কৃষি, পানি সম্পদ এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর চাপ তৈরি হয়। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। কৃষি খাতে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে। তাই কৃষকদের জন্য প্রথম করণীয় হচ্ছে কম পানিতে টিকে থাকতে পারে এমন ফসল নির্বাচন করা। ধানসহ বিভিন্ন ফসলের খরা সহনশীল জাত চাষে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে সেচ ব্যবস্থাকে আরও দক্ষ ও পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করতে হবে, যাতে কম পানিতে বেশি ফলন নিশ্চিত করা যায়।
পানি ব্যবস্থাপনায়ও সতর্কতা জরুরি। এল নিনোর সময় নদ-নদীর পানি কমে যেতে পারে, ফলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বাড়ে। এজন্য বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পুকুর ও জলাধার পুনরুদ্ধার এবং অপচয় কমানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। শহরাঞ্চলেও পানি ব্যবহারে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।

তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে তাপপ্রবাহের সময় হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা এবং বিভিন্ন রোগের প্রকোপ বাড়তে পারে। তাই দিনের প্রচণ্ড গরমে বাইরে কাজ কমানো, পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং শিশু ও বয়স্কদের বিশেষ যত্ন নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
এছাড়া বিদ্যুৎ চাহিদা বেড়ে যেতে পারে, কারণ গরমের কারণে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ে। এজন্য জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় পরিকল্পনা জরুরি। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে সচেতনতা তৈরি করা প্রয়োজন।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এল নিনোর প্রভাব মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো গড়ে তোলা, পানি সম্পদের সঠিক ব্যবহার এবং টেকসই কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
সরকারি সংস্থাগুলোর পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জনগণকে প্রস্তুত করা দরকার। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় আগাম পরিকল্পনা থাকলে ক্ষতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
এল নিনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়, তবে আগাম প্রস্তুতি এবং সঠিক পদক্ষেপের মাধ্যমে এর ক্ষতিকর প্রভাব অনেকটাই কমানো যায়। তাই এখনই সচেতন হওয়া এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।