{{ news.section.title }}
অতিরিক্ত সময়ের গোলে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো চ্যাম্পিয়ন স্পেন
ফুটবল বিশ্ব অপেক্ষায় ছিল দুই পরাশক্তির মহারণ দেখার। একদিকে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা, অন্যদিকে ইউরোপের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন স্পেন। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনালকে ঘিরে প্রত্যাশার পারদ ছিল তুঙ্গে। তবে আক্রমণাত্মক, রোমাঞ্চকর ফুটবলের বদলে দর্শকরা দেখেছেন শারীরিক লড়াই, অসংখ্য ফাউল, কৌশলগত দ্বৈরথ এবং শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময়ে নির্ধারিত হওয়া এক উত্তেজনাপূর্ণ শিরোপা লড়াই।
ম্যাচের ১০৬তম মিনিটে ফেরান তোরেসের একমাত্র গোলে আর্জেন্টিনাকে ১–০ ব্যবধানে হারিয়ে ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পেল স্পেন। ২০১০ সালের পর আবারও ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ট্রফি নিজেদের করে নিল লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল। পাশাপাশি একই সময়ে পুরুষ ও নারী-উভয় বিভাগেই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়া প্রথম দেশ হিসেবেও নতুন ইতিহাস গড়েছে স্পেন।
ম্যাচ শুরুর অনেক আগেই নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়াম উৎসবের নগরীতে পরিণত হয়। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা হাজার হাজার সমর্থকে গ্যালারি কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। ম্যাচ দেখতে উপস্থিত ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার আগমনের কারণে স্টেডিয়াম ও আশপাশের এলাকায় নেওয়া হয় নজিরবিহীন নিরাপত্তাব্যবস্থা। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান এবং বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আয়োজিত হাফটাইম শোতে পারফর্ম করেন আন্তর্জাতিক সংগীত তারকা শাকিরা, ম্যাডোনা ও জাস্টিন বিবার। ২৭ মিনিটব্যাপী এই আয়োজন বিশ্বকাপ ফাইনালে নতুন মাত্রা যোগ করলেও দীর্ঘ বিরতির কারণে ম্যাচের ছন্দেও কিছুটা প্রভাব পড়ে বলে মত বিশ্লেষকদের।
খেলা শুরু হতেই বোঝা যায়, কোনো দলই শুরুতে ঝুঁকি নিতে রাজি নয়। স্পেন বলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কাছে রেখে ধীরে ধীরে আক্রমণ গড়ে তুলতে থাকে, অন্যদিকে আর্জেন্টিনা অপেক্ষা করতে থাকে দ্রুত পাল্টা আক্রমণের সুযোগের জন্য। প্রথম ১৫ মিনিটেই বল দখলে স্পষ্ট আধিপত্য ছিল স্পেনের। লামিনে ইয়ামাল ডান প্রান্ত দিয়ে একাধিকবার আক্রমণে উঠলেও আর্জেন্টিনার অভিজ্ঞ রক্ষণভাগ তাকে বড় সুযোগ তৈরি করতে দেয়নি।
২০ মিনিটের পর ম্যাচের গতি কিছুটা বাড়তে শুরু করে। দানি ওলমোর নিখুঁত পাস থেকে মিকেল ওয়ারিয়াসাবাল বক্সের ভেতরে ঢুকে শট নিলেও দুর্দান্ত দক্ষতায় তা রুখে দেন আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। কয়েক মিনিট পর আবারও ইয়ামালের নিচু শট ঝাঁপিয়ে পড়ে ফিরিয়ে দেন মার্টিনেজ। প্রথমার্ধে স্পেনের সবচেয়ে বড় ভরসাই ছিল ধারাবাহিক আক্রমণ, আর আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে ওঠেন তাদের বিশ্বস্ত গোলরক্ষক।
