ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা ইরানের

ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা ইরানের
ছবির ক্যাপশান, ছবি: এআই

যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি সত্ত্বেও নিজেদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদারের জন্য তেহরান ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে অর্থ ব্যয় অব্যাহত রাখবে এবং এ বিষয়ে কারও অনুমতি নেবে না।

ইরানি সংবাদমাধ্যম বর্ণা নিউজে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মন্তব্যের জবাবে বাঘাই বলেন, “হ্যাঁ, অবশ্যই! আমরা আমাদের অর্থের একটি অংশ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনে ব্যয় করি। কারণ আমরা যদি তা না করতাম, তাহলে আমাদের শত্রুরা তাদের লক্ষ্য অর্জন করতে পারত।” তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইরানের ওপর বারবার হামলার চেষ্টা এই প্রতিরক্ষা সক্ষমতার প্রয়োজনীয়তা প্রমাণ করেছে।

 

বাঘাইয়ের এই বক্তব্য এমন সময় এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধে সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে আলোচনায় অগ্রগতি থাকলেও তেহরান স্পষ্ট করেছে, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি তাদের প্রতিরক্ষা নীতির অংশ এবং এ বিষয়ে বাইরের কোনো চাপ মেনে নেওয়া হবে না।

 

রয়টার্স জানিয়েছে, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সোমবার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য সমঝোতা স্মারকের অনেক বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো গেলেও এর অর্থ এই নয় যে চুক্তি সই হওয়া কাছাকাছি। তিনি আরও বলেন, তেহরান এখন যুদ্ধ শেষ করার বিষয়ে আলোচনা করছে; পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে এই পর্যায়ে আলোচনা চলছে না।

 

বাঘাইয়ের বক্তব্যে বোঝা যাচ্ছে, ইরান যুদ্ধবিরতি বা হরমুজ প্রণালি নিয়ে কোনো সমঝোতায় গেলেও তার প্রতিরক্ষা কর্মসূচিকে আলাদা ইস্যু হিসেবে দেখাতে চায়। তেহরানের অবস্থান হলো-ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি তাদের নিরাপত্তার মূল হাতিয়ার, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক চাপের মুখে।

 

এদিকে পশ্চিমা দেশগুলোর উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের অভিযোগ, ইরানের এসব অস্ত্র কর্মসূচি মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়াচ্ছে এবং আঞ্চলিক মিত্রগোষ্ঠীগুলোকেও শক্তিশালী করছে। তবে তেহরান বরাবরই বলে আসছে, তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন কর্মসূচি প্রতিরক্ষামূলক এবং দেশটির সার্বভৌম নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত।

 

রয়টার্সের আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিএনএনের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলের শুরুতে কার্যকর হওয়া ছয় সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির সময়ই ইরান তার ড্রোন উৎপাদনের কিছু অংশ পুনরায় চালু করেছে। মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের সামরিক-শিল্প ঘাঁটি পুনর্গঠন প্রত্যাশার চেয়েও দ্রুত এগোচ্ছে। তবে রয়টার্স জানায়, তারা স্বাধীনভাবে এ তথ্য যাচাই করতে পারেনি।

 

এই প্রেক্ষাপটে বাঘাইয়ের বক্তব্য আরও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ সম্ভাব্য শান্তি আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র চাইছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম এবং আঞ্চলিক সামরিক সক্ষমতা নিয়ে কঠোর শর্ত যুক্ত করতে। কিন্তু ইরান এখনো ইঙ্গিত দিচ্ছে, যুদ্ধ বন্ধ বা হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া নিয়ে আলোচনা চললেও প্রতিরক্ষা কর্মসূচি নিয়ে ছাড় দেওয়ার প্রশ্নে তেহরান অনড়।

 

সম্প্রতি দক্ষিণ ইরানে মার্কিন সামরিক হামলাও উত্তেজনা আরও বাড়িয়েছে। আল জাজিরা জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ ইরানে ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা ও মাইন পেতে রাখার চেষ্টা করা নৌযান লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। ওয়াশিংটন এটিকে আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছে, তবে হামলার সম্ভাব্য প্রভাব শান্তি আলোচনার ওপর কী হবে তা এখনো পরিষ্কার নয়।

 

দ্য গার্ডিয়ানের লাইভ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড দাবি করেছে, দক্ষিণ ইরানে ক্ষেপণাস্ত্র সাইট এবং মাইন পাতা নৌযান লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। একই সময়ে ইরানি কর্মকর্তারা কাতারের রাজধানী দোহায় সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন।

 

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও সম্প্রতি বলেছেন, ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে তাড়াহুড়ো করা যাবে না। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, চুক্তি সম্পন্ন, অনুমোদিত ও স্বাক্ষরিত না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ বহাল থাকবে। তার প্রশাসন বলছে, সম্ভাব্য সমঝোতার লক্ষ্য হলো যুদ্ধবিরতি জোরদার করা, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং পরবর্তী ধাপে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করা।

 

তবে ইরানের অবস্থান থেকে বোঝা যাচ্ছে, তেহরান চুক্তির আলোচনাকে একাধিক স্তরে ভাগ করতে চায়। প্রথম স্তরে যুদ্ধ বন্ধ ও হরমুজ প্রণালির সংকট সমাধান; পরের স্তরে পারমাণবিক ইস্যু; আর ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে তারা জাতীয় প্রতিরক্ষার অংশ হিসেবে আলোচনার বাইরে রাখতে চাইছে।

 

বিশ্লেষকদের মতে, এখানেই সম্ভাব্য চুক্তির সবচেয়ে বড় জটিলতা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের জন্য ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা সরাসরি নিরাপত্তা উদ্বেগের বিষয়। বিশেষ করে দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, আত্মঘাতী ড্রোন এবং আঞ্চলিক মিত্রগোষ্ঠীগুলোর কাছে প্রযুক্তি বা অস্ত্র সরবরাহের অভিযোগ ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের প্রধান উদ্বেগ। অন্যদিকে ইরান মনে করে, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক হুমকির মুখে এই সক্ষমতা তার প্রতিরক্ষার অপরিহার্য অংশ।

 

হরমুজ প্রণালি ঘিরেও পরিস্থিতি নাজুক। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে জাহাজ চলাচল সীমিত হওয়ায় বৈশ্বিক তেল ও এলএনজি সরবরাহে বড় প্রভাব পড়েছে। সম্ভাব্য চুক্তির আলোচনায় হরমুজ খুলে দেওয়া, মাইন অপসারণ, জাহাজ চলাচলে টোল না নেওয়া এবং মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহারের মতো বিষয় রয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। কিন্তু নতুন মার্কিন হামলা ও ইরানের কঠোর প্রতিরক্ষা অবস্থান এই আলোচনাকে আরও অনিশ্চিত করে তুলতে পারে।

 

তথ্যসূত্র: রয়টার্স


সম্পর্কিত নিউজ