ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তির ঘোষণা আজই আসতে পারে: রুবিও

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তির ঘোষণা আজই আসতে পারে: রুবিও
ছবির ক্যাপশান, ছবি : সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধ অবসানে ‘হয়তো আজই’ একটি বড় চুক্তি হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, ওয়াশিংটন কোনো দুর্বল বা ‘খারাপ’ চুক্তি করবে না। ভালো ও কার্যকর সমঝোতা না হলে যুক্তরাষ্ট্র বিকল্প পথে ইরান ইস্যু মোকাবিলা করবে।

সোমবার (২৫ মে) ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে রুবিও বলেন, আলোচনার টেবিলে একটি “বেশ শক্তিশালী” প্রস্তাব রয়েছে। এই প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য হলো কৌশলগত হরমুজ প্রণালি জাহাজ চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বাস্তব, গুরুত্বপূর্ণ ও সময়সীমাবদ্ধ আলোচনা শুরু করা। ভারতের আগ্রায় ঐতিহাসিক তাজমহল পরিদর্শনে যাওয়ার আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন বলে জানিয়েছে এবিসি নিউজ ও আনাদোলু এজেন্সি।

 

রুবিও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কূটনীতিকে সফল হওয়ার সব সুযোগ দেবে। তবে কূটনীতি ব্যর্থ হলে ওয়াশিংটন “অন্যভাবে” বিষয়টি মোকাবিলা করবে। রয়টার্স জানিয়েছে, তার ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র হয় ইরানের সঙ্গে একটি ভালো চুক্তিতে পৌঁছাবে, নয়তো অন্য পথ বেছে নেবে। তিনি আরও বলেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কোনো তাড়াহুড়ো করছেন না এবং জাতীয় স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে কোনো সমঝোতা মেনে নেবেন না।

 

চুক্তির কেন্দ্রে হরমুজ প্রণালি

সম্ভাব্য চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো হরমুজ প্রণালি। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বে সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করত। যুদ্ধের পর থেকে প্রণালিটি কার্যত সীমিত বা অচল হয়ে পড়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মতে, ইরান নীতিগতভাবে হরমুজ খুলে দিতে রাজি হয়েছে-তবে এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানি জাহাজ ও বন্দর ঘিরে নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করতে হবে।

 

রুবিওর ভাষায়, আলোচনায় এমন একটি প্রস্তাব রয়েছে, যার মাধ্যমে প্রণালিটি খুলে দেওয়া, জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা এবং একই সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক ইস্যুতে সময়সীমাবদ্ধ আলোচনা শুরু করা সম্ভব হতে পারে। তবে তিনি এটিও স্পষ্ট করেন, চুক্তি হওয়ার আগে কোনো বিষয় নিশ্চিত ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।

 

৬০ দিনের সময়সীমা পেতে পারে চূড়ান্ত আলোচনা

ট্রাম্প প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রাথমিক কাঠামোতে সমঝোতা হলে চূড়ান্ত চুক্তির জন্য আলোচকদের ৬০ দিন সময় দেওয়া হতে পারে। এই সময়ের মধ্যে যুদ্ধবিরতি শক্তিশালী করা, হরমুজ প্রণালির চলাচল স্বাভাবিক করা, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কারিগরি আলোচনা এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিলের কাঠামো নির্ধারণ করা হতে পারে। রয়টার্স জানিয়েছে, সম্ভাব্য কাঠামো অনুযায়ী ৬০ দিনের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা হবে।

 

তবে চুক্তির পথ এখনো সহজ নয়। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাগাই বলেছেন, আলোচনায় কিছু বিষয়ে অগ্রগতি হলেও যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি ‘আসন্ন’-এমন বলা যাচ্ছে না। তিনি আরও বলেছেন, বর্তমান আলোচনায় যুদ্ধ বন্ধের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে, তবে পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে ইরান এখনই আলোচনা করছে না।

 

যেসব বিষয়ে মতপার্থক্য রয়ে গেছে

দুই পক্ষের আলোচনায় বড় কয়েকটি বিষয় এখনো জটিল অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে আছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত, ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, বিদেশি ব্যাংকে আটকে থাকা তেল আয়ের অর্থ ছাড় এবং লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহকে ঘিরে ইসরায়েলের যুদ্ধ।

 

মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, ইরান নীতিগতভাবে তার উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিয়ে সমাধানে যেতে রাজি হয়েছে। তবে ইরানি সূত্রগুলো বলছে, এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সম্মতি হয়নি। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভবিষ্যৎ আলোচনায় আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার তত্ত্বাবধানে ইউরেনিয়াম কমমাত্রায় রূপান্তর করার মতো বাস্তবসম্মত পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা হতে পারে।

 

আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানপন্থী সংবাদমাধ্যম তাসনিম দাবি করেছে, চুক্তির কয়েকটি ধারা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখনো বাধা সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে বিদেশে আটকে থাকা ইরানের অর্থ ছাড়ের বিষয়টি বড় বাধা হয়ে আছে। তাসনিমের দাবি অনুযায়ী, এসব বিষয়ে নিশ্চয়তা না পেলে সম্ভাব্য সমঝোতা বাতিলও হয়ে যেতে পারে।

 

তেলের বাজারে বড় প্রতিক্রিয়া

চুক্তির সম্ভাবনার খবর ছড়াতেই বিশ্ববাজারে তেলের দাম এক ধাক্কায় কমে গেছে। রয়টার্স জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার আশাবাদে সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রায় ৫ শতাংশ কমে দুই সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। বিনিয়োগকারীদের ধারণা, হরমুজ প্রণালি খুলে গেলে আটকে থাকা তেলের একটি অংশ আবার বাজারে ফিরতে পারে। তবে বিশ্লেষকেরা সতর্ক করছেন, চুক্তি হলেও জ্বালানি বাজার দ্রুত স্বাভাবিক হবে না। কারণ হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া, জাহাজ চলাচল নিরাপদ করা, বীমা ঝুঁকি কমানো, উৎপাদন ও রিফাইনারি কার্যক্রম স্বাভাবিক করা-সবকিছুতেই সময় লাগবে।

 

ট্রাম্পের অবস্থান: তাড়াহুড়ো নয়

এর আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, ওয়াশিংটন ও তেহরান একটি শান্তি চুক্তির সমঝোতা স্মারকের বেশিরভাগ বিষয় নিয়ে আলোচনা শেষ করেছে। তবে রোববার তিনি আবার সতর্ক সুরে বলেন, চুক্তি সম্পন্ন, অনুমোদিত ও স্বাক্ষরিত না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালিতে ইরানি জাহাজের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ বহাল থাকবে। তিনি বলেন, দুই পক্ষকেই সময় নিতে হবে এবং বিষয়টি সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে হবে।

ট্রাম্পের এই অবস্থান দেখাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র একদিকে যুদ্ধ শেষ করতে আগ্রহী, অন্যদিকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে শক্ত শর্ত ছাড়তে চাইছে না।

 

তথ্যসূত্র: রয়টার্স


সম্পর্কিত নিউজ