অন্যদিকে আর্জেন্টিনার আক্রমণে ছিলেন লিওনেল মেসি, হুলিয়ান আলভারেজ ও অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার। তবে স্পেনের মাঝমাঠ ও রক্ষণভাগ এতটাই সংগঠিত ছিল যে মেসিকে প্রায় পুরো সময়ই বিপজ্জনক এলাকা থেকে দূরে রাখা হয়। ম্যাচের প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনা উল্লেখযোগ্য কোনো পরিষ্কার গোলের সুযোগই তৈরি করতে পারেনি। মেসির নেওয়া একমাত্র শটটিও লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।
ম্যাচ যত এগোতে থাকে, ফুটবলের সৌন্দর্যের চেয়ে শারীরিক লড়াইই বেশি চোখে পড়তে থাকে। স্পেনের খেলোয়াড়রা একাধিকবার রেফারি স্লাভকো ভিনচিচের কাছে অভিযোগ করেন যে আর্জেন্টিনার কঠোর ট্যাকলগুলো যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে না। বিশেষ করে দানি ওলমোর ওপর অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের দেরিতে করা ট্যাকল নিয়ে স্প্যানিশ ফুটবলারদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়।
প্রথম হলুদ কার্ড দেখানো হয় ৪০তম মিনিটে। স্পেনের আক্রমণ ঠেকাতে মিকেল ওয়ারিয়াসাবালকে ফাউল করেন লিসান্দ্রো মার্টিনেজ। সেই ট্যাকলের জন্য সতর্ক হন এই আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডার। তবে কিছুক্ষণ পরই চোটের কারণে তাকে মাঠ ছাড়তে হয়, যা আর্জেন্টিনার রক্ষণে বড় ধাক্কা হয়ে আসে।
প্রথমার্ধের শেষদিকে স্পেন আরও কয়েকটি আক্রমণ চালালেও প্রতিবারই বাধা হয়ে দাঁড়ান এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। তার অসাধারণ প্রতিক্রিয়া ও পজিশনিংয়ের কারণে গোলশূন্যভাবেই বিরতিতে যায় দুই দল। প্রথম ৪৫ মিনিটে বলের দখল, পাসের নির্ভুলতা এবং আক্রমণের সংখ্যায় স্পেন স্পষ্টভাবে এগিয়ে থাকলেও গোলের দেখা পায়নি।
দ্বিতীয়ার্ধেও একই চিত্র দেখা যায়। লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে আক্রমণ চালাতে থাকে, আর আর্জেন্টিনা নিজেদের অর্ধে খেলোয়াড় বাড়িয়ে রক্ষণ সামলানোর চেষ্টা করে। স্পেনের একের পর এক আক্রমণ প্রতিহত করতে গিয়ে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের ফাউলের সংখ্যা বাড়তে থাকে। ম্যাচের উত্তেজনাও ধীরে ধীরে তীব্র হতে থাকে।
শেষ ২০ মিনিটে স্পেন গোলের সবচেয়ে কাছাকাছি পৌঁছে যায়। লামিনে ইয়ামালের দুর্দান্ত ফ্রি-কিক কর্নারের দিকে ছুটে যাচ্ছিল, কিন্তু আবারও অসাধারণ সেভ করে দলকে বাঁচান এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। নির্ধারিত সময়ের একেবারে শেষ মুহূর্তে এই সেভই ম্যাচকে অতিরিক্ত সময়ে নিয়ে যাওয়ার অন্যতম বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
অন্যদিকে আর্জেন্টিনার পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে যোগ করা সময়ে। ইতোমধ্যেই একটি হলুদ কার্ড দেখা এনজো ফার্নান্দেজ স্পেনের তরুণ ডিফেন্ডার পাও কুবার্সির ওপর বিপজ্জনক ট্যাকল করলে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন। ফলে অতিরিক্ত সময়ের পুরোটা দশজন নিয়ে খেলতে হয় বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের। সংখ্যাগত এই সুবিধাই পরবর্তীতে স্পেনের জন্য ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
