কেপ ভার্দের চ্যালেঞ্জে আর্জেন্টিনা, গ্রুপ সেরার অপেক্ষায় স্পেন

কেপ ভার্দের চ্যালেঞ্জে আর্জেন্টিনা, গ্রুপ সেরার অপেক্ষায় স্পেন
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বকাপে অনেক সময় এমন কিছু দল আসে, যাদের সম্পর্কে শুরুতে খুব কম মানুষই জানে। টুর্নামেন্ট যত এগোয়, সেই দলগুলোই হয়ে ওঠে কোটি মানুষের দ্বিতীয় প্রিয় দল। ২০২৬ বিশ্বকাপে কেপ ভার্দে এখন ঠিক তেমনই এক গল্পের নাম।

আটলান্টিক মহাসাগরের ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রটি প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে অংশ নিয়েই লিখে ফেলেছে ইতিহাস। স্পেনের সঙ্গে ড্র, উরুগুয়ের বিপক্ষে দুর্দান্ত লড়াই এবং শেষ ম্যাচে সৌদি আরবের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র-সব মিলিয়ে মাত্র সাড়ে পাঁচ থেকে ছয় লাখ জনসংখ্যার দেশটি পৌঁছে গেছে বিশ্বকাপের শেষ ৩২-এ।

 

হিউস্টনের ম্যাচ শেষে স্কোরবোর্ডে গোল না থাকলেও কেপ ভার্দের খেলোয়াড়দের চোখে ছিল বিজয়ের আনন্দ। কারণ এই ড্র-ই তাদের ইতিহাস বদলে দিয়েছে। বিশ্বকাপের অভিষেক আসরেই নকআউট পর্বে জায়গা করে নেওয়া দলটি এখন মুখোমুখি হবে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার।

 

বিশ্বকাপের শুরুতে খুব কম মানুষই কল্পনা করেছিল যে লিওনেল মেসিদের প্রতিপক্ষ হিসেবে শেষ ৩২-এ উঠে আসবে কেপ ভার্দে। কিন্তু তিন ম্যাচে অপরাজিত থেকে সেই অসম্ভবকেই সম্ভব করেছে আফ্রিকার এই দল। ম্যাচের শুরু থেকেই সৌদি আরব জানত যে জয় ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো পথ খোলা নেই। ফলে আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলার চেষ্টা করেছিল তারা। অন্যদিকে কেপ ভার্দে জানত, একটি পয়েন্টও তাদের জন্য মূল্যবান হতে পারে।

 

সৌদি কোচ জর্জিওস ডোনিস ম্যাচের আগেই বলেছিলেন, তার দল এখনও পুরোপুরি প্রস্তুত নয় এবং মাত্র এক মাসের মধ্যে নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সহজ নয়। একই সঙ্গে তিনি কেপ ভার্দেকে টুর্নামেন্টের অন্যতম বিস্ময়কর দল হিসেবেও উল্লেখ করেছিলেন।

 

প্রথমার্ধে দুই দলই সতর্ক ফুটবল খেলেছে। বলের দখল কিছুটা বেশি ছিল সৌদি আরবের, কিন্তু গোলের সুযোগ তুলনামূলক বেশি তৈরি করেছিল কেপ ভার্দে। ডাইলন লিভরামেন্টো, রায়ান মেন্দেস এবং দেরয় দুয়ার্তেরা কয়েকবার সৌদি রক্ষণকে সমস্যায় ফেলেন। বিশেষ করে লারোস দুয়ার্তের একটি সুযোগ কেপ ভার্দেকে এগিয়ে দিতে পারত। কিন্তু শেষ মুহূর্তে ফিনিশিংয়ের অভাবে গোল পাওয়া হয়নি।

 

সৌদি আরবও কিছু সুযোগ তৈরি করেছিল। সালেম আল দাওসারি এবং ফিরাস আল ব্রিকান আক্রমণে চেষ্টা চালান। কিন্তু কেপ ভার্দের রক্ষণ এবং অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ভোজিনিয়া বারবার প্রতিপক্ষকে হতাশ করেন।

 

৪০ বছর বয়সী ভোজিনিয়া ইতোমধ্যেই এই বিশ্বকাপের অন্যতম আলোচিত ফুটবলার। স্পেনের বিপক্ষে একাধিক অসাধারণ সেভ করার পর থেকেই তিনি বিশ্ব ফুটবলে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছেন। বিশ্বকাপের পারফরম্যান্সের কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছেন এই গোলরক্ষক।

 

