স্কটল্যান্ডকে উড়িয়ে নকআউটে ব্রাজিল

স্কটল্যান্ডকে উড়িয়ে নকআউটে ব্রাজিল
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত ব্রাজিলকে নিয়ে প্রশ্ন ছিল অনেক। কার্লো আনচেলত্তির অধীনে দলটি কি সেই পুরোনো ব্রাজিল হয়ে উঠতে পারবে? ভিনিসিয়ুস জুনিয়র কি নেতৃত্বের ভার নিতে পারবেন? আর চোট কাটিয়ে ফেরা নেইমারকে আদৌ দেখা যাবে কি না, সেটিও ছিল বড় প্রশ্ন।

মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয়ের পর অন্তত একটি রাতের জন্য সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিয়েছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।

 

ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের জোড়া গোল, মাতেউস কুনিয়ার আরেকটি গোল এবং প্রায় এক হাজার দিন পর বিশ্বকাপে নেইমারের প্রত্যাবর্তন-সব মিলিয়ে ব্রাজিলের জন্য এটি ছিল স্মরণীয় এক সন্ধ্যা। এই জয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবে শেষ ৩২ নিশ্চিত করেছে কার্লো আনচেলত্তির দল।

 

গ্রুপ সেরা হওয়ার লড়াই

ম্যাচের আগে সমীকরণ ছিল বেশ জটিল। একই সময়ে আটলান্টায় মরক্কো খেলছিল হাইতির বিপক্ষে। দুই দলই জিতলে গোল ব্যবধানের হিসেবে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন নির্ধারিত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল।

 

মরক্কো শেষ পর্যন্ত ৪-২ গোলে জিতলেও ব্রাজিলকে সেই ম্যাচের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়নি। নিজেদের ম্যাচেই দারুণ পারফরম্যান্স করে সাত পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপের শীর্ষস্থান নিশ্চিত করেছে তারা। মরক্কোও সাত পয়েন্ট পেলেও গোল ব্যবধানে পিছিয়ে রানার্সআপ হয়েছে।

 

শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ব্রাজিল

ম্যাচের প্রথম কয়েক মিনিট স্কটল্যান্ড বলের দখল রাখলেও ব্রাজিলের আক্রমণভাগ ছিল অনেক বেশি কার্যকর।

 

অষ্টম মিনিটেই স্কটিশ রক্ষণভাগের ভুলের সুযোগ নেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। গোলরক্ষক অ্যাঙ্গাস গানকে কাটিয়ে সহজেই বল জালে পাঠিয়ে দলকে এগিয়ে দেন তিনি। সেই গোলের পর থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করে ব্রাজিল। প্রথমার্ধের মাঝামাঝি সময়ে স্কটল্যান্ড কিছুটা বলের দখল রাখলেও তাদের আক্রমণগুলো ছিল ধারহীন। অন্যদিকে ব্রাজিল দ্রুত পাল্টা আক্রমণে বারবার বিপদ তৈরি করছিল।

 

যোগ করা সময়ে দ্বিতীয় আঘাত

প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে ব্রুনো গিমারাইসের ক্রস থেকে হেডে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। এই গোলের মাধ্যমে চলতি বিশ্বকাপে তার গোলসংখ্যা দাঁড়ায় চারে। গোলদাতাদের তালিকায়ও তিনি উঠে আসেন শীর্ষ লড়াইয়ে। রিয়াল মাদ্রিদের এই তারকা পুরো ম্যাচেই স্কটিশ রক্ষণভাগকে ভোগান। গতি, ড্রিবলিং এবং ফিনিশিং-তিন ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন দুর্দান্ত।

 

দ্বিতীয়ার্ধে কুনিয়ার সমাপ্তি

বিরতির পর স্কটল্যান্ড কিছুটা আক্রমণে ওঠার চেষ্টা করে। জন ম্যাকগিন এবং অ্যান্ডি রবার্টসনের নেতৃত্বে কয়েকটি আক্রমণ তৈরি হলেও গোলরক্ষক আলিসন বেকার সেগুলো ঠেকিয়ে দেন। ৬০ মিনিটে দারুণ দলীয় আক্রমণ থেকে তৃতীয় গোলটি করেন মাতেউস কুনিয়া। ব্রুনো গিমারাইসের দ্বিতীয় অ্যাসিস্ট থেকে গোল করে ব্রাজিলের জয় নিশ্চিত করেন এই ফরোয়ার্ড। কুনিয়া পুরো ম্যাচেই সামনে থেকে চাপ সৃষ্টি করেছেন এবং ভিনিসিয়ুসের সঙ্গে তার বোঝাপড়াও চোখে পড়ার মতো ছিল।

