এক বছরে জার্মান নাগরিকত্ব পেলেন রেকর্ডসংখ্যক অভিবাসী

এক বছরে জার্মান নাগরিকত্ব পেলেন রেকর্ডসংখ্যক অভিবাসী
ছবির ক্যাপশান, ছবি: এআই

গত এক বছরে জার্মানির নাগরিকত্ব পেয়েছেন রেকর্ডসংখ্যক অভিবাসী। নাগরিকত্ব আইন সহজ করার পর দেশটিতে পাসপোর্ট নেওয়ার প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ডয়চে ভেলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে অন্তত ৩ লাখ ৯ হাজার ৮৫২ জন জার্মান নাগরিকত্ব পেয়েছেন।

তবে এই সংখ্যা এখনো চূড়ান্ত নয়; জার্মানির ১৬টি অঙ্গরাজ্যের মধ্যে ১৪টির তথ্য এবং কয়েকটি অঙ্গরাজ্যের আংশিক তথ্যের ভিত্তিতে এই হিসাব করা হয়েছে। ফলে চূড়ান্ত পরিসংখ্যান প্রকাশ হলে সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

 

এর আগে ২০২৪ সালেও জার্মানিতে নাগরিকত্ব প্রদানে রেকর্ড হয়েছিল। জার্মানির ফেডারেল স্ট্যাটিসটিক্যাল অফিসের তথ্য উদ্ধৃত করে রয়টার্স জানিয়েছিল, ২০২৪ সালে ২ লাখ ৯১ হাজার ৯৫৫ জন জার্মান নাগরিকত্ব পান, যা ২০২৩ সালের তুলনায় ৪৬ শতাংশ বেশি। ওই বছর সবচেয়ে বড় অংশ ছিল সিরীয় নাগরিকদের। ২০২৪ সালে ৮৩ হাজার ১৫০ জন সিরীয় জার্মান নাগরিকত্ব পেয়েছিলেন, যা মোট নাগরিকত্বপ্রাপ্তদের প্রায় ২৮ শতাংশ। এরপর ছিল তুরস্ক, ইরাক, রাশিয়া ও আফগানিস্তানের নাগরিকরা।

 

জার্মান নাগরিকত্ব পাওয়ার এই উল্লম্ফনের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে ২০২৪ সালের নাগরিকত্ব আইন সংস্কার। ২০২৪ সালের ২৭ জুন কার্যকর হওয়া নতুন আইনে জার্মান নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য বসবাসের ন্যূনতম সময়সীমা ৮ বছর থেকে কমিয়ে ৫ বছর করা হয়। একই সঙ্গে বহু নাগরিকত্ব বা দ্বৈত নাগরিকত্বের সুযোগও বাড়ানো হয়। আগে জার্মান নাগরিকত্ব নিতে হলে অনেক ক্ষেত্রেই নিজের আগের নাগরিকত্ব ছাড়তে হতো; নতুন আইনে সেই বাধা অনেকটাই দূর হয়েছে। জার্মানির ফেডারেল ফরেন অফিসও জানিয়েছে, নতুন আইনের ফলে জার্মান নাগরিকত্ব নেওয়ার সময় আগের নাগরিকত্ব হারানো বাধ্যতামূলক নয় এবং পাঁচ বছর বসবাসের পর নাগরিকত্বের আবেদন করা সম্ভব।

 

এই পরিবর্তনের ফলে বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে জার্মানিতে থাকা তুর্কি বংশোদ্ভূত অভিবাসীদের মধ্যে নাগরিকত্ব নেওয়ার আগ্রহ বেড়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালে ২২ হাজার ৫২৫ জন তুর্কি নাগরিক জার্মান নাগরিকত্ব পান, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অনেক তুর্কি পরিবার ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে শ্রমিক হিসেবে জার্মানিতে গিয়েছিল; আগের নাগরিকত্ব ছাড়ার বাধ্যবাধকতার কারণে তাদের অনেকে দীর্ঘদিন নাগরিকত্ব নেননি। নতুন দ্বৈত নাগরিকত্বের সুযোগ সেই দ্বিধা অনেকটাই কমিয়েছে।

 

সিরীয় নাগরিকদের ক্ষেত্রে নাগরিকত্ব বৃদ্ধির পেছনে আরেকটি বড় কারণ হলো ২০১৫ ও ২০১৬ সালে যুদ্ধ ও নিপীড়ন থেকে পালিয়ে জার্মানিতে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীদের বড় একটি অংশ এখন আবাসনের শর্ত পূরণ করেছেন। সাবেক চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেলের সময় জার্মানি মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা বিপুলসংখ্যক শরণার্থীকে আশ্রয় দেয়। সেই সময় আসা অনেক সিরীয় ২০২৪ সালেই নাগরিকত্বের যোগ্য হয়ে ওঠেন। এ কারণেই ২০২৪ সালে জার্মান নাগরিকত্ব পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে সিরীয়রা সবচেয়ে বড় গোষ্ঠী হিসেবে উঠে আসে।

 

তবে নাগরিকত্ব আইন সহজ করার পরও জার্মানিতে বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত। নতুন রক্ষণশীল-সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট জোট সরকার অভিবাসন নীতিতে কিছু কঠোরতা আনতে শুরু করেছে। রয়টার্স জানিয়েছে, ২০২৫ সালের মে মাসে জার্মান সরকার পরিবার পুনর্মিলন সীমিত করা এবং দ্রুত নাগরিকত্বের সুযোগ কমানোর মতো পদক্ষেপ নেয়। বিশেষ সাফল্যের ভিত্তিতে তিন বছর পর নাগরিকত্ব পাওয়ার যে দ্রুত পথ চালু হয়েছিল, সেটি বাতিল করে ন্যূনতম সময়সীমা আবার পাঁচ বছর রাখা হয়েছে। আবেদনকারীদের আর্থিক স্বনির্ভরতা, স্থায়ী কর্মসংস্থান ও ভাষাজ্ঞানের মতো শর্তও গুরুত্ব পাচ্ছে।

 

ডয়চে ভেলের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, কিছু এলাকায় নাগরিকত্ব গ্রহণের হার সাময়িকভাবে কমলেও আগামী বছরগুলোতে নতুন করে আবেদন বাড়তে পারে। বিশেষ করে ইউক্রেনীয় শরণার্থীদের একটি বড় অংশ ২০২৭ সালের দিকে নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারেন। ২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার হামলার পর বহু ইউক্রেনীয় জার্মানিতে আশ্রয় নেন। তারা ২০২৭ সালের মধ্যে পাঁচ বছরের আবাসনের শর্ত পূরণ করতে শুরু করবেন।

 

জার্মানির উত্তরাঞ্চলীয় অরিখ অঞ্চলের এক মুখপাত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউক্রেনীয় শরণার্থীদের অস্থায়ী সুরক্ষা সুবিধার মেয়াদ ২০২৭ সালের মার্চে শেষ হওয়ার কথা। ফলে অনেকেই নিজেদের অবস্থান দীর্ঘমেয়াদে নিশ্চিত করতে জার্মান নাগরিকত্বের আবেদন করতে পারেন। ইউক্রেনীয় শরণার্থীরা অন্যান্য অনেক আশ্রয়প্রার্থীর তুলনায় কিছু কাঠামোগত সুবিধা পেয়েছেন; এর মধ্যে রয়েছে দ্রুত কর্মসংস্থানের অনুমতি, আবাসিক মর্যাদা এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় তুলনামূলক সহজ প্রবেশাধিকার।

 

বিশ্লেষকদের মতে, জার্মানিতে নাগরিকত্ব প্রদানের রেকর্ড শুধু আইন সহজ হওয়ার ফল নয়; এটি দেশটির জনসংখ্যা, শ্রমবাজার ও অভিবাসন বাস্তবতারও প্রতিফলন। জার্মানি দীর্ঘদিন ধরে দক্ষ শ্রমিক সংকটে ভুগছে। শিল্প, স্বাস্থ্যসেবা, নির্মাণ, পরিবহন ও প্রযুক্তি খাতে অভিবাসী শ্রমিকের ভূমিকা দিন দিন গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে। নাগরিকত্ব পাওয়া অভিবাসীদের জন্য ভোটাধিকার, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভেতরে চলাচলের সুবিধা, চাকরির নিরাপত্তা এবং সামাজিক অধিকার আরও শক্তিশালী হয়। ফলে অনেক দীর্ঘমেয়াদি অভিবাসী এখন জার্মান পাসপোর্টকে ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতার প্রতীক হিসেবে দেখছেন।


সম্পর্কিত নিউজ