নির্ধারিত ৯০ মিনিট গোলশূন্যভাবে শেষ হওয়ার পর ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। তখন পর্যন্ত বলের দখল, আক্রমণ এবং সুযোগ তৈরিতে স্পেন এগিয়ে থাকলেও এমিলিয়ানো মার্টিনেজের দুর্দান্ত গোলকিপিংয়ের কারণে গোলের দেখা পায়নি তারা। অন্যদিকে দশজনের আর্জেন্টিনা পুরোপুরি রক্ষণ সামলে ম্যাচকে টাইব্রেকারে নেওয়ার লক্ষ্যেই খেলছিল।
অতিরিক্ত সময় শুরু হওয়ার পর স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের অন্যতম বড় সিদ্ধান্ত ছিল নিকো উইলিয়ামসকে আরও স্বাধীনভাবে খেলতে দেওয়া। তার গতিই দ্রুত আর্জেন্টিনার রক্ষণে সমস্যা তৈরি করতে শুরু করে। বাম প্রান্ত দিয়ে একের পর এক আক্রমণে স্পেন নতুন গতি ফিরে পায়।
১০৩তম মিনিটে আবারও নায়ক হয়ে ওঠেন এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। নিকো উইলিয়ামসের জোরালো হেড অসাধারণ দক্ষতায় ফিরিয়ে দেন তিনি। কয়েক মুহূর্তের জন্য মনে হচ্ছিল, বিশ্বকাপ ফাইনালের আরেকটি টাইব্রেকারের অপেক্ষায় ফুটবল বিশ্ব।
কিন্তু সেই প্রতিরোধ বেশিক্ষণ টিকিয়ে রাখতে পারেনি আর্জেন্টিনা।
ম্যাচের ১০৬তম মিনিটে আসে ফাইনালের একমাত্র গোল। বাম দিক থেকে নিকো উইলিয়ামস উঁচু করে বল বাড়ান বক্সের মধ্যে। আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডারদের মাথার ওপর দিয়ে আসা সেই বল নিয়ন্ত্রণে এনে কাছ থেকে শক্তিশালী শটে জালে পাঠিয়ে দেন ফেরান তোরেস। এমিলিয়ানো মার্টিনেজ এবার আর কিছুই করতে পারেননি। সঙ্গে সঙ্গেই স্পেনের খেলোয়াড় ও সমর্থকদের উল্লাসে ফেটে পড়ে মেটলাইফ স্টেডিয়াম।
গোল হজম করার পর আর হারানোর কিছু ছিল না আর্জেন্টিনার। দশজন নিয়েই শেষ কয়েক মিনিটে সর্বশক্তি দিয়ে আক্রমণে ওঠে তারা। তবে স্পেন বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে সময় নষ্ট না করে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ম্যাচ শেষ করার চেষ্টা করে। আর্জেন্টিনা কয়েকটি লং বল খেললেও সেগুলো সহজেই সামাল দেয় স্পেনের রক্ষণভাগ।
এর আগে অতিরিক্ত সময়েই আরেকটি সুযোগ নষ্ট করে স্পেন। নিকো উইলিয়ামস বল জালে পাঠালেও ভিডিও সহকারী রেফারির (ভিএআর) পর্যালোচনার পর গোলটি বাতিল করা হয়। রিপ্লেতে দেখা যায়, আক্রমণ গড়ে ওঠার সময় বদলি খেলোয়াড় মিকেল মেরিনো আর্জেন্টিনার অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার নিকোলাস ওতামেন্দিকে ফাউল করেছিলেন। ফলে গোলটি গণ্য হয়নি।
ফাইনালের সবচেয়ে আলোচিত খেলোয়াড়দের একজন ছিলেন এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। একের পর এক দুর্দান্ত সেভ করে তিনি শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনাকে ম্যাচে টিকিয়ে রেখেছিলেন। লামিনে ইয়ামালের শক্তিশালী ফ্রি-কিক, মিকেল ওয়ারিয়াসাবালের শট, নিকো উইলিয়ামসের হেডসহ স্পেনের একাধিক নিশ্চিত গোলের সুযোগ নষ্ট করেন তিনি। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পুরো ম্যাচে মার্টিনেজ ডজনখানেক গুরুত্বপূর্ণ সেভ করেন, যা ফাইনালটিকে অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত নিয়ে যেতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে।
