{{ news.section.title }}
এমন ব্রাজিলই দেখতে চায় বিশ্বকাপ
বিশ্বকাপে ব্রাজিলের ফুটবল শুধু ফলাফলের গল্প নয়, এটি এক ধরনের অনুভূতি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ফুটবলপ্রেমীরা ব্রাজিলকে দেখেছে সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে। বল পায়ে ছন্দ, আক্রমণে শিল্প আর মাঠজুড়ে আনন্দ-এই তিনটি শব্দই যেন একসময় ব্রাজিলের পরিচয় ছিল। ফুটবল লেখক অ্যালেক্স বেলোজ একবার বলেছিলেন, ব্রাজিল যখন নিজেদের সেরা ফুটবল খেলে, তখন সেটিই ফুটবলের ‘প্লেটোনিক ফর্ম’, অর্থাৎ ফুটবলের পরম রূপ।
সেই ফুটবল অবশ্য অনেক বছর ধরেই খুঁজে ফিরছে সেলেসাওরা। একের পর এক হতাশা, কোপা আমেরিকার ব্যর্থতা, বিশ্বকাপের আক্ষেপ এবং সাম্প্রতিক সময়ের অস্থিরতা ব্রাজিলকে অনেকটাই বদলে দিয়েছিল। কিন্তু স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয় যেন নতুন করে আশার আলো দেখাল পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের।
এটি কেবল একটি জয় নয়। এটি ছিল আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার গল্প, ছিল ছন্দে ফেরার গল্প এবং ছিল বিশ্বকাপের বাকি দলগুলোর উদ্দেশে এক নীরব সতর্কবার্তা।
শুরু থেকেই ভিন্ন এক ব্রাজিল
ম্যাচের শুরু থেকেই বোঝা যাচ্ছিল, আগের দুই ম্যাচের ব্রাজিল আর এই ব্রাজিল এক নয়। মরক্কোর বিপক্ষে ড্র এবং হাইতির বিপক্ষে জয়ের পরও সমালোচনা ছিল। আক্রমণে ধার ছিল না, মাঝমাঠে ছিল অস্থিরতা, আর রক্ষণেও দেখা যাচ্ছিল কিছু দুর্বলতা। কিন্তু স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে শুরু থেকেই ছিল শৃঙ্খলা, আত্মবিশ্বাস এবং স্পষ্ট পরিকল্পনা।
প্রতিপক্ষের বিল্ডআপে চাপ সৃষ্টি, দ্রুত বল পুনরুদ্ধার এবং আক্রমণে গতির ব্যবহার-সবকিছুতেই ছিল উন্নতির ছাপ। স্কটল্যান্ড নিজেদের খেলাটাই খেলতে পারেনি। পুরো ম্যাচজুড়ে তাদেরকে ব্রাজিলের গতির সঙ্গে তাল মেলাতে হয়েছে।
ভিনিসিয়ুস: একজন তারকার পূর্ণতা
অনেকদিন ধরেই প্রশ্ন ছিল, নেইমারের পর ব্রাজিলের নতুন নেতা কে? এই বিশ্বকাপে সেই প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র।
স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে দুই গোল করলেও শুধুমাত্র গোল দিয়েই তাকে বিচার করলে ভুল হবে। বল পায়ে তার গতি, জায়গা তৈরি করার দক্ষতা, প্রতিপক্ষকে টেনে নেওয়া এবং আক্রমণ তৈরি করার ক্ষমতা পুরো ম্যাচে স্কটিশদের দিশেহারা করে রেখেছিল।
প্রথম গোলটি আসে প্রতিপক্ষের ভুল থেকে, কিন্তু সেই ভুল সৃষ্টি হয়েছিল ব্রাজিলের উচ্চ প্রেসিংয়ের কারণে। দ্বিতীয় গোলে হেড করে জাল খুঁজে নেওয়ার সময়ও তার অবস্থান ছিল নিখুঁত।
অফসাইডের কারণে বাতিল হওয়া আরেকটি গোল গণনায় এলে প্রথমার্ধেই হ্যাটট্রিক করতে পারতেন তিনি। বর্তমান সময়ে বিশ্বের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় কেন তাকে বলা হয়, এই ম্যাচে তার স্পষ্ট প্রমাণ দিয়েছেন ভিনি।
ব্রুনো গিমারাইসের অদৃশ্য প্রভাব
গোল না করলেও ম্যাচের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় ছিলেন ব্রুনো গিমারাইস। মাঝমাঠে বলের নিয়ন্ত্রণ, আক্রমণ তৈরি, পাসের গতি এবং দুইটি অ্যাসিস্ট-সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন ব্রাজিলের মস্তিষ্ক। লুকাস পাকেতার সঙ্গে তার বোঝাপড়া পুরো ম্যাচে স্কটল্যান্ডের মিডফিল্ডকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। বিশেষ করে দ্বিতীয় গোলের আগে তার ক্রস এবং তৃতীয় গোলের আক্রমণ তৈরিতে তার অবদান ছিল অসাধারণ।
কুনিয়ার নীরব অবদান
মাতেউস কুনিয়া হয়তো ভিনিসিয়ুসের মতো আলোচনায় ছিলেন না, কিন্তু ব্রাজিলের আক্রমণভাগে তার গুরুত্ব ছিল অনেক। তৃতীয় গোলটি করে ম্যাচের ভাগ্য চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করেন তিনি। কিন্তু তার কাজ শুধু গোল করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের টেনে বের করে আনা, জায়গা তৈরি করা এবং দ্রুত আক্রমণে যুক্ত হওয়ার কাজগুলো তিনি দারুণভাবে করেছেন। বিশ্বকাপের শুরু থেকেই কুনিয়া ভালো খেলছিলেন। স্কটল্যান্ড ম্যাচে সেটি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
রায়ানের উত্থান ব্রাজিলের নতুন সুখবর
রাফিনিয়ার জায়গায় সুযোগ পাওয়া তরুণ রায়ান এই ম্যাচের অন্যতম ইতিবাচক দিক। অভিষেক ম্যাচের তুলনায় অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী ছিলেন তিনি। বাম প্রান্তে স্কটল্যান্ডকে বারবার চাপে ফেলেছেন। ড্রিবল, গতি এবং আক্রমণে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি নতুন একটি বিকল্প হয়ে উঠছেন। বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে নতুন খেলোয়াড়ের আত্মবিশ্বাস অর্জন ব্রাজিলের জন্য বড় অর্জন।
রক্ষণেও দৃঢ়তা
এই ম্যাচে আলিসনের কাজ খুব বেশি ছিল না। কারণ রক্ষণভাগ পুরো ম্যাচে অসাধারণ খেলেছে। মারকুইনহোস, গ্যাব্রিয়েল এবং ফুলব্যাকরা স্কটিশ আক্রমণকে প্রায় নিষ্ক্রিয় করে রেখেছিলেন। স্কটল্যান্ড দ্বিতীয়ার্ধে দুই-একটি সুযোগ তৈরি করলেও আলিসন এবং ডিফেন্ডাররা সেগুলো সামলে নেন। আগের দুই ম্যাচে যেসব দুর্বলতা দেখা গিয়েছিল, সেগুলোর অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছে ব্রাজিল।
আনচেলত্তির ডায়মন্ড ফরমেশন
কার্লো আনচেলত্তির ডায়মন্ড মিডফিল্ড নিয়ে শুরুতে অনেক প্রশ্ন উঠেছিল। মরক্কোর বিপক্ষে সেটি পুরোপুরি কাজ করেনি। হাইতির বিপক্ষেও দ্বিতীয়ার্ধে সমস্যা দেখা দিয়েছিল। কিন্তু স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে এই কৌশল পুরোপুরি সফল হয়েছে।
মাঝমাঠে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ, আক্রমণে সংখ্যাগত সুবিধা এবং দ্রুত ট্রানজিশন-সবকিছুতেই সুবিধা পেয়েছে ব্রাজিল। বিশেষ করে ভিনিসিয়ুস, কুনিয়া এবং পাকেতার স্বাভাবিক বোঝাপড়া এই ফরমেশনকে কার্যকর করেছে।
৯৮১ দিন পর নেইমারের প্রত্যাবর্তন
ম্যাচের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত আসে ৭৬ মিনিটে। মাতেউস কুনিয়ার বদলি হিসেবে মাঠে নামেন নেইমার। প্রায় ৯৮১ দিন পর বিশ্বকাপে ব্রাজিলের জার্সিতে মাঠে ফেরেন এই তারকা। গ্যালারিতে তখন শুধু একটি নাম-নেইমার।
‘ওলে, ওলে, নেইমার’ ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো স্টেডিয়াম। চোটের কারণে দীর্ঘ সময় মাঠের বাইরে থাকা এই ফুটবলার মাঠে নেমেই কয়েকটি সুন্দর আক্রমণ তৈরি করেন। যদিও গোল পাননি, কিন্তু তার উপস্থিতিই যেন ব্রাজিলের আত্মবিশ্বাস আরও বাড়িয়ে দেয়।
স্কটল্যান্ডের হতাশার রাত
স্কটল্যান্ড ম্যাচটিতে খুব বেশি কিছু করতে পারেনি। ব্রাজিলের গতির সঙ্গে তারা তাল মেলাতে পারেনি। মাঝমাঠে বল ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। আক্রমণেও ধার ছিল না। দুই-একটি সুযোগ তৈরি হলেও সেগুলো কাজে লাগানোর মতো মানের ফুটবল তারা দেখাতে পারেনি। তাদের রক্ষণভাগও বারবার ভুল করেছে এবং সেই ভুলের সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগিয়েছে ব্রাজিল।
বিশ্বকাপে নতুন বার্তা
এই জয় ব্রাজিলকে শুধু শেষ ৩২-এ তুলেনি। এই জয় তাদের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দিয়েছে। ভিনিসিয়ুসের ফর্ম, কুনিয়ার কার্যকারিতা, ব্রুনোর নেতৃত্ব, রায়ানের উত্থান এবং নেইমারের প্রত্যাবর্তন-সব মিলিয়ে বিশ্বকাপে নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে সেলেসাওরা। বিশ্বকাপের শুরুতে যাদের নিয়ে প্রশ্ন ছিল, এখন তারাই প্রতিপক্ষদের উদ্বেগের কারণ।
ব্রাজিল কি সত্যিই ফিরে এসেছে?
এখনই হয়তো বলা যাবে না যে পুরোনো ‘জোগো বনিতো’ ফিরে এসেছে। ১৯৭০ কিংবা ২০০২ সালের সেই জাদুকরী ব্রাজিলের সঙ্গে এই দলকে তুলনা করাও সময়ের আগে হবে। কিন্তু একটি বিষয় পরিষ্কার-এই দলটি নিজেদের খুঁজে পেতে শুরু করেছে।
বিশ্বকাপের নকআউট পর্ব যত এগিয়ে আসছে, ততই ছন্দে ফিরছে ব্রাজিল। আর ইতিহাস বলে, বিশ্বকাপে ব্রাজিল যখন নিজেদের সেরা রূপের কাছাকাছি পৌঁছে যায়, তখন প্রতিপক্ষদের জন্য সেটি সবচেয়ে বড় দুঃসংবাদ হয়ে দাঁড়ায়।
স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয় হয়তো কেবল একটি ফলাফল। কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে আরও বড় একটি বার্তা-ব্রাজিল আবার বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে তারাও বিশ্বকাপ জিততে পারে।