দ্বিতীয়ার্ধে সৌদি আরব আক্রমণের গতি বাড়ায়। কারণ তখন অন্য ম্যাচে স্পেন উরুগুয়ের বিপক্ষে এগিয়ে গেছে বলে খবর আসে। সেই ফলাফল সৌদিদের জন্য আরও বেশি চাপ তৈরি করে। একটি গোল পেলে সৌদি আরব পরিস্থিতি বদলে দিতে পারত। কিন্তু আক্রমণে প্রয়োজনীয় ধার দেখাতে পারেনি দলটি। পুরো টুর্নামেন্টে গোল করার ক্ষেত্রেও তারা ভুগেছে। গ্রুপ পর্বে মাত্র একটি গোল করতে সক্ষম হয় মধ্যপ্রাচ্যের দলটি।

 

অন্যদিকে কেপ ভার্দে নিজেদের পরিকল্পনা থেকে একটুও সরে যায়নি। স্পেন এবং উরুগুয়ের বিপক্ষেও তারা যেভাবে নিচু ব্লকে রক্ষণ সামলেছিল, সৌদি আরবের বিরুদ্ধেও একই কৌশল দেখা যায়। ডিফেন্ডার পিকো লোপেস ম্যাচের আগে বলেছিলেন, স্পেন ও উরুগুয়েকে যেভাবে সম্মান দেখানো হয়েছে, সৌদি আরবকেও একইভাবে দেখা হবে। তার কথার প্রতিফলনই দেখা যায় মাঠে।

 

শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই কেপ ভার্দের খেলোয়াড়রা মাঠেই উদযাপন শুরু করেন। অনেকেই মোবাইল ফোনে স্পেন-উরুগুয়ে ম্যাচের ফল দেখছিলেন। স্পেন ১-০ গোলে জিতে যাওয়ার খবর নিশ্চিত হওয়ার পরই শুরু হয় প্রকৃত উৎসব। স্পেন সাত পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়। কেপ ভার্দে তিনটি ড্র থেকে তিন পয়েন্ট সংগ্রহ করে রানার্সআপ হিসেবে শেষ ৩২-এ জায়গা করে নেয়। উরুগুয়ে এবং সৌদি আরব দুই পয়েন্ট নিয়ে বিদায় নেয়।

 

বিশ্বকাপের ইতিহাসে জনসংখ্যার বিচারে সবচেয়ে ছোট দেশগুলোর একটি হিসেবে নকআউট পর্বে ওঠার কৃতিত্বও এখন কেপ ভার্দের। তাদের জনসংখ্যা প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ, যা অনেক বড় শহরের জনসংখ্যার চেয়েও কম। এই দলটির যাত্রা অবশ্য শুধু ভাগ্যের গল্প নয়। বহু বছর ধরে ইউরোপে ছড়িয়ে থাকা কেপ ভার্দিয়ান ফুটবলারদের নিয়ে শক্তিশালী একটি প্রজন্ম তৈরি হয়েছে। সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই তারা বিশ্বকাপে জায়গা করে নেয়।

 

স্পেনের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র, উরুগুয়ের বিপক্ষে ২-২ ড্র এবং সৌদি আরবের বিপক্ষে ০-০ ফল-এই তিন ম্যাচে তারা মাত্র দুই গোল হজম করেছে। রক্ষণভাগের এই শৃঙ্খলাই তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে উঠেছে।

 

অন্যদিকে সৌদি আরবের জন্য এটি আরেকটি হতাশার বিশ্বকাপ হয়ে থাকল। ১৯৯৪ সালের পর দ্বিতীয়বার নকআউটে ওঠার স্বপ্ন নিয়েই তারা যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিল। কিন্তু স্পেনের কাছে বড় ব্যবধানে হার এবং কেপ ভার্দের বিপক্ষে জয় না পাওয়ায় গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হলো তাদের।

 

এখন কেপ ভার্দের সামনে অপেক্ষা করছে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। আগামী ৪ জুলাই মায়ামিতে তারা মুখোমুখি হবে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনার। কাগজে-কলমে এটি অসম লড়াই। একদিকে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন, অন্যদিকে বিশ্বকাপে অভিষেক হওয়া একটি ছোট দ্বীপরাষ্ট্র।

 

কিন্তু এই বিশ্বকাপে কেপ ভার্দে ইতোমধ্যেই দেখিয়ে দিয়েছে, ফুটবল শুধু পরিসংখ্যান কিংবা ইতিহাসের খেলা নয়। স্পেন ও উরুগুয়ের মতো দলকে থামানো যে দল পারে, তারা আর্জেন্টিনার বিপক্ষেও লড়াই করার সাহস রাখে। হয়তো মেসিরা ফেভারিট। কিন্তু বিশ্বকাপের সবচেয়ে সুন্দর গল্পগুলোর একটি লিখে ফেলা কেপ ভার্দে এখন বিশ্বাস করতে শিখেছে-অসম্ভবও সম্ভব হতে পারে।


সম্পর্কিত নিউজ