বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব থেকে বাদ পড়ল যে ১০ দল

বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব থেকে বাদ পড়ল যে ১০ দল
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি। অনেক গ্রুপেই শেষ ম্যাচের আগে উত্তেজনা তুঙ্গে। কিন্তু এরই মধ্যে ১০টি দলের বিশ্বকাপ অভিযান শেষ হয়ে গেছে। এবারের আসরে প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল অংশ নেওয়ায় এবং সেরা আটটি তৃতীয় স্থানধারী দলকে নকআউটে খেলার সুযোগ দেওয়ায় শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অনেক দলের আশা বেঁচে থাকার কথা ছিল। কিন্তু নতুন টাইব্রেকিং নিয়মের কারণে কয়েকটি দল দুই ম্যাচ শেষেই কার্যত বিদায় নিশ্চিত করে ফেলে।

এবারের বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার যৌথ আয়োজনে নতুন যুগের সূচনা হয়েছে। ৩২ দলের বদলে ৪৮ দলের বিশ্বকাপ আয়োজনের ফলে ১২টি গ্রুপ তৈরি করা হয়েছে। প্রতিটি গ্রুপের শীর্ষ দুই দল সরাসরি শেষ ৩২-এ জায়গা পাচ্ছে। পাশাপাশি আটটি সেরা তৃতীয় স্থানধারী দলও সুযোগ পাচ্ছে নকআউটে।

 

তবুও এই বাড়তি সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি হাইতি, তুরস্ক, তিউনিসিয়া, জর্ডান, পানামা, কাতার, চেক প্রজাতন্ত্র, কুরাসাও, উরুগুয়ে ও সৌদি আরব।

 

সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ের বিদায়ে। স্পেন, কেপ ভার্দে ও সৌদি আরবের সঙ্গে থাকা গ্রুপ ‘এইচ’-এ অনেকেই উরুগুয়েকে সহজেই নকআউটে দেখছিলেন। কিন্তু প্রথম ম্যাচে কেপ ভার্দের সঙ্গে ড্র এবং স্পেনের কাছে পরাজয়ের কারণে মাত্র দুই পয়েন্ট নিয়েই বিদায় নিতে হয়েছে মার্সেলো বিয়েলসার দলকে।

 

৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ফার্নান্দো মুসলেরার অভিজ্ঞতা, ফেদেরিকো ভালভার্দে, ডারউইন নুনিয়েস কিংবা রোনাল্ড আরাউহোদের উপস্থিতিও দলটিকে বাঁচাতে পারেনি। বিশ্বকাপে টানা দ্বিতীয়বার গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হলো লাতিন আমেরিকার এই ঐতিহ্যবাহী দলকে।

 

তুরস্কের বিদায়ও এবারের আসরের অন্যতম বড় বিস্ময়। আরদা গুলার, কেনান ইলদিজ ও হাকান চালহানওলুদের নিয়ে অনেক আশা ছিল দেশটির। কিন্তু দুই ম্যাচে বিপুল সংখ্যক আক্রমণ গড়েও গোলের দেখা পায়নি তারা। অস্ট্রেলিয়ার কাছে হার এবং প্যারাগুয়ের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র তাদের বিদায় নিশ্চিত করে দেয়।

 

তিউনিসিয়াও কোচ পরিবর্তন করেও ভাগ্য বদলাতে পারেনি। সাব্রি লামুশিকে সরিয়ে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল হার্ভে রেনার্ডকে। কিন্তু জাপানের কাছে বড় ব্যবধানে পরাজয়ের পর আফ্রিকার দলটির বিশ্বকাপ স্বপ্ন শেষ হয়ে যায়।

 

পানামা শেষ ম্যাচ পর্যন্ত লড়াই করলেও ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ১-০ ব্যবধানে হার তাদের বিদায় নিশ্চিত করে। জর্ডান প্রথম বিশ্বকাপে অংশ নিয়েই কিছুটা আলো ছড়ালেও আর্জেন্টিনা, অস্ট্রিয়া ও আলজেরিয়ার কঠিন গ্রুপ থেকে আর এগোতে পারেনি।

 

ক্যারিবিয়ান দেশ হাইতি ৫২ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরে গোল করতে না পেরেই বিদায় নিয়েছে। ব্রাজিল ও স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে পরাজয়ের পাশাপাশি আক্রমণভাগের দুর্বলতা তাদের বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।

 

