{{ news.section.title }}
বাড়ছে হামের ভয়াবহতা, মৃত্যু ছাড়াল ৪০০
দেশে হাম পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ১১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে চারজনের শরীরে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছিল, আর সাতজন মারা গেছে হামের উপসর্গ নিয়ে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে রোববার (১০ মে) পর্যন্ত ৫৫ দিনে দেশে হাম ও হামের উপসর্গে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪০৯ জনে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে নিশ্চিত হামে মৃত্যু হয়েছে ৬৫ শিশুর এবং হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৩৪৪ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্য বলছে, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের লক্ষণ নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে এসেছে ১ হাজার ৫০৩ জন। তাদের মধ্যে ১ হাজার ২৭৮ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ২০৫ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৯ হাজার ১৫৯ জনে। এর মধ্যে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে ৬ হাজার ৮১৯ জনের শরীরে।
হাসপাতালভিত্তিক তথ্যেও পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট হচ্ছে। গত ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৩৪ হাজার ৯০৯ শিশু। এর মধ্যে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৩০ হাজার ৮৬২ শিশু। তবে প্রতিদিন নতুন রোগী হাসপাতালে আসায় বিভিন্ন এলাকার শিশু ও সংক্রামক রোগ বিভাগে চাপ বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বিভাগভিত্তিক হিসাবে হামের উপসর্গ নিয়ে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ঢাকা বিভাগে। এ পর্যন্ত সেখানে মারা গেছে ১৩৮ জন। রাজশাহী বিভাগে মৃত্যু হয়েছে ৭৮ জনের। এছাড়া বরিশালে ২৯, চট্টগ্রামে ২৭, ময়মনসিংহে ২৬, সিলেটে ২৪, খুলনায় ১৪ এবং রংপুর বিভাগে চারজনের মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং বরিশালের শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তথ্য সংশ্লিষ্ট সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে নতুন মৃত্যুর তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে।
এর আগে শনিবার পর্যন্ত হামের উপসর্গে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ২৯১। পরদিন বিভিন্ন জেলার তথ্য সমন্বয়ের পর হামের উপসর্গে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৪৪-এ। একই সঙ্গে নিশ্চিত হামে মৃত্যুসহ মোট মৃত্যুর সংখ্যা ৪০৯ জনে পৌঁছায়। অর্থাৎ, হালনাগাদ তথ্য প্রকাশের পর মৃত্যুর সংখ্যা একদিনেই বড় ব্যবধানে বেড়েছে।
সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার দেশজুড়ে টিকাদান কার্যক্রম চালু করলেও এখনো উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু টিকার বাইরে রয়ে গেছে। ইউনিসেফের দ্রুত টিকাদান পরিস্থিতি যাচাই পদ্ধতি বা আরসিএম বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শহরাঞ্চলে এখনো ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ এবং গ্রামাঞ্চলে প্রায় ১৫ শতাংশ শিশু হাম প্রতিরোধী টিকা পায়নি। এই টিকাবঞ্চিত শিশুদের দ্রুত খুঁজে বের করে টিকার আওতায় আনা না গেলে সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে চলমান হাম প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় সরকার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ ও গ্যাভির সহযোগিতায় জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে। প্রথম ধাপে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ ১৮ জেলায় ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের টিকা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়, পরে ধাপে ধাপে কার্যক্রম বিস্তারের পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়।
হাম অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। জ্বর, কাশি, সর্দি, চোখ লাল হওয়া এবং শরীরে লালচে র্যাশ বা দানা ওঠা-এসব এর সাধারণ লক্ষণ। শিশুদের ক্ষেত্রে রোগটি দ্রুত জটিল আকার নিতে পারে। বিশেষ করে অপুষ্ট শিশু, কম বয়সী শিশু, টিকা না পাওয়া শিশু এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম এমন শিশুদের জন্য হাম প্রাণঘাতী ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম প্রতিরোধে টিকাদানই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। কোনো শিশুর জ্বর, কাশি, চোখ লাল হওয়া, শরীরে দানা ওঠা বা শ্বাসকষ্টের মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা হাসপাতালে নেওয়া জরুরি। স্থানীয় দোকান থেকে ওষুধ নিয়ে সময়ক্ষেপণ করলে জটিলতা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে আক্রান্ত শিশুকে অন্য শিশুদের কাছ থেকে আলাদা রাখা, পুষ্টিকর খাবার দেওয়া এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলাও গুরুত্বপূর্ণ।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কয়েকটি বিষয়ে দ্রুত জোর দেওয়া দরকার। টিকা না পাওয়া শিশু শনাক্ত করা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ঘরে ঘরে টিকাদান নিশ্চিত করা, হাসপাতালে শিশু চিকিৎসা সক্ষমতা বাড়ানো, অভিভাবকদের সচেতন করা এবং মৃত্যুর তথ্য দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা-এসব পদক্ষেপ একসঙ্গে কার্যকর করতে হবে। তারা সতর্ক করছেন, টিকাদান কার্যক্রম আরও জোরদার না হলে সামনের দিনগুলোতে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।