অন্যদিকে লিওনেল মেসির জন্য ম্যাচটি ছিল হতাশার। ৩৯ বছর বয়সী এই তারকা পুরো টুর্নামেন্টে আট গোল করে দলকে ফাইনালে তুললেও শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে স্পেনের সুশৃঙ্খল রক্ষণ তাকে কার্যত নিষ্ক্রিয় করে রাখে। পুরো ম্যাচে লক্ষ্যভেদী কোনো শট নিতে পারেননি তিনি। মাঝমাঠ থেকে বল নিয়ে আক্রমণ সাজানোর চেষ্টা করলেও প্রতিবারই স্পেনের মিডফিল্ড ও ডিফেন্স তার পথ আটকে দেয়।
ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজতেই মাঠে দেখা যায় উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি। পরাজয়ের হতাশা এবং পুরো ম্যাচজুড়ে চলা শারীরিক লড়াইয়ের রেশ গিয়ে পড়ে খেলোয়াড়দের আচরণে। শেষ বাঁশির কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আর্জেন্টিনার বদলি মিডফিল্ডার লিয়ান্দ্রো পারেদেস ও স্পেনের ডিফেন্ডার এরিক গার্সিয়ার মধ্যে তর্ক শুরু হয়। একপর্যায়ে পারেদেস গার্সিয়ার গলায় হাত দিলে তিনি মাটিতে পড়ে যান। এরপর দুই দলের খেলোয়াড়, বদলি বেঞ্চ এবং কোচিং স্টাফ মাঠে নেমে এলে পরিস্থিতি কিছু সময়ের জন্য উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
রেফারি ও কর্মকর্তারা দ্রুত হস্তক্ষেপ করে দুই দলকে আলাদা করেন। ম্যাচ চলাকালে শক্ত ট্যাকলের জন্য হলুদ কার্ড দেখা পারেদেসকে শেষ বাঁশির পর সংঘর্ষে জড়ানোর ঘটনায় আবারও সতর্ক করা হয়।
তবে উত্তেজনার এই দৃশ্য বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। কিছুক্ষণ পর দুই দলের বেশিরভাগ খেলোয়াড়ই একে অপরের সঙ্গে করমর্দন করেন। স্পেনের একাধিক ফুটবলার লিওনেল মেসির কাছে গিয়ে তাকে অভিনন্দন ও সম্মান জানান। মাঝমাঠে দীর্ঘ সময় আলিঙ্গন করতে দেখা যায় আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি এবং স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তেকে।
ম্যাচ শেষে স্কালোনি বলেন, "জয়ে যেমন উদার হতে হয়, পরাজয়েও তেমন হতে হয়। আমরা হার মেনে নিচ্ছি। আমাদের খেলোয়াড়রা শেষ পর্যন্ত নিজেদের সবটুকু দিয়েছে। এটাই আমাদের দেশবাসীর জন্য বড় উদাহরণ। ফুটবলে হার আছে, কিন্তু আবার উঠে দাঁড়াতে হয়।"
অন্যদিকে স্পেনের ড্রেসিংরুমে তখন উৎসবের আবহ। ২০১০ সালের পর দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জিতে স্পেন নিজেদের 'সোনালি প্রজন্ম'-এর নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। ইউরো ২০২৪ জয়ের পর বিশ্বকাপ জয়-দুই বছরের ব্যবধানে আন্তর্জাতিক ফুটবলের সবচেয়ে বড় দুটি শিরোপা ঘরে তুলল লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল।
এই জয়ের মাধ্যমে স্পেন আরও একটি বিরল কীর্তি গড়েছে। ইতিহাসে প্রথম দেশ হিসেবে একই সময়ে পুরুষ ও নারী-দুই বিভাগের বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন এখন তারা। অন্যদিকে আর্জেন্টিনার টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন ভেঙে গেলেও পুরো টুর্নামেন্টে তাদের লড়াকু মানসিকতা এবং কঠিন পথ পেরিয়ে ফাইনালে ওঠার যাত্রা ফুটবল ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
