রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে কি পরমাণু বোমা বানানো সম্ভব?

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে কি পরমাণু বোমা বানানো সম্ভব?
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ইউরেনিয়াম জ্বালানি লোডিং শুরু হওয়ার পর অনেকের মনেই একটি প্রশ্ন ঘুরছে-পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে যেহেতু ইউরেনিয়াম ব্যবহার হয়, তাহলে এই জ্বালানি কি পরমাণু বোমা তৈরিতেও ব্যবহার করা সম্ভব? প্রশ্নটি নতুন নয়, তবে এর উত্তর সরলও নয়।

সংক্ষেপে বললে, রূপপুরের মতো বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত জ্বালানি দিয়ে সরাসরি পরমাণু বোমা বানানো সম্ভব নয়। কারণ বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি, তার সমৃদ্ধকরণের মাত্রা, রিঅ্যাক্টরের নকশা, আন্তর্জাতিক নজরদারি, আর অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় আলাদা অবকাঠামো-সবকিছুই একেবারে ভিন্ন।

 

ইউরেনিয়াম আসলে কী

প্রাকৃতিক ইউরেনিয়ামে মূলত দুই ধরনের আইসোটোপ বেশি গুরুত্বপূর্ণ-ইউরেনিয়াম-২৩৮ এবং ইউরেনিয়াম-২৩৫। এর মধ্যে ইউ-২৩৫ হচ্ছে সেই অংশ, যা সহজে বিভাজিত হয়ে শক্তি দেয়। কিন্তু প্রকৃতিতে ইউ-২৩৫-এর পরিমাণ খুবই কম, প্রায় ০.৭ শতাংশের মতো। তাই এটিকে বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহারযোগ্য করতে “সমৃদ্ধকরণ” বা enrichment করা হয়। এই সমৃদ্ধকরণের মাধ্যমে ইউ-২৩৫-এর অনুপাত বাড়ানো হয়।

 

বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি আর বোমার জ্বালানি এক নয়

এখানেই সবচেয়ে বড় পার্থক্য। বাণিজ্যিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে সাধারণত যে ইউরেনিয়াম ব্যবহার হয়, তা ৩ থেকে ৫ শতাংশ ইউ-২৩৫ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করা থাকে। এটিকে low-enriched uranium বা LEU বলা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের নিউক্লিয়ার রেগুলেটরি কমিশন এবং বিশ্ব নিউক্লিয়ার অ্যাসোসিয়েশন-দুই জায়গাতেই স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, অধিকাংশ লাইট ওয়াটার রিঅ্যাক্টরে ৩–৫ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামই ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে, অস্ত্রমানের ইউরেনিয়াম বা weapons-grade uranium সাধারণত ৯০ শতাংশের বেশি ইউ-২৩৫ সমৃদ্ধ হয়।

 

অর্থাৎ, “ইউরেনিয়াম” শব্দটি একই হলেও এর মান এক নয়। যেমন রান্নার গ্যাস আর রকেটের জ্বালানি দুটোই “জ্বালানি”, কিন্তু একে অন্যের বিকল্প নয়-তেমনি বিদ্যুৎ উৎপাদনের জ্বালানি আর বোমার উপযোগী উপাদান একই পর্যায়ের নয়। রূপপুরে যে জ্বালানি ব্যবহার হচ্ছে, সেটি বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য উপযোগী, বোমা তৈরির জন্য নয়।

 

৫ শতাংশ থেকে ৯০ শতাংশে যাওয়া কেন এত কঠিন

অনেকে ভাবেন, যদি ৩–৫ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম থাকে, তবে সেটিকে আরেকটু বাড়িয়ে ৯০ শতাংশে নেওয়া গেলেই তো হলো। বাস্তবে বিষয়টি এত সহজ নয়। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ অত্যন্ত জটিল, ব্যয়বহুল, উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর এবং বড় শিল্পপর্যায়ের কাজ। এর জন্য বিশেষ enrichment facility, গ্যাস সেন্ট্রিফিউজ অবকাঠামো, আলাদা লাইসেন্সপ্রাপ্ত ব্যবস্থা, বিশেষ নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা দরকার। রূপপুরে এমন কোনো enrichment plant নেই। এটি একটি power reactor site, enrichment plant নয়।

 

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, বিদ্যুৎকেন্দ্রে যে জ্বালানি আসে, তা আগে থেকেই প্রস্তুত fuel assembly আকারে আসে। অর্থাৎ, এটি রিঅ্যাক্টরে ব্যবহারের জন্য ডিজাইন করা, আলাদা করে সমৃদ্ধকরণ কারখানায় পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করার জন্য নয়। রূপপুরের ক্ষেত্রে সব জ্বালানি রাশিয়ার রোসাটম-সংশ্লিষ্ট সরবরাহ ব্যবস্থার আওতায় আসে।

 

