{{ news.section.title }}
হরমুজ প্রণালি খুলতে বড় কিছু ছাড় দিতে হচ্ছে ট্রাম্পকে
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধ অবসানে সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন করে আশার আভাস মিললেও চুক্তি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্ভাব্য চুক্তিকে “ভালো” ও “যথাযথ” সমঝোতা হিসেবে তুলে ধরলেও তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন, বিষয়টি এখনো পুরোপুরি চূড়ান্ত নয়। অন্যদিকে ইরান বলছে, আলোচনায় অগ্রগতি থাকলেও চুক্তি আসন্ন-এমন দাবি করার সময় এখনো আসেনি।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য সমঝোতার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া, যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পরবর্তী ধাপে বিস্তারিত আলোচনা। দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাগাই বলেছেন, আলোচনায় কিছু অগ্রগতি হয়েছে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানে বিভ্রান্তি ও ইসরাইলের ভূমিকার কারণে পূর্ণাঙ্গ চুক্তি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে আছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, হরমুজ প্রণালি “যেভাবেই হোক” খোলা রাখতে হবে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৬ মে ভারতের জয়পুর থেকে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে রুবিও বলেন, নতুন চুক্তির শর্ত নিয়ে আলোচনা চলছে এবং চুক্তিতে পৌঁছাতে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনের বরাতে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানায়, প্রস্তাবিত কাঠামোতে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর কথা রয়েছে। এই সময়ে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে, জাহাজ চলাচলে কোনো টোল থাকবে না এবং ইরান প্রণালিতে স্থাপিত মাইন অপসারণ করবে। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত অবরোধ তুলে নিতে পারে এবং ইরানকে সীমিতভাবে তেল বিক্রির সুযোগ দিতে কিছু নিষেধাজ্ঞা ছাড় দিতে পারে।
প্রস্তাবিত সমঝোতার সম্ভাব্য বিষয়গুলো হলো-
- প্রথমত, চলমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৬০ দিন বাড়ানো হতে পারে।
- দ্বিতীয়ত, হরমুজ প্রণালি জাহাজ চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে।
- তৃতীয়ত, প্রণালিতে টোল আরোপ করা হবে না এবং মাইন অপসারণে ইরান ভূমিকা রাখবে।
- চতুর্থত, যুক্তরাষ্ট্র ইরানি বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ প্রত্যাহার করতে পারে।
- পঞ্চমত, ইরানের তেল বিক্রিতে কিছু নিষেধাজ্ঞা ছাড় দেওয়া হতে পারে।
- ষষ্ঠত, ৬০ দিনের মধ্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত নিয়ে পরবর্তী আলোচনা শুরু হবে।
- সপ্তমত, বিদেশে জব্দ থাকা ইরানের অর্থ ছাড়ের বিষয়টিও আলোচনায় আসতে পারে।
তবে সবচেয়ে জটিল প্রশ্ন রয়ে গেছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে। যুক্তরাষ্ট্রের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা দাবি করেছেন, ইরান নীতিগতভাবে ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত নিয়ে সমাধানে যেতে রাজি হয়েছে। তবে ইরানের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো নিশ্চিত বক্তব্য আসেনি। দ্য গার্ডিয়ানের লাইভ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে পাঠানোর বিরোধিতা করছে, তবে তা নিম্নমাত্রায় রূপান্তর বা সাময়িকভাবে সমৃদ্ধকরণ স্থগিতের মতো বিকল্প নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
রুবিও নিজেও বলেছেন, পারমাণবিক সমস্যার সমাধান দ্রুত করা সম্ভব নয়। বার্নামার প্রতিবেদনে তার বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি অবিলম্বে খুলতে হবে, এরপর নির্ধারিত কাঠামোর অধীনে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ, উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম এবং ইরানের কখনো পারমাণবিক অস্ত্র না রাখার প্রতিশ্রুতি নিয়ে গুরুতর আলোচনা হবে। তিনি বলেন, এসব কারিগরি বিষয়ে কাজ করতে সময় লাগবে।
এদিকে সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও সমালোচনা শুরু হয়েছে। ট্রাম্পের নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির কট্টর ইরানবিরোধী অংশের কেউ কেউ মনে করছেন, প্রস্তাবিত কাঠামো ২০১৫ সালের ইরান পারমাণবিক চুক্তির মতো হয়ে যেতে পারে, যেখান থেকে ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করেছিলেন। তবে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেছেন, তার সম্ভাব্য চুক্তি ওবামা আমলের চুক্তির মতো হবে না এবং এটি হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের সমঝোতা।
অন্যদিকে, তেলের বাজারে সম্ভাব্য সমঝোতার প্রভাব ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে। হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার আশায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমেছে। ফিন্যান্সিয়াল টাইমস জানিয়েছে, আলোচনার মধ্যেই দুটি এলএনজি ট্যাংকার হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে, যা জলপথটিতে সীমিতভাবে হলেও চলাচল বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। যুদ্ধের আগে বৈশ্বিক তেল ও এলএনজি প্রবাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে যেত।
তবে বিশ্লেষকেরা সতর্ক করছেন, চুক্তি হলেও দ্রুত সবকিছু স্বাভাবিক হবে না। হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া, মাইন অপসারণ, জাহাজ চলাচলের বীমা ঝুঁকি কমানো, তেল সরবরাহের সময়সূচি পুনর্গঠন এবং পারমাণবিক ইস্যুতে রাজনৈতিক সমঝোতা-সব মিলিয়ে দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া সামনে অপেক্ষা করছে।
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার সম্ভাবনা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখা হলেও বিষয়টি এখনো অনিশ্চিত। প্রাথমিক কাঠামোতে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া ও যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থাকলেও পারমাণবিক কর্মসূচি, ইউরেনিয়াম মজুত, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ইরানের জব্দ অর্থ ছাড়-এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত সমাধান এখনো হয়নি। তাই আপাতত এটিকে নিশ্চিত শান্তিচুক্তি নয়, বরং একটি নাজুক কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অগ্রগতি হিসেবেই দেখছেন পর্যবেক্ষকেরা।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স