নতুন টাইব্রেকিং নিয়মে বদলে গেছে সমীকরণ

এবারের বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে ফিফার নতুন টাইব্রেকিং পদ্ধতি নিয়ে। আগের বিশ্বকাপগুলোতে সমান পয়েন্ট হলে প্রথমে গোল ব্যবধান দেখা হতো। কিন্তু এবার অলিম্পিক পদ্ধতির মতো প্রথমে দেখা হচ্ছে সমান পয়েন্ট পাওয়া দলগুলোর পারস্পরিক ফলাফল। এই নিয়মের কারণেই কয়েকটি দল দুই ম্যাচ শেষেই গাণিতিকভাবে বিদায় নিশ্চিত হয়ে যায়।

 

ধরা যাক, কোনো দল প্রথম দুই ম্যাচ হেরে গেছে। শেষ ম্যাচ জিতে তারা যদি তিন পয়েন্টেও পৌঁছায়, তবুও যাদের সঙ্গে পয়েন্ট সমান হবে তাদের বিপক্ষে আগেই হেরে থাকলে আর ওপরে ওঠা সম্ভব নয়। এই নিয়মের শিকার হয়েছে হাইতি, তুরস্ক, তিউনিসিয়া, জর্ডান ও পানামা। বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এতগুলো দল শেষ ম্যাচের আগেই প্রায় নিশ্চিতভাবে ছিটকে পড়েছে শুধুমাত্র পারস্পরিক ফলাফলের কারণে।

 

চেক প্রজাতন্ত্র ও কাতারের বিদায়ও অনেকটা আগেই নিশ্চিত হয়েছিল। দুই দলই প্রথম দুই ম্যাচে কাঙ্ক্ষিত ফল পায়নি। কুরাসাও একটি পয়েন্ট পেলেও শেষ পর্যন্ত লড়াইয়ে থাকতে পারেনি।

 

এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিশ্চিত হওয়া দলগুলো হলো-

  • চেক প্রজাতন্ত্র
  • কাতার
  • হাইতি
  • তুরস্ক
  • তিউনিসিয়া
  • জর্ডান
  • পানামা
  • কুরাসাও
  • উরুগুয়ে
  • সৌদি আরব

এই তালিকায় সবচেয়ে বড় নাম নিঃসন্দেহে উরুগুয়ে। দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলটির বিদায় বিশ্ব ফুটবলে বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অন্যদিকে সৌদি আরবও প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। ২০২২ সালে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে বিশ্বকে চমকে দেওয়া দলটি এবার গ্রুপ পর্বই পেরোতে পারেনি।

 

ফিফার বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী সমান পয়েন্ট পাওয়া দলগুলোর ক্ষেত্রে প্রথমে বিবেচনা করা হচ্ছে পারস্পরিক ম্যাচের পয়েন্ট। এরপর দেখা হচ্ছে পারস্পরিক ম্যাচের গোল ব্যবধান, সেই ম্যাচগুলোতে করা গোলের সংখ্যা, পুরো গ্রুপের গোল ব্যবধান, মোট গোলসংখ্যা, শৃঙ্খলাজনিত পয়েন্ট এবং শেষ পর্যন্ত প্রয়োজন হলে লটারির বিষয়। ফলে শেষ ম্যাচের আগে অনেক দলই বুঝে গেছে তাদের ভাগ্য।

 

তবে বিশ্বকাপের ইতিহাস বলছে, প্রতিটি টুর্নামেন্টই কিছু স্বপ্ন ভেঙে দেয়, আবার কিছু নতুন গল্প তৈরি করে। উরুগুয়ে, তুরস্ক বা তিউনিসিয়ার বিদায় যেমন হতাশার গল্প, তেমনি কেপ ভার্দে, মরক্কো কিংবা দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দলগুলোর সাফল্য এবারের আসরের অন্যতম বড় অর্জন।

 

গ্রুপ পর্ব এখনও শেষ হয়নি। আরও কয়েকটি দল বিদায় নেবে, কয়েকটি দল পৌঁছে যাবে শেষ ৩২-এ। তবে এখন পর্যন্ত বিদায় নেওয়া ১০টি দল মনে করিয়ে দিয়েছে, ২০২৬ বিশ্বকাপের নতুন ফরম্যাটে কোনো ভুলের সুযোগ নেই। দুই ম্যাচের ব্যর্থতাই কখনো কখনো শেষ করে দিতে পারে চার বছরের স্বপ্ন।


সম্পর্কিত নিউজ