বিশ্বকাপ ফাইনালের স্কোরলাইন ছিল মাত্র ১–০। তবে পরিসংখ্যান বলছে, ম্যাচটি বাস্তবে ছিল একপেশে আধিপত্যের লড়াই। বলের দখল, আক্রমণ, গোলের সুযোগ তৈরি, পাসের নির্ভুলতা-প্রায় সব ক্ষেত্রেই এগিয়ে ছিল স্পেন। অন্যদিকে শিরোপাধারী আর্জেন্টিনা পুরো ম্যাচজুড়ে নিজেদের স্বাভাবিক আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে পারেনি। লিওনেল স্কালোনির দল বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছে রক্ষণ সামলাতে এবং প্রতিপক্ষের ছন্দ নষ্ট করার চেষ্টায়।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, স্পেনের মিডফিল্ড ত্রয়ী শুরু থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নেয়। দানি ওলমো, রদ্রি এবং পেদ্রি বলের গতি নিয়ন্ত্রণ করে আর্জেন্টিনার মাঝমাঠকে কার্যত অকার্যকর করে দেন। ফলে লিওনেল মেসি অনেক সময় নিজের অর্ধে নেমে বল সংগ্রহ করতে বাধ্য হন। কিন্তু সেখান থেকে আক্রমণ গড়ে তোলার মতো পর্যাপ্ত সমর্থন পাননি তিনি।
বিশেষ করে লামিনে ইয়ামালকে ঘিরে স্পেনের আক্রমণ পরিকল্পনা ছিল অত্যন্ত কার্যকর। ডান প্রান্তে তার গতি ও ড্রিবলিং বারবার আর্জেন্টিনার রক্ষণকে চাপে ফেলে। যদিও গোল পাননি, তবুও একাধিক সুযোগ তৈরি করেন এই তরুণ তারকা। অন্যদিকে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন বদলি হিসেবে নামা নিকো উইলিয়ামস। তার গতিময় দৌড়, আক্রমণে সরাসরি অংশগ্রহণ এবং ১০৬তম মিনিটে ফেরান তোরেসের জয়সূচক গোলের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান ম্যাচের অন্যতম টার্নিং পয়েন্ট হয়ে ওঠে।
লুইস দে লা ফুয়েন্তের কৌশলগত সিদ্ধান্তগুলোও প্রশংসা কুড়িয়েছে। নির্ধারিত সময়ে গোল না এলেও তিনি দলকে আক্রমণাত্মক পরিকল্পনা থেকে সরিয়ে নেননি। অতিরিক্ত সময়ে ক্লান্ত আর্জেন্টিনার বিপক্ষে দ্রুতগতির উইঙ্গার নামিয়ে চাপ বাড়ানোর সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত সাফল্য এনে দেয়। ইউরো ২০২৪ জয়ের পর বিশ্বকাপ জিতিয়ে তিনি স্পেনের অন্যতম সফল জাতীয় দলের কোচ হিসেবে নিজের অবস্থান আরও শক্ত করেন।
অন্যদিকে আর্জেন্টিনার কৌশল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেক বিশ্লেষক। পুরো টুর্নামেন্টে আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলে সাফল্য পাওয়া দলটি ফাইনালে অতিরিক্ত রক্ষণাত্মক হয়ে পড়ে। স্পেনের পাসিং ফুটবল ভাঙতে গিয়ে বারবার ফাউলের আশ্রয় নেয় তারা। ম্যাচে এনজো ফার্নান্দেজের লাল কার্ড সেই হতাশারই প্রতিফলন বলে মনে করছেন অনেকে। যোগ করা সময়ে পাও কুবার্সির ওপর বিপজ্জনক ট্যাকলের জন্য দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন তিনি, যার ফলে অতিরিক্ত সময়ে দশজন নিয়ে খেলতে হয় আর্জেন্টিনাকে। সংখ্যাগত এই ঘাটতি স্পেনের আক্রমণকে আরও সহজ করে দেয়।
ফাইনালের আরেকটি বড় আলোচনার বিষয় ছিলেন এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। যদিও শেষ পর্যন্ত পরাজিত দলের গোলরক্ষক, তবু তার পারফরম্যান্স ছাড়া ম্যাচটি হয়তো অনেক আগেই শেষ হয়ে যেত। লামিনে ইয়ামালের ফ্রি-কিক, মিকেল ওয়ারিয়াসাবালের শট, নিকো উইলিয়ামসের হেড এবং আরও একাধিক নিশ্চিত গোলের সুযোগ রুখে দিয়ে তিনি আর্জেন্টিনাকে দীর্ঘ সময় ম্যাচে টিকিয়ে রাখেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো তাকে ফাইনালের অন্যতম সেরা পারফর্মার হিসেবে উল্লেখ করেছে।
