দক্ষিণ ইরানে মার্কিন হামলার পর আবার বাড়ল তেলের দাম

দক্ষিণ ইরানে মার্কিন হামলার পর আবার বাড়ল তেলের দাম
ছবির ক্যাপশান, ছবি: এআই

দক্ষিণ ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার পর আন্তর্জাতিক বাজারে আবারও বাড়তে শুরু করেছে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধে সম্ভাব্য সমঝোতার আশা তৈরি হলেও চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক তেলবাজারে।

মঙ্গলবার (২৬ মে) এশিয়ার লেনদেনে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ২ শতাংশের বেশি বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৮ ডলারের ওপরে উঠে যায়। রয়টার্স জানিয়েছে, দক্ষিণ ইরানে মার্কিন হামলার পর ব্রেন্ট ক্রুড এক পর্যায়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৮.১২ ডলারে ওঠে। আগের সেশনে সম্ভাব্য শান্তি চুক্তির আশায় ব্রেন্টের দাম প্রায় ৭ শতাংশ কমেছিল। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআই ক্রুডের দামও বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯১.৭৯ ডলারে পৌঁছায়, যদিও শুক্রবারের তুলনায় তা এখনো প্রায় ৫ শতাংশ কম ছিল।

 

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, তেলের দামে এই ওঠানামা দেখাচ্ছে-বাজার এখনো শান্তি চুক্তির সম্ভাবনা ও সামরিক উত্তেজনার মাঝামাঝি অবস্থায় আটকে আছে। একদিকে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার সম্ভাবনা তেলের দাম কমাচ্ছে, অন্যদিকে নতুন সামরিক হামলা ও চুক্তি চূড়ান্ত না হওয়ার অনিশ্চয়তা দাম আবার বাড়িয়ে দিচ্ছে।

 

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, দক্ষিণ ইরানে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণস্থল এবং মাইন পেতে রাখার কাজে জড়িত কয়েকটি নৌযান লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। এপি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র এসব হামলাকে ‘আত্মরক্ষামূলক’ পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, হামলার সময় যুদ্ধবিরতির শর্ত কার্যকর থাকলেও হরমুজ প্রণালি ঘিরে নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনো নাজুক।

 

দ্য গার্ডিয়ানের লাইভ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন বাহিনী ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা এবং মাইন পেতে রাখার চেষ্টা করা নৌযানকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। একই সময়ে ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা কাতারের রাজধানী দোহায় সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি ও শান্তি চুক্তি নিয়ে আলোচনায় অংশ নেন।

 

ইরানের গণমাধ্যমের বরাতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, সোমবার হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি বন্দর আব্বাস ও উপকূলীয় এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। বন্দর আব্বাস ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর শহর এবং হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি অবস্থানের কারণে জ্বালানি বাণিজ্যের দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 

যুদ্ধ শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালি কার্যত বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, ইরান প্রায় পুরোপুরি অ-ইরানি জাহাজ চলাচল সীমিত করে রেখেছে। এই প্রণালি দিয়ে যুদ্ধের আগে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি প্রবাহিত হতো। ফলে হরমুজে অচলাবস্থা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, এশিয়া, ইউরোপ ও বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহে বড় চাপ তৈরি করেছে।

 

এ অবস্থায় ইরানের শীর্ষ আলোচক ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী সোমবার দোহায় সম্ভাব্য শান্তি চুক্তি নিয়ে আলোচনা করেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষই জানিয়েছে, যুদ্ধ বন্ধে একটি সমঝোতা স্মারকের বিষয়ে কিছু অগ্রগতি হয়েছে। তবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, চুক্তিতে পৌঁছাতে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই মন্তব্য দ্রুত চুক্তির আশাকে কিছুটা ম্লান করে এবং তেলের বাজারে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করে।

 

সম্ভাব্য চুক্তির আওতায় ইরান ৩০ দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি থেকে মাইন সরিয়ে নিতে পারে-এমন আলোচনা চলছে। এরপর সব দেশের জাহাজ নিরাপদে চলাচল করতে পারবে এবং ইরান ট্রানজিট ফি আদায় বন্ধ করবে বলে প্রস্তাবে উল্লেখ থাকতে পারে। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত অবরোধ প্রত্যাহার এবং তেল বিক্রির ওপর কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে পারে। তবে এসব বিষয় এখনো চূড়ান্ত নয়।

 

বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার বলেছেন, বিনিয়োগকারীরা আশা করছেন, সমঝোতা হলে দীর্ঘদিন আটকে থাকা তেলবাহী জাহাজগুলো আবার স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারবে। তবে আগের শান্তি প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার অভিজ্ঞতা থাকায় বাজার এখনো পুরোপুরি আশ্বস্ত নয়। রয়টার্স জানিয়েছে, বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, অতীতের ব্যর্থ আলোচনা ও নতুন সামরিক পদক্ষেপের কারণে তেলের বাজারে অস্থিরতা আরও কিছুদিন থাকতে পারে।

 

জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী তথ্যেও সীমিত পরিবর্তনের আভাস মিলছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে পাকিস্তান, চীন ও ভারতের উদ্দেশ্যে কয়েকটি এলএনজিবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে বলে আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রায় তিন মাস আটকে থাকার পর ইরাকি তেলবাহী একটি সুপারট্যাঙ্কারও চীনের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছে। তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, কয়েকটি জাহাজ চলাচল শুরু করলেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে গেছে-এমন বলা যাবে না।

 

অন্যদিকে, জ্বালানি দামের এই অনিশ্চয়তা শুধু তেলবাজারেই সীমাবদ্ধ নেই। রয়টার্সের আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনায় তেলের দাম বাড়ায় মূল্যস্ফীতির উদ্বেগও বেড়েছে। ফলে স্বর্ণের বাজারেও চাপ তৈরি হয়েছে, কারণ বিনিয়োগকারীরা ধারণা করছেন জ্বালানি মূল্য বাড়লে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার উচ্চ রাখতে পারে।

 

সব মিলিয়ে তেলের বাজার এখন তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে-হরমুজ প্রণালি কবে পূর্ণভাবে খুলবে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা কত দ্রুত চূড়ান্ত হবে এবং নতুন সামরিক সংঘাত পরিস্থিতিকে আবার কতটা জটিল করে তুলবে। সম্ভাব্য চুক্তির খবর বাজারে স্বস্তি আনলেও দক্ষিণ ইরানে মার্কিন হামলা দেখিয়ে দিল, যুদ্ধবিরতি ও শান্তি আলোচনার পথ এখনো খুব নাজুক।

 

চুক্তি হলে আটকে থাকা তেল ও এলএনজি সরবরাহ ধীরে ধীরে বাজারে ফিরতে পারে। তবে মাইন অপসারণ, জাহাজের বীমা ঝুঁকি কমানো, বন্দর কার্যক্রম স্বাভাবিক করা এবং আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলে আস্থা ফিরিয়ে আনতে সময় লাগবে। তাই সাময়িকভাবে তেলের দাম কমলেও মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি পুরোপুরি স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত বাজারে বড় ওঠানামা অব্যাহত থাকতে পারে।

 

তথ্যসূত্র: রয়টার্স


সম্পর্কিত নিউজ