{{ news.section.title }}
হাইতির বাধা পেরিয়ে নকআউটে মরক্কো
বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে অনেক সময় এমন কিছু ম্যাচ দেখা যায়, যেখানে ফলাফলের চেয়ে গল্পটাই বড় হয়ে ওঠে। আটলান্টার স্টেডিয়ামে মরক্কো ও হাইতির মধ্যকার ম্যাচটি ছিল ঠিক তেমনই এক নাটকীয় লড়াই। ছয় গোল, দুইবার পিছিয়ে পড়া, দারুণ প্রত্যাবর্তন, ইতিহাস সৃষ্টি এবং শেষ পর্যন্ত মরক্কোর নকআউট নিশ্চিত-সব মিলিয়ে ম্যাচটি ছিল এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম উপভোগ্য লড়াই।
গ্রুপ ‘সি’-এর শেষ ম্যাচে হাইতিকে ৪-২ গোলে হারিয়ে শেষ ৩২ নিশ্চিত করেছে মরক্কো। তবে এই জয় সহজ ছিল না। বিশ্বকাপ থেকে আগেই বিদায় নিশ্চিত হওয়া হাইতি দুইবার এগিয়ে গিয়ে মরক্কোকে চাপে ফেলে দেয়। শেষ পর্যন্ত বদলি খেলোয়াড়দের গোলে নাটকীয় জয় তুলে নেয় আফ্রিকার প্রতিনিধিরা।
মরক্কোর এই জয়ে দুই দলেরই পয়েন্ট দাঁড়ায় সাত। কিন্তু একই সময়ে স্কটল্যান্ডকে ৩-০ গোলে হারানো ব্রাজিল গোল ব্যবধানে এগিয়ে থেকে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়। মরক্কোকে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে রানার্সআপ হয়েই।
ম্যাচের আগে পরিস্থিতি ছিল স্পষ্ট। জয় পেলে নকআউট নিশ্চিত হবে মরক্কোর। পাশাপাশি বড় ব্যবধানে জিততে পারলে ব্রাজিলকে টপকে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ারও সুযোগ ছিল। সেই লক্ষ্যেই কোচ মোহাম্মদ ওহবি আক্রমণাত্মক একাদশ সাজান এবং চারটি পরিবর্তন নিয়ে মাঠে নামেন। অতিরিক্ত স্ট্রাইকার হিসেবে আয়ুব এল কাবিকেও দলে নেন তিনি।
কিন্তু ম্যাচের শুরুতেই বড় ধাক্কা খায় মরক্কো। দশম মিনিটে হাইতির আক্রমণ থেকে তৈরি হওয়া একটি পরিস্থিতিতে গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনোর আত্মঘাতে এগিয়ে যায় ক্যারিবীয় দেশটি। বিশ্বকাপে হাইতির এটি ছিল দীর্ঘ ৫২ বছরের অপেক্ষার পর পাওয়া গোল। পুরো স্টেডিয়াম যেন বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে যায়।
তবে পিছিয়ে পড়েও ভেঙে পড়েনি মরক্কো। আক্রমণের গতি বাড়িয়ে দেয় তারা। ডান প্রান্তে আচরাফ হাকিমির দৌড় এবং মাঝমাঠে ইসমাইল সাইবারির নিয়ন্ত্রণে ম্যাচে ফেরার চেষ্টা শুরু হয়।
৩৯ মিনিটে অবশেষে সমতা ফেরান অধিনায়ক আচরাফ হাকিমি। ডিফেন্ডার হয়েও পুরো টুর্নামেন্টে আক্রমণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন পিএসজি তারকা। এই গোলের পর মনে হচ্ছিল মরক্কো ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ফেলেছে।
কিন্তু হাইতি আবারও সবাইকে চমকে দেয়। প্রথমার্ধের শেষ দিকে দুর্দান্ত এক দূরপাল্লার শটে দলকে আবারও এগিয়ে দেন উইলসন ইসিদোর। এই গোলকে অনেক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ম্যাচের অন্যতম সেরা গোল হিসেবে বর্ণনা করেছে।
প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার আগে দুইবার পিছিয়ে পড়া মরক্কোর ওপর তখন বিশাল চাপ। কারণ একই সময়ে ব্রাজিল স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে এগিয়ে ছিল।
দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হতেই আবার ম্যাচে ফিরে আসে মরক্কো। ৪৬ মিনিটে ইসমাইল সাইবারি সমতা ফেরান। পুরো টুর্নামেন্টেই দুর্দান্ত ফর্মে থাকা এই মিডফিল্ডার টানা তৃতীয় ম্যাচে গোল করেন। বিশ্বকাপে মরক্কোর অন্যতম আবিষ্কার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে তাকে।
এরপর শুরু হয় মরক্কোর একের পর এক আক্রমণ। পুরো ম্যাচে তারা ২০টির বেশি শট নেয় এবং বলের দখলেও স্পষ্ট আধিপত্য দেখায়। হাইতির গোলরক্ষক জনি প্লাসিদ বারবার দলকে রক্ষা করছিলেন। তার কয়েকটি অসাধারণ সেভ না থাকলে ব্যবধান আরও বড় হতে পারত।
ম্যাচের ৭৮ মিনিটে বদলি খেলোয়াড় সৌফিয়ান রাহিমি অবশেষে মরক্কোকে প্রথমবারের মতো এগিয়ে দেন। একটি সেট পিস থেকে আসা বল জালে পাঠিয়ে স্টেডিয়ামে উল্লাসের বিস্ফোরণ ঘটান তিনি।
এরপর ৮৯ মিনিটে ২০ বছর বয়সী গেসিম ইয়াসিন শেষ গোলটি করে ম্যাচের নিষ্পত্তি করেন। ভিএআর যাচাইয়ের পর গোলটি অনুমোদন পায় এবং নিশ্চিত হয় মরক্কোর জয়।
মরক্কোর কোচ মোহাম্মদ ওহবি ম্যাচ শেষে বলেন, তার দল হয়তো প্রত্যাশামতো শুরু করতে পারেনি, কিন্তু খেলোয়াড়দের মানসিকতা এবং ফিরে আসার ক্ষমতা তাকে সন্তুষ্ট করেছে। তিনি বলেন, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল জয় এবং শেষ পর্যন্ত সেটিই তারা অর্জন করেছে।
অন্যদিকে হাইতির কোচ সেবাস্তিয়ান মিগনে পরাজয়ের পরও নিজের খেলোয়াড়দের প্রশংসা করেন। তার মতে, বিশ্বকাপে হাইতির এই পারফরম্যান্স ভবিষ্যতের জন্য বড় অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিলেও হাইতি এবারের আসরে অনেকের মন জয় করেছে। ৫২ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরে তারা ব্রাজিল, স্কটল্যান্ড এবং মরক্কোর মতো দলের বিপক্ষে সাহসী ফুটবল খেলেছে। বিশেষ করে এই ম্যাচে করা দুটি গোল হাইতির ফুটবল ইতিহাসে বিশেষ জায়গা করে নেবে।
মরক্কোর জন্য এই জয় আরও একটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ। ব্রাজিলের সঙ্গে ড্র এবং স্কটল্যান্ডকে হারানোর পর তারা প্রমাণ করেছে যে ২০২২ বিশ্বকাপের সাফল্য কোনো কাকতালীয় ঘটনা ছিল না। নতুন কোচের অধীনে দলটি আরও আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলছে এবং নকআউট পর্বে তারা যে কোনো দলের জন্যই কঠিন প্রতিপক্ষ হতে পারে।
এখন শেষ ৩২-এর লড়াইয়ে গ্রুপ ‘এফ’-এর চ্যাম্পিয়ন দলের মুখোমুখি হবে মরক্কো। সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ হিসেবে রয়েছে নেদারল্যান্ডস, জাপান কিংবা সুইডেন। অন্যদিকে বিশ্বকাপ শেষ হলেও হাইতি বিদায় নিচ্ছে মাথা উঁচু করেই।
আটলান্টার এই রাতে জয় পেয়েছে মরক্কো, কিন্তু ইতিহাস লিখেছে হাইতিও।