 

৯৮১ দিন পর বিশ্বকাপে নেইমার

ম্যাচের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত আসে ৭৬ মিনিটে। মাতেউস কুনিয়ার পরিবর্তে মাঠে নামেন নেইমার। প্রায় ৯৮১ দিন পর ব্রাজিলের জার্সিতে বিশ্বকাপে মাঠে নামলেন এই তারকা। গ্যালারি তখন ‘ওলে, ওলে, নেইমার’ ধ্বনিতে মুখরিত। দীর্ঘ চোট কাটিয়ে ফিরে আসা এই তারকার জন্য মায়ামির দর্শকরা দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানান।

 

নেইমার মাঠে নেমেই কয়েকটি আক্রমণ তৈরি করেন এবং ভিনিসিয়ুসের জন্য একটি সুযোগও সৃষ্টি করেন। যদিও গোল পাননি, তবে তার উপস্থিতিই পুরো ম্যাচের আবহ বদলে দেয়।

 

আনচেলত্তির ব্রাজিল কি ফিরে আসছে?

মরক্কোর বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে ১-১ ড্রয়ের পর সমালোচনার মুখে পড়েছিল ব্রাজিল। হাইতির বিপক্ষে ৩-০ জিতলেও দ্বিতীয়ার্ধের পারফরম্যান্স নিয়ে প্রশ্ন ছিল। কিন্তু স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে দলটি অনেক বেশি সংগঠিত, আত্মবিশ্বাসী এবং আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলেছে। কার্লো আনচেলত্তি ম্যাচ শেষে বলেন, দলটি এখন আরও শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠছে। তিনি বিশেষভাবে ভিনিসিয়ুসের প্রশংসা করেন।

 

স্কটল্যান্ডের হতাশা

স্কটল্যান্ডের জন্য এটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ। ড্র করলেও নকআউটে ওঠার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকত। কিন্তু তিন গোলের ব্যবধানে হেরে তারা এখন অন্য গ্রুপের ফলাফলের দিকে তাকিয়ে আছে। স্কটিশ কোচ স্টিভ ক্লার্ক ম্যাচ শেষে বলেন, ব্রাজিলের মানের সঙ্গে তাদের দল তাল মেলাতে পারেনি। অধিনায়ক অ্যান্ডি রবার্টসনও স্বীকার করেন যে তাদের ভবিষ্যৎ এখন অন্য দলের ফলাফলের ওপর নির্ভর করছে।

 

ভিনিসিয়ুসের নতুন রেকর্ড

চলতি বিশ্বকাপে তিন ম্যাচে চার গোল করেছেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। বিশ্বকাপের টানা তিন ম্যাচে গোল করার কীর্তি গড়ে তিনি জাইরজিনহো, রোমারিও, রিভালদো এবং রোনালদোর মতো ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তিদের পাশে জায়গা করে নিয়েছেন।

 

শেষ ৩২-এ কার মুখোমুখি হবে ব্রাজিল?

গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় ২৯ জুন হিউস্টনে শেষ ৩২-এর ম্যাচ খেলবে ব্রাজিল। প্রতিপক্ষ হতে পারে নেদারল্যান্ডস, জাপান কিংবা সুইডেনের মধ্যে কোনো একটি দল। বিশেষ করে জাপান এবং নেদারল্যান্ডসের বর্তমান ফর্ম বিবেচনায় ব্রাজিলের জন্য নকআউট পর্ব মোটেও সহজ হবে না।

 

মায়ামি থেকে যে বার্তা দিল ব্রাজিল

মায়ামির এই রাত শুধু একটি জয়ের গল্প নয়। এটি ছিল আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার গল্প। ভিনিসিয়ুসের জাদু, কুনিয়ার কার্যকারিতা, আলিসনের দৃঢ়তা এবং নেইমারের প্রত্যাবর্তন-সব মিলিয়ে ব্রাজিল যেন আবারও নিজেদের পরিচিত রূপে ফিরতে শুরু করেছে।

 

ভিনিসিয়ুসদের পায়ে হয়তো এখনও পুরোপুরি ‘জোগো বনিতো’ ফিরে আসেনি, কিন্তু স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে তারা যে বার্তা দিয়েছে, সেটি স্পষ্ট-নকআউট পর্বে ব্রাজিলকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা আবারও নিজেদের বিশ্বকাপ দাবিদার হিসেবে ঘোষণা করেছে।


সম্পর্কিত নিউজ