{{ news.section.title }}
দেম্বেলের হ্যাটট্রিকে গ্রুপ সেরা ফ্রান্স, নরওয়ের প্রতিপক্ষ আইভরিকোস্ট
বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচগুলো অনেক সময় আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়। বিশেষ করে যখন দুই দলই আগেই নকআউট নিশ্চিত করে ফেলে। কিন্তু বোস্টনের গিলেট স্টেডিয়ামে ফ্রান্স ও নরওয়ের মধ্যকার লড়াই ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক গল্প। এখানে ছিল বিশ্বকাপের দ্রুততম হ্যাটট্রিকগুলোর একটি, ছিল উসমান দেম্বেলের অসাধারণ একক নৈপুণ্য, ছিল আর্লিং হ্যালান্ডকে বেঞ্চে বসিয়ে নরওয়ের বড় ঝুঁকি এবং ছিল ফরাসি শক্তিমত্তার স্পষ্ট প্রদর্শন।
ফলাফলও এসেছে একতরফা। উসমান দেম্বেলের হ্যাটট্রিকে নরওয়েকে ৪-১ গোলে হারিয়ে গ্রুপ ‘আই’-এর চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ফ্রান্স। একই সঙ্গে বিশ্বকাপের শেষ ৩২-এর আগে বড় বার্তা দিয়েছে কিলিয়ান এমবাপ্পের দল।
শুরুতেই ঝড়
ম্যাচ শুরুর কয়েক মিনিটের মধ্যেই বোঝা যাচ্ছিল, দেম্বেলে আজ অন্য মেজাজে মাঠে নেমেছেন। সপ্তম মিনিটে প্রথম গোল করেন তিনি। ডান প্রান্ত থেকে ভেতরে ঢুকে নিচু শটে নরওয়ের গোলরক্ষককে পরাস্ত করেন ফরাসি উইঙ্গার। ২০ মিনিটে আবারও গোল করেন দেম্বেলে। মাঝমাঠ থেকে দ্রুত আক্রমণ গড়ে ওঠে, এমবাপ্পের পাস থেকে বল পেয়ে দুর্দান্ত ফিনিশিং করেন তিনি।
এরপর ৩২ মিনিটে নিজের হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন দেম্বেলে। এই তিনটি গোল করতে সময় নেন মাত্র ২৫ মিনিট। বিশ্বকাপের গত ৭২ বছরের ইতিহাসে এটি অন্যতম দ্রুত হ্যাটট্রিক। ফ্রান্সের জার্সিতে বড় টুর্নামেন্টে দেম্বেলের এটিই প্রথম হ্যাটট্রিক।
দেম্বেলের নতুন রূপ
অনেক বছর ধরেই উসমান দেম্বেলেকে প্রতিভাবান ফুটবলার হিসেবে দেখা হয়েছে। কিন্তু চোট, অনিয়মিত পারফরম্যান্স এবং ধারাবাহিকতার অভাব তাকে অনেক সময় সমালোচনার মুখেও ফেলেছে। এই বিশ্বকাপে সেই দেম্বেলেকে দেখা যাচ্ছে একেবারে নতুন রূপে।
নরওয়ের বিপক্ষে তিনি শুধু গোলই করেননি, পুরো ম্যাচে নরওয়ের ডিফেন্ডারদের বিভ্রান্ত করে রেখেছিলেন। গতি, ড্রিবলিং, জায়গা তৈরি করা এবং ফিনিশিং-সব ক্ষেত্রেই ছিলেন অনন্য। ফরাসি সংবাদমাধ্যমগুলো ম্যাচের পর এটিকে দেম্বেলের ‘মাস্টারক্লাস’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
এমবাপ্পের নীরব নেতৃত্ব
এই ম্যাচে গোল না পেলেও কিলিয়ান এমবাপ্পে ছিলেন অত্যন্ত কার্যকর। তিনি বারবার ডিফেন্ডারদের টেনে জায়গা তৈরি করেছেন, আক্রমণ সাজিয়েছেন এবং দেম্বেলেকে পর্যাপ্ত সুযোগ করে দিয়েছেন। বিশ্বকাপে এর আগের দুই ম্যাচে জোড়া গোল করা এমবাপ্পে এই ম্যাচে কিছুটা পেছনের ভূমিকায় খেলেন। ফরাসি কোচ দিদিয়ের দেশঁর কৌশলও ছিল সেটাই। কারণ দেম্বেলের গতি ব্যবহার করেই নরওয়ের রক্ষণ ভাঙতে চেয়েছিল ফ্রান্স।

নরওয়ের বিস্ময়কর সিদ্ধান্ত
ম্যাচের সবচেয়ে বড় চমক ছিল আর্লিং হ্যালান্ডকে বেঞ্চে রাখা। বিশ্বকাপের প্রথম দুই ম্যাচে চার গোল করা এই স্ট্রাইকারকে বিশ্রাম দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় নরওয়ে। শুধু হ্যালান্ডই নন, মূল একাদশে মোট ১০টি পরিবর্তন আনা হয়। এতে স্পষ্ট ছিল যে, নকআউট পর্বের কথা ভেবেই দল ঘুরিয়ে খেলাতে চেয়েছিলেন কোচ। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত মাঠে বড় মূল্য চুকিয়েছে নরওয়ে। হ্যালান্ড মাঠে থাকলে হয়তো ম্যাচের চিত্র পুরোপুরি বদলে না গেলেও নরওয়ে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ফুটবল খেলতে পারত।
নরওয়ের একমাত্র সান্ত্বনা
ফ্রান্সের আধিপত্যের মাঝেও নরওয়ে একটি গোল করতে সক্ষম হয়। ২১ মিনিটে থেলো অসগার্ড দুর্দান্ত এক শটে ফ্রান্সের জাল খুঁজে পান। এই গোলের পর কিছু সময়ের জন্য নরওয়ে ম্যাচে ফেরার ইঙ্গিত দিলেও দেম্বেলের তৃতীয় গোল সেই সম্ভাবনা শেষ করে দেয়। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেও সুযোগ পেয়েছিল নরওয়ে।৫০ মিনিটে পেনাল্টি পায় তারা। কিন্তু ইয়র্গেন স্ট্রান্ড লারসেনের দুর্বল শট সহজেই ঠেকিয়ে দেন মাইক মাইনিয়ঁ। এই সেভটিও ম্যাচের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হয়ে ওঠে।
দুয়ের প্রত্যাবর্তন
দীর্ঘ সময় পর মূল একাদশে ফিরেছিলেন দেজিরে দুয়ে। ম্যাচের যোগ করা সময়ে গোল করে নিজের প্রত্যাবর্তন স্মরণীয় করে রাখেন তিনি। ফরাসি আক্রমণভাগের গভীরতা বোঝাতেও এই গোলের গুরুত্ব রয়েছে। দেম্বেলে, এমবাপ্পে, দুয়ে, গ্রিজমান, কামাভিঙ্গা, চুয়ামেনি-সব মিলিয়ে ফ্রান্সের আক্রমণ ও মাঝমাঠ এখন বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ইউনিট।
মাইনিয়ঁর দৃঢ়তা
ফ্রান্সের গোলরক্ষক মাইক মাইনিয়ঁ এই ম্যাচে খুব বেশি ব্যস্ত না থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে নিজের দায়িত্ব পালন করেছেন। বিশেষ করে পেনাল্টি সেভটি ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। নরওয়ে যদি তখন ব্যবধান ৩-২ করতে পারত, তাহলে দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচ আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হতে পারত।
গ্রুপ ‘আই’-এর সমীকরণ
এই জয়ের ফলে ফ্রান্স ৯ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। নরওয়ে ৬ পয়েন্ট নিয়ে রানার্সআপ হিসেবে নকআউটে উঠেছে। গ্রুপের অন্য দুই দল সেনেগাল ও ইরাক আগেই বিদায় নিশ্চিত করেছিল। ফলে শেষ ম্যাচটি মূলত শীর্ষস্থান নির্ধারণের লড়াইয়ে পরিণত হয়েছিল।
শেষ ৩২-এ কারা অপেক্ষা করছে?
ফ্রান্স এখন শেষ ৩২-এ অপেক্ষা করছে তৃতীয় স্থানধারী কোনো দলের জন্য।
সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ হতে পারে-
- সুইডেন
- অস্ট্রিয়া
- আলজেরিয়া
- ইরান
- স্কটল্যান্ড
বর্তমান সমীকরণে সুইডেনের সম্ভাবনাই বেশি। অন্যদিকে নরওয়ে শেষ ৩২-এ খেলবে আইভরিকোস্টের বিপক্ষে। হ্যালান্ডকে নিয়ে নরওয়ের আক্রমণভাগ যে কোনো প্রতিপক্ষের জন্যই বিপজ্জনক হতে পারে।
গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে দেম্বেলে
এই হ্যাটট্রিকের পর গোল্ডেন বুটের দৌড়েও উঠে এসেছেন উসমান দেম্বেলে।
বর্তমান তালিকায়-
- লিওনেল মেসি – ৫ গোল
- কিলিয়ান এমবাপ্পে – ৪ গোল
- আর্লিং হ্যালান্ড – ৪ গোল
- ভিনিসিয়ুস জুনিয়র – ৪ গোল
- উসমান দেম্বেলে – ৩ গোল
নকআউট পর্বে এই লড়াই আরও জমে উঠতে যাচ্ছে।
ফ্রান্সের শক্তির ঘোষণা
বিশ্বকাপের শুরুতে অনেকের নজর ছিল এমবাপ্পের দিকে। কিন্তু নরওয়ের বিপক্ষে ফ্রান্স দেখিয়ে দিয়েছে, তারা কেবল একজন তারকার দল নয়। দেম্বেলের বিস্ফোরণ, এমবাপ্পের নেতৃত্ব, মাইনিয়ঁর নির্ভরতা এবং গভীর স্কোয়াড-সব মিলিয়ে ফ্রান্স আবারও নিজেদের অন্যতম শিরোপা দাবিদার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। বোস্টনের এই রাতে সবচেয়ে বড় বার্তা ছিল একটাই-ফ্রান্স শুধু জিতছে না, তারা ধীরে ধীরে নিজেদের সেরা রূপেও ফিরছে।
আর বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ছন্দে থাকা ফ্রান্স যে কোনো দলের জন্যই সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাগুলোর একটি হতে পারে।