এই ম্যাচটি লিওনেল মেসির জন্যও বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ৩৯ বছর বয়সী এই কিংবদন্তি পুরো টুর্নামেন্টে আট গোল করে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুলেছিলেন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালে দুটি গোল তৈরিতে ভূমিকা রেখে আবারও নিজের গুরুত্ব প্রমাণ করেছিলেন তিনি। কিন্তু ফাইনালে স্পেনের সংগঠিত রক্ষণ তাকে কার্যত নিষ্ক্রিয় করে রাখে। পুরো ম্যাচে তিনি মাত্র একটি শট নেন, সেটিও লক্ষ্যে রাখতে পারেননি। অনেকের ধারণা, এটিই ছিল বিশ্বকাপে মেসির শেষ ম্যাচ। যদিও তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে অবসরের ঘোষণা দেননি, তবুও ফাইনাল শেষে তার আবেগঘন মুখভঙ্গি ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।
তবে ম্যাচ শেষের পর ফুটবলের সৌন্দর্যও দেখা গেছে। শেষ বাঁশির পর লিয়ান্দ্রো পারেদেস ও এরিক গার্সিয়ার মধ্যে সংঘর্ষে কিছু সময়ের জন্য উত্তেজনা ছড়ালেও পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসে। এরপর স্পেনের একাধিক খেলোয়াড় এগিয়ে গিয়ে মেসিকে সম্মান জানান। দুই দলের ফুটবলারদের করমর্দন এবং মাঝমাঠে লিওনেল স্কালোনি ও লুইস দে লা ফুয়েন্তের দীর্ঘ আলিঙ্গন দেখিয়ে দেয়, তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধই ফুটবলের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য।
বিশ্বকাপের এই ফাইনালটি গোলবন্যার জন্য নয়, বরং কৌশল, ধৈর্য, শারীরিক লড়াই এবং মানসিক দৃঢ়তার জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবে। অনেক দর্শক হয়তো আরও আক্রমণাত্মক ও রোমাঞ্চকর ম্যাচের প্রত্যাশা করেছিলেন। কিন্তু ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, নকআউট পর্বের সর্বোচ্চ চাপের ম্যাচে এমন কৌশলগত লড়াই অস্বাভাবিক নয়।
স্পেন এই টুর্নামেন্ট শুরু করেছিল কেপ ভার্দের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র দিয়ে। সেখান থেকে ধীরে ধীরে নিজেদের ছন্দ ফিরে পেয়ে তারা নকআউট পর্বে আরও পরিণত ফুটবল খেলেছে। সেমিফাইনালে শক্তিশালী ফ্রান্সকে হারানোর পর ফাইনালেও বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে পরাস্ত করে তারা প্রমাণ করেছে, এই আসরের সবচেয়ে ধারাবাহিক দল তারাই ছিল। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা মিশর, ইংল্যান্ডসহ একাধিক কঠিন প্রতিপক্ষকে হারিয়ে ফাইনালে উঠলেও শেষ পর্যন্ত স্পেনের নিয়ন্ত্রিত ও পরিকল্পিত ফুটবলের সামনে নিজেদের সেরাটা দেখাতে পারেনি।
২০১০ সালের পর দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জিতে স্পেন শুধু নতুন একটি ট্রফিই জেতেনি; তারা আধুনিক ফুটবলে নিজেদের আধিপত্যের নতুন অধ্যায়ও শুরু করেছে। ইউরো ২০২৪ এবং বিশ্বকাপ ২০২৬-টানা দুটি বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা জয়ের মাধ্যমে লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল এখন বিশ্ব ফুটবলের নতুন মানদণ্ড হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। আর আর্জেন্টিনার জন্য এই হার কষ্টের হলেও, লিওনেল মেসির নেতৃত্বে গত কয়েক বছরে বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা এবং আরও একবার বিশ্বকাপ ফাইনালে ওঠার যাত্রা ফুটবল ইতিহাসে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।