রূপপুরে কী হয়, আর বোমায় কী হয়

রূপপুরের মতো পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে রিঅ্যাক্টরের ভেতরে নিয়ন্ত্রিত ফিশন বিক্রিয়া ঘটানো হয়। সেখানে জ্বালানি অ্যাসেম্বলি, মডারেটর, কুল্যান্ট, কন্ট্রোল রড, চাপ-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, সুরক্ষা আবরণ-সব মিলিয়ে পুরো সিস্টেমকে এমনভাবে সাজানো হয়, যাতে পরমাণু বিভাজন ধীরে, হিসাবমতো এবং স্থিতিশীলভাবে তাপ উৎপন্ন করে। সেই তাপ দিয়ে পানি বাষ্পে রূপ নেয়, বাষ্প টারবাইন ঘোরায়, আর সেখান থেকে বিদ্যুৎ তৈরি হয়।

 

কিন্তু একটি পারমাণবিক বোমায় লক্ষ্য থাকে সম্পূর্ণ ভিন্ন-সেখানে শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং এক মুহূর্তে বিপুল মাত্রায় মুক্ত করা হয়। এই দুই ব্যবস্থার নকশাগত দর্শনই আলাদা। বিদ্যুৎকেন্দ্রের রিঅ্যাক্টর বিস্ফোরক ডিভাইস নয়, বরং তাপ উৎপাদনকারী একটি শক্তিনিয়ন্ত্রিত শিল্প স্থাপনা। ফলে “রিঅ্যাক্টরে ইউরেনিয়াম আছে, তাই সেটি বোমা”-এমন ধারণা প্রযুক্তিগতভাবে ভুল।

 

রূপপুরের জ্বালানি দিয়ে কেন পরমাণু বোমা বানানো সম্ভব নয়

১. রূপপুরে যে ইউরেনিয়াম ব্যবহার হয়, তা অস্ত্রমানের নয়

বিদ্যুৎকেন্দ্রে সাধারণত ৩–৫ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ব্যবহার করা হয়। কিন্তু পরমাণু বোমার জন্য সাধারণত ৯০ শতাংশ বা তার বেশি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দরকার হয়। অর্থাৎ, রূপপুরের জ্বালানি আর বোমার উপযোগী জ্বালানি এক জিনিস নয়।

 

২. রূপপুরে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার কারখানা নেই

রূপপুর একটি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, এটি কোনো enrichment plant নয়। সেখানে ৫ শতাংশ জ্বালানিকে ৯০ শতাংশে উন্নীত করার মতো প্রযুক্তি, কারখানা, সেন্ট্রিফিউজ বা শিল্প অবকাঠামো নেই।

 

৩. রিঅ্যাক্টরের কাজ বিদ্যুৎ তৈরি করা, বিস্ফোরণ ঘটানো নয়

রূপপুরের রিঅ্যাক্টরে নিয়ন্ত্রিত নিউক্লিয়ার ফিশন ঘটে। এই প্রক্রিয়ায় ধীরে ধীরে তাপ তৈরি হয়, বাষ্প তৈরি হয়, টারবাইন ঘোরে, তারপর বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়। কিন্তু বোমায় শক্তি এক মুহূর্তে, অনিয়ন্ত্রিতভাবে মুক্ত করে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। এই দুই প্রযুক্তির উদ্দেশ্য ও নকশা সম্পূর্ণ আলাদা।

 

৪. জ্বালানি প্রস্তুত অবস্থায় আসে, আলাদা করে বদলানো যায় না

রূপপুরে জ্বালানি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি আকারে আসে, যা সরাসরি রিঅ্যাক্টরে ব্যবহারের জন্য তৈরি। এটা এমন কোনো কাঁচামাল নয়, যেটা ইচ্ছামতো নিয়ে বোমা তৈরির প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করা যাবে।

 

৫. আন্তর্জাতিক নজরদারি আছে

রূপপুর প্রকল্প IAEA-এর নজরদারি ও নিরাপত্তা কাঠামোর আওতায় চলছে। জ্বালানি কোথা থেকে এল, কীভাবে ব্যবহার হচ্ছে, ব্যবহারের পর কী হবে-সবকিছুর হিসাব থাকে। তাই গোপনে সামরিক কাজে জ্বালানি সরিয়ে নেওয়া বাস্তবে খুব কঠিন।

 

৬. ব্যবহৃত জ্বালানিও সহজে বোমার উপাদান নয়

অনেকে ভাবেন, রিঅ্যাক্টরে ব্যবহৃত জ্বালানি থেকেই বুঝি সহজে বোমা বানানো যায়। বাস্তবে তা নয়। এর জন্য reprocessing নামে আলাদা, জটিল, উচ্চপ্রযুক্তির শিল্পপ্রক্রিয়া দরকার হয়, যা রূপপুরে নেই।

 

তাহলে ব্যবহৃত জ্বালানি থেকে কি কিছু করা যায়?

এই জায়গায় আরেকটি ভুল ধারণা থাকে। কিছু লোক মনে করেন, রিঅ্যাক্টরে ব্যবহৃত জ্বালানি বা spent fuel থেকেই বুঝি সহজে বোমার উপাদান বের করে নেওয়া যায়। বাস্তবে বিষয়টি জটিল। power reactor-এ ব্যবহৃত জ্বালানিতে সময়ের সঙ্গে plutonium তৈরি হতে পারে, কিন্তু সেটি সরাসরি অস্ত্রমানের উপাদান নয়। এর জন্য আলাদা reprocessing technology দরকার, যা অত্যন্ত জটিল, সংবেদনশীল এবং আন্তর্জাতিকভাবে কঠোরভাবে নজরদারির আওতায় থাকে। বিশ্ব নিউক্লিয়ার অ্যাসোসিয়েশন উল্লেখ করেছে, বোমার জন্য প্রয়োজনীয় plutonium সাধারণত বিশেষ উদ্দেশ্যের রিঅ্যাক্টরে তৈরি করা হয়, সাধারণ বাণিজ্যিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে নয়।

 

রূপপুরের ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ব্যবহৃত জ্বালানি রাশিয়ায় ফেরত পাঠানোর নীতি ও চুক্তিভিত্তিক কাঠামো রয়েছে। আইএইএ এবং বিশ্ব নিউক্লিয়ার অ্যাসোসিয়েশন-দুই সূত্রেই উল্লেখ আছে, রূপপুরের জ্বালানি সরবরাহ রাশিয়া দিচ্ছে এবং ব্যবহৃত জ্বালানিও রাশিয়ায় পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ/ব্যবস্থাপনার জন্য ফেরত নেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে ব্যবহৃত জ্বালানি স্থানীয়ভাবে জমিয়ে রেখে গোপনে সামরিক কর্মসূচি চালানোর সুযোগও বাস্তবে খুব সীমিত।

 

আন্তর্জাতিক নজরদারি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

রূপপুর প্রকল্প আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা (IAEA)-র সুরক্ষা, নিরাপত্তা ও শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের কাঠামোর ভেতরে পরিচালিত হচ্ছে। আইএইএ-এর কাজই হলো সদস্য রাষ্ট্রগুলোতে পারমাণবিক প্রযুক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং সামরিক অপব্যবহারের ঝুঁকি রোধে safeguards ব্যবস্থা চালু রাখা। বাংলাদেশ safeguards agreement এবং অতিরিক্ত প্রোটোকলসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কাঠামোর অংশ। আইএইএ-সংক্রান্ত বাংলাদেশ প্রোফাইল ও বিভিন্ন নথিতে এ বিষয়টি উল্লেখ আছে।

 

রূপপুর নিয়ে আইএইএ নিয়মিত নিরাপত্তা, পরিচালন সক্ষমতা এবং প্রস্তুতি পর্যালোচনা করেছে। ২০২৫ সালেও আইএইএ রূপপুরে operational safety নিয়ে পর্যালোচনা চালায় এবং প্রকল্পটিকে শান্তিপূর্ণ বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবেই বিবেচনা করে। অর্থাৎ, এখানে প্রতিটি জ্বালানির হিসাব, সাইটের নিরাপত্তা, অপারেশনাল মান, এবং আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা-সবকিছুই বহুস্তরীয় পর্যবেক্ষণের মধ্যে থাকে।

 

পরমাণু বোমা বানাতে আসলে কী কী লাগে

খুব উচ্চস্তরের ভাষায় বললে, শুধু ইউরেনিয়াম থাকলেই বোমা হয় না। প্রয়োজন হয় অস্ত্রমানের fissile material, আলাদা উচ্চপ্রযুক্তির শিল্পপ্রক্রিয়া, বিশেষ নকশা, উপকরণ প্রকৌশল, বিস্ফোরণ-প্রকৌশল, ট্রিগারিং ব্যবস্থা, সুরক্ষিত সামরিক অবকাঠামো, এবং দীর্ঘমেয়াদি গোপন কর্মসূচি। এগুলো কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্রের স্বাভাবিক কাজের অংশ নয়। বিদ্যুৎকেন্দ্রের অবকাঠামো এমনভাবে নকশা করা হয়, যাতে বিদ্যুৎ উৎপাদন নিরাপদভাবে করা যায়-সামরিক ডিভাইস বানানোর জন্য নয়।

 

রূপপুর কেন শুধু বিদ্যুতের জন্য

রূপপুর একটি VVER-1200 ধরনের বাণিজ্যিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। এর কাজ গ্রিডে বিদ্যুৎ যোগ করা। এটি enrichment plant নয়, reprocessing plant নয়, military research site নয়। এখানে প্রস্তুত জ্বালানি রিঅ্যাক্টরে ঢুকে নিয়ন্ত্রিতভাবে তাপ উৎপন্ন করবে, সেখান থেকে বাষ্প, টারবাইন ও বিদ্যুৎ-এই শিল্পপ্রক্রিয়া চলবে। দুই ইউনিট মিলিয়ে এটি বাংলাদেশের গ্রিডে ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যোগ করার জন্য নির্মিত।


সম্পর্কিত নিউজ