ইরানে নতুন করে হামলার পর যা বলল যুক্তরাষ্ট্র

ইরানে নতুন করে হামলার পর যা বলল যুক্তরাষ্ট্র
ছবির ক্যাপশান, ছবি : সংগৃহীত

দক্ষিণ ইরানে নতুন করে সামরিক হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের দাবি, এটি ছিল মার্কিন সেনাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিরক্ষামূলক অভিযান। তবে এই হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দ্রুত সমঝোতার যে আশা তৈরি হয়েছিল, তা কিছুটা ম্লান হয়ে গেছে। ভারত সফরে থাকা মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি চূড়ান্ত হতে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।

মঙ্গলবার (২৬ মে) ভারতের জয়পুরগামী বিমানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে রুবিও বলেন, হরমুজ প্রণালি অবশ্যই উন্মুক্ত রাখতে হবে। তার ভাষায়, প্রণালিটি “যেকোনো উপায়ে” খোলা থাকবে এবং সেটিই হওয়া প্রয়োজন। রয়টার্স জানিয়েছে, রুবিও বলেন, আলোচনার শর্তগুলো এখনো চূড়ান্ত হয়নি এবং চুক্তিতে পৌঁছাতে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।

 

এর আগে দক্ষিণ ইরানে মাইন বসানোর কাজে ব্যবহৃত নৌযান এবং ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণস্থলসহ কয়েকটি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম বলেছে, ইরানি বাহিনীর সম্ভাব্য হুমকি থেকে মার্কিন সেনাদের সুরক্ষার জন্যই এই হামলা চালানো হয়েছে। দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণস্থল ও মাইন পেতে রাখার কাজে জড়িত নৌযানকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।

 

এপ্রিলের শুরু থেকে একটি নাজুক যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও মাঠপর্যায়ে উত্তেজনা পুরোপুরি থামেনি। বরং নতুন মার্কিন হামলা দেখিয়ে দিয়েছে, শান্তি আলোচনার মাঝেও সামরিক চাপ বজায় রেখেছে ওয়াশিংটন। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র একদিকে কূটনীতিকে সুযোগ দিতে চাইছে, অন্যদিকে হরমুজ প্রণালি ও মার্কিন সেনাদের নিরাপত্তা প্রশ্নে কঠোর অবস্থান ধরে রাখতে চাইছে।

 

এদিকে ইরানও পাল্টা সামরিক সক্ষমতার দাবি সামনে এনেছে। ইরানি সংবাদমাধ্যমের বরাতে ডন জানিয়েছে, তেহরান দাবি করেছে, পারস্য উপসাগরের ওপর একটি ‘শত্রু ড্রোন’ নতুন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে ভূপাতিত করা হয়েছে। তবে ড্রোনটি কোন দেশের বা কোথা থেকে এসেছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানায়নি ইরান।

 

যুক্তরাষ্ট্রের হামলার সময়ই ইরানের প্রধান আলোচক ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি কাতারের রাজধানী দোহায় অবস্থান করছিলেন। সেখানে কাতারের প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে সম্ভাব্য শান্তি চুক্তি ও তিন মাস ধরে চলা যুদ্ধের অবসান নিয়ে আলোচনা হয় বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দোহা আলোচনায় হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং পারমাণবিক ইস্যুতে সময়সীমাবদ্ধ আলোচনা শুরু করার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।

 

রুবিও এর আগে নয়াদিল্লিতে সাংবাদিকদের বলেন, ইরান ইস্যুতে অন্য কোনো পথ বিবেচনার আগে যুক্তরাষ্ট্র কূটনীতিকে সফল হওয়ার সর্বোচ্চ সুযোগ দিতে চায়। তার ভাষায়, আলোচনার টেবিলে একটি শক্তিশালী প্রস্তাব রয়েছে। এতে হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বাস্তব, গুরুত্বপূর্ণ ও সময়সীমাবদ্ধ আলোচনা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, কোনো দুর্বল বা খারাপ চুক্তি মেনে নেবে না ওয়াশিংটন।

 

সম্ভাব্য চুক্তির আলোচনায় কয়েকটি বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে-হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া, প্রণালি থেকে মাইন অপসারণ, জাহাজ চলাচলে বাধা দূর করা, ইরানের ওপর কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং পরবর্তী ধাপে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা। তবে ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম, জব্দ থাকা অর্থ ছাড় এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নিয়ে এখনো বড় মতপার্থক্য রয়ে গেছে।

 

হরমুজ প্রণালি বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এই জলপথে জাহাজ চলাচল সীমিত হয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক তেল ও গ্যাস সরবরাহে বড় চাপ তৈরি হয়েছে। যুদ্ধের আগে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই প্রণালি দিয়ে যেত। ফলে প্রণালিটি খোলা রাখা শুধু যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ক নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 

বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ ইরানে মার্কিন হামলা এবং একই সময়ে শান্তি আলোচনার অগ্রগতি-দুই ঘটনা একসঙ্গে চলায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। একদিকে কূটনৈতিক অগ্রগতির সম্ভাবনা তেলের বাজারে স্বস্তি আনতে পারে, অন্যদিকে নতুন হামলা ও পাল্টা সামরিক দাবি বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে।

 

সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতার সম্ভাবনা থাকলেও তা এখনো নিশ্চিত নয়। রুবিওর বক্তব্যে স্পষ্ট, চুক্তি হতে আরও সময় লাগবে। আর দক্ষিণ ইরানে নতুন হামলা দেখিয়ে দিয়েছে, আলোচনা চললেও হরমুজ প্রণালি, মার্কিন সেনা নিরাপত্তা, ইরানের সামরিক সক্ষমতা ও পারমাণবিক ইস্যু-সবকিছু এখনো অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় রয়েছে।

 

 


সম্পর্কিত নিউজ