বিশ্বকাপে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের দেখা হতে পারে কবে?

বিশ্বকাপে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের দেখা হতে পারে কবে?
ছবির ক্যাপশান, প্রতীকী এআই জেনারেটেড ছবি

বিশ্বকাপ শুধু ফুটবলের টুর্নামেন্ট নয়, এটি প্রায়ই হয়ে ওঠে বিশ্বের রাজনৈতিক বাস্তবতারও একটি প্রতিচ্ছবি। মাঠের লড়াইয়ের বাইরে অনেক সময় আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, কূটনীতি, ইতিহাস এবং রাজনৈতিক উত্তেজনাও বিশ্বকাপকে ঘিরে আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। ২০২৬ বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে ঘিরে তৈরি হওয়া সম্ভাব্য মুখোমুখি লড়াই ঠিক তেমনই একটি আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি ও মার্চে ইরানি ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের পর দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়ে ওঠে। বহু বছর ধরেই ওয়াশিংটন ও তেহরানের সম্পর্ক উত্তেজনাপূর্ণ থাকলেও সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দুই দেশের রাজনৈতিক দূরত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এমন বাস্তবতায় বিশ্বকাপের মঞ্চে সম্ভাব্য ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ম্যাচ নিয়ে ফুটবল বিশ্বের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও আলোচনা শুরু হয়েছে।

 

বিশ্বকাপ শুরুর আগেই ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের বিষয়টি নিয়ে নানা আলোচনা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ফিফার নিয়ম অনুযায়ী বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া সব দেশকে আয়োজক দেশগুলোতে প্রবেশের সুযোগ দিতে হয়। সে কারণেই ইরান তাদের গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলো যুক্তরাষ্ট্রে খেলছে। তবে নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে তারা যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী ক্যাম্প গড়তে পারেনি।

 

ইরানি দল তাদের ঘাঁটি তৈরি করেছে মেক্সিকোতে। যুক্তরাষ্ট্রে ম্যাচ খেলেই আবার মেক্সিকোতে ফিরে যেতে হচ্ছে তাদের। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর মতে, সাম্প্রতিক ইতিহাসে বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া কোনো বড় দলের জন্য এমন পরিস্থিতি খুবই বিরল।

 

মাঠের হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই নিজেদের কাজ অনেকটাই সেরে ফেলেছে। গ্রুপ ‘ডি’-তে টানা দুই জয় তুলে নিয়ে তারা শেষ ৩২ নিশ্চিত করেছে। শুধু তাই নয়, হেড-টু-হেড সুবিধা এবং পয়েন্টের ব্যবধানে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় নিশ্চিতভাবেই গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবে নকআউটে যাচ্ছে।

 

দ্বিতীয় ম্যাচে জয় পাওয়ার পর মার্কিন শিবিরে আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়েছে। কোচ এবং খেলোয়াড়রা এখন সরাসরি নকআউট পর্বের প্রস্তুতি শুরু করেছেন। বর্তমান সমীকরণ অনুযায়ী শেষ ৩২-এ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ হতে পারে গ্রুপ ‘বি’, ‘ই’, ‘এফ’, ‘আই’ অথবা ‘জে’-এর তৃতীয় স্থানধারী কোনো দল।

 

অন্যদিকে ইরানের পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। দুই ম্যাচ শেষে তাদের সংগ্রহ দুই পয়েন্ট এবং তারা গ্রুপ ‘জি’-এর দ্বিতীয় স্থানে অবস্থান করছে। গ্রুপের শীর্ষে রয়েছে মিসর।

 

ইরানের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ এখন মিসরের বিপক্ষে। এই ম্যাচ জিততে পারলে ইরান গ্রুপের শীর্ষে উঠে যেতে পারে এবং নকআউটের জন্য সুবিধাজনক অবস্থান তৈরি করতে পারবে। ড্র বা হার হলে তাদের ভাগ্য অন্য ম্যাচের ওপরও নির্ভর করতে পারে।

 

বর্তমান হিসাব অনুযায়ী ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা এখনও রয়েছে। তবে সেটি শেষ ৩২-এ নয়, বরং শেষ ষোলোতে।

 

যুক্তরাষ্ট্র যেহেতু নিজেদের গ্রুপে প্রথম হওয়া প্রায় নিশ্চিত করে ফেলেছে, তাই শেষ ৩২-এ তাদের প্রতিপক্ষ হবে তৃতীয় স্থানধারী কোনো দল। অন্যদিকে ইরান যদি গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়, তাহলে তারাও তৃতীয় স্থানধারী দলের বিপক্ষে খেলবে।

 

সেক্ষেত্রে দুই দলকেই প্রথমে নিজেদের শেষ ৩২-এর ম্যাচ জিততে হবে। তারপরই শেষ ষোলোতে সম্ভাব্য একটি ম্যাচে মুখোমুখি হতে পারে দুই দেশ।

 

বর্তমান সূচি অনুযায়ী সম্ভাব্য সেই ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হতে পারে ৭ জুলাই সিয়াটলে।

 

ফুটবল ইতিহাসে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাচ নতুন কিছু নয়। ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপে দুই দলের ম্যাচটি বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ হিসেবে বিবেচিত হয়। সেই ম্যাচে ইরান ২-১ গোলে জয় পায়। তৎকালীন ফিফা সভাপতি সেপ ব্লাটার সেই ম্যাচকে ‘শান্তির খেলা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। দুই দলের খেলোয়াড়েরা মাঠে নামার আগে ফুল বিনিময় করেছিলেন, যা বিশ্বজুড়ে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছিল।

 

পরবর্তীতে ২০২২ বিশ্বকাপেও দুই দল মুখোমুখি হয়েছিল। সেই ম্যাচে যুক্তরাষ্ট্র ১-০ গোলে জয় পেয়ে নকআউটে উঠেছিল, আর ইরানের বিশ্বকাপ শেষ হয়ে যায়। ফলে সম্ভাব্য নতুন এই ম্যাচ দুই দেশের মধ্যে তৃতীয় বিশ্বকাপ সাক্ষাৎ হতে পারে।

 

রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে এই ম্যাচ নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোও বিশেষ আগ্রহ দেখাচ্ছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলো সম্ভাব্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সংবাদমাধ্যমগুলো এটিকে ‘উচ্চ-ঝুঁকির ফুটবল ম্যাচ’ হিসেবে বর্ণনা করছে। তবে ফুটবল বিশেষজ্ঞদের অনেকেই মনে করেন, মাঠের ভেতরের খেলাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

 

ইরানের বর্তমান দলটি রক্ষণভাগে অনেক বেশি সংগঠিত। তারা প্রতিপক্ষকে জায়গা না দিয়ে খেলার চেষ্টা করে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র তরুণ ও গতিময় ফুটবল খেলছে। দ্রুত আক্রমণ, উচ্চ প্রেসিং এবং শারীরিক সক্ষমতা তাদের বড় শক্তি। যদি দুই দল সত্যিই মুখোমুখি হয়, তাহলে সেটি কেবল রাজনৈতিক কারণেই নয়, ফুটবলীয় কারণেও অত্যন্ত আকর্ষণীয় ম্যাচ হতে পারে।

 

বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে প্রতিটি ম্যাচই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কিছু কিছু ম্যাচ মাঠের বাইরের গল্পের কারণেও বিশেষ গুরুত্ব পায়। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য লড়াই ঠিক তেমনই একটি ম্যাচ। তবে সেই ম্যাচ দেখতে হলে এখনও কয়েকটি শর্ত পূরণ করতে হবে। ইরানকে প্রথমে মিসরের বাধা পার হতে হবে। এরপর শেষ ৩২-এর ম্যাচ জিততে হবে। যুক্তরাষ্ট্রকেও নিজেদের নকআউট ম্যাচে জয় পেতে হবে।

 

সব সমীকরণ মিলে গেলে সিয়াটলে এমন একটি ম্যাচ দেখা যেতে পারে, যেটি শুধু বিশ্বকাপের একটি ফুটবল ম্যাচ হবে না; বরং বিশ্ব রাজনীতি, ইতিহাস এবং ফুটবলের এক বিরল সংযোগস্থলে পরিণত হতে পারে। এই মুহূর্তে তাই ফুটবলপ্রেমীরা অপেক্ষা করছেন দুটি প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য-ইরান কি গ্রুপ পর্ব পার হতে পারবে? আর শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ কি উপহার দেবে আরেকটি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান মহারণ?

 

উত্তরটা লুকিয়ে আছে আগামী কয়েকটি ম্যাচের ফলাফলের মধ্যেই।


সম্পর্কিত নিউজ