টানা বৃষ্টিও কমাতে পারল না দূষণ, বিশ্বের শীর্ষে ঢাকা

টানা বৃষ্টিও কমাতে পারল না দূষণ, বিশ্বের শীর্ষে ঢাকা
ছবির ক্যাপশান, ছবি: জাগরণ

রাজধানী ঢাকার বাতাসের মান আবারও উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। গত কয়েক দিনের বৃষ্টির পর সাধারণভাবে বাতাসের মান কিছুটা উন্নত হওয়ার কথা থাকলেও বৃহস্পতিবার (৭ মে) সকালে ঢাকার বায়ু ছিল ‘অস্বাস্থ্যকর’ পর্যায়ে। বাতাসের মান পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা আইকিউএয়ারের সূচকে সকাল ৯টার দিকে ঢাকার এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স বা AQI স্কোর ছিল ১৮৬। এই স্কোর নিয়ে বিশ্বের দূষিত শহরের তালিকায় শীর্ষ অবস্থানে উঠে আসে ঢাকা।

আইকিউএয়ারের তথ্য অনুযায়ী, একই সময়ে দূষণের তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল পাকিস্তানের লাহোর। শহরটির AQI স্কোর ছিল ১৫৩, যা ‘অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে বিবেচিত। তৃতীয় অবস্থানে ছিল ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তা; সেখানকার স্কোর ছিল ১২৭, যা সংবেদনশীল জনগোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর পর্যায়ের কাছাকাছি। এরপর তালিকায় ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই, যার স্কোর ছিল ১১২। ভারতের কলকাতা ৯৯ এবং দিল্লি ৯৭ স্কোর নিয়ে মাঝারি থেকে সংবেদনশীল পর্যায়ের সীমার কাছাকাছি অবস্থান করছিল। আফগানিস্তানের কাবুলের স্কোর ছিল ৯৬, চীনের ইউহান ৯৪, চীনের হাংজউ ৯০, ফিলিপাইনের ম্যানিলা ৮৮, উগান্ডার কাম্পালা ৮৪ এবং নেপালের কাঠমান্ডুর স্কোর ছিল ৮৩।

 

আইকিউএয়ারের লাইভ তথ্যেও বৃহস্পতিবার ঢাকার বাতাসে সূক্ষ্ম বস্তুকণা বা PM2.5-এর মাত্রা উদ্বেগজনক হিসেবে দেখা যায়। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার PM2.5 ঘনত্ব বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বার্ষিক গাইডলাইন মানের প্রায় ২০ গুণের বেশি ছিল। একই সঙ্গে সংস্থাটি ঢাকার ক্ষেত্রে বাইরে ব্যায়াম এড়িয়ে চলার মতো স্বাস্থ্য সতর্কতাও দেখিয়েছে।

 

AQI সূচক অনুযায়ী, কোনো শহরের স্কোর শূন্য থেকে ৫০-এর মধ্যে থাকলে বায়ুর মান ‘ভালো’ ধরা হয়। ৫১ থেকে ১০০ হলে তা ‘মাঝারি’ বা সহনীয়। ১০১ থেকে ১৫০ হলে বাতাস সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর বলে বিবেচিত হয়। ১৫১ থেকে ২০০ পর্যন্ত স্কোর ‘অস্বাস্থ্যকর’, ২০১ থেকে ৩০০ হলে ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ এবং ৩০১-এর বেশি হলে সেটি দুর্যোগপূর্ণ বা ঝুঁকিপূর্ণ মাত্রা হিসেবে ধরা হয়।

 

ঢাকার অভ্যন্তরেও বিভিন্ন এলাকায় বায়ুর মানে বড় পার্থক্য দেখা গেছে। বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর মধ্যে বায়ুদূষণে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় ছিল আগারগাঁওয়ের বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা কেন্দ্র বা বিআইডিএস এলাকা। সেখানে AQI স্কোর ছিল ২১৩, যা ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ পর্যায়ের মধ্যে পড়ে। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা বেচারাম দেউড়ী এলাকার স্কোর ছিল ২০৭। এই দুই এলাকার বাতাসই দুইশোর বেশি স্কোর অতিক্রম করায় স্বাস্থ্যঝুঁকি তুলনামূলক বেশি ছিল।

 

ঢাকার দূষিত এলাকার তালিকায় এরপর ছিল গুলশানের বে’জ এইজ ওয়াটার এলাকা, যার স্কোর ছিল ১৯৮। গ্রেস ইন্টারন্যাশনাল স্কুল এলাকার স্কোর ছিল ১৯৬, ধানমন্ডিতে ১৯৫, উত্তর বাড্ডায় ১৮১, বারিধারা পার্ক রোডে ১৭৮, গুলশান লেক পার্কে ১৭৮, বারিধারা লেকসাইডে ১৭২ এবং গোরানে ১৬০। এসব এলাকার বেশির ভাগই ‘অস্বাস্থ্যকর’ পর্যায়ে ছিল, যা সাধারণ মানুষের জন্যও স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার বায়ুদূষণের পেছনে কয়েকটি কারণ দীর্ঘদিন ধরেই কাজ করছে। নির্মাণকাজের ধুলা, যানবাহনের ধোঁয়া, ইটভাটা, শিল্পকারখানার নির্গমন, রাস্তার ধুলা, খোলা জায়গায় বর্জ্য পোড়ানো এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণ-এসব কারণে রাজধানীর বাতাসে ক্ষতিকর কণার পরিমাণ বেড়ে যায়। বৃষ্টি সাময়িকভাবে ধুলা ও দূষণ কমালেও যানবাহন, নির্মাণকাজ ও শিল্প উৎস বন্ধ না হলে বায়ুর মান দ্রুত আবার খারাপ হতে পারে।

 

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘অস্বাস্থ্যকর’ পর্যায়ের বাতাসে দীর্ঘ সময় অবস্থান করলে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী, হাঁপানি ও হৃদরোগে আক্রান্ত মানুষ বেশি ঝুঁকিতে পড়েন। এমন অবস্থায় বাইরে গেলে মাস্ক ব্যবহার, অপ্রয়োজনীয় বাইরে থাকা কমানো, খোলা জায়গায় ব্যায়াম এড়িয়ে চলা এবং শিশু ও অসুস্থ ব্যক্তিদের বিশেষ সতর্কতায় রাখা জরুরি।

 

রাজধানীর বাতাসের এমন অবস্থা পরিবেশ ব্যবস্থাপনার জন্যও বড় সতর্কবার্তা। বিশেষ করে বৃষ্টির পরও ঢাকার AQI শীর্ষ দূষিত শহরগুলোর মধ্যে উঠে আসা ইঙ্গিত দেয়, শহরের দূষণের উৎসগুলো স্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে সাময়িক আবহাওয়া পরিবর্তনেও পরিস্থিতির বড় উন্নতি হবে না। পরিবেশবিদরা বলছেন, নির্মাণসাইটে ধুলা নিয়ন্ত্রণ, রাস্তা নিয়মিত পরিষ্কার, মানহীন যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, ইটভাটার দূষণ কমানো এবং শিল্পকারখানার নির্গমন পর্যবেক্ষণ জোরদার করা এখন জরুরি।


সম্পর্কিত নিউজ