{{ news.section.title }}
যুদ্ধ বন্ধে ইরানের নতুন প্রস্তাবে সন্তুষ্ট নন ট্রাম্প: মার্কিন কর্মকর্তা
ইরানের সঙ্গে দুই মাস ধরে চলা যুদ্ধ শেষ করতে তেহরানের সর্বশেষ প্রস্তাব নিয়ে সন্তুষ্ট নন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বিষয়টি জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা। এতে যুদ্ধ অবসানের কূটনৈতিক সম্ভাবনা আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
এই যুদ্ধ ইতোমধ্যে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধাক্কা দিয়েছে, বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়িয়েছে, মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি করেছে এবং হাজারো মানুষের প্রাণহানির কারণ হয়েছে।
মার্কিন কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, ইরানের নতুন প্রস্তাবে যুদ্ধ বন্ধ ও উপসাগরীয় জলপথে জাহাজ চলাচল নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির আগে পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা না করার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ, তেহরান চায় প্রথমে যুদ্ধ থামুক, হরমুজ প্রণালি ও নৌ অবরোধের মতো জরুরি ইস্যুর সমাধান হোক, এরপর পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।
তবে ওয়াশিংটনের অবস্থান ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্র বলছে, আলোচনার শুরু থেকেই ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে স্পষ্ট সিদ্ধান্তে যেতে হবে। এই কারণেই ট্রাম্প ইরানের প্রস্তাবে অসন্তুষ্ট বলে জানিয়েছেন প্রেসিডেন্টের সোমবারের উপদেষ্টাদের বৈঠক সম্পর্কে অবগত ওই মার্কিন কর্মকর্তা। তিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ তথ্য দেন।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস বলেন, যুক্তরাষ্ট্র “গণমাধ্যমের মাধ্যমে আলোচনা করবে না”। তিনি আরও জানান, ট্রাম্প প্রশাসন তাদের ‘রেড লাইন’ বা মূল শর্তগুলো আগেই স্পষ্ট করেছে।
২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশের সঙ্গে ইরানের একটি পরমাণু চুক্তি হয়েছিল। ওই চুক্তির মাধ্যমে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ব্যাপকভাবে সীমিত করা হয়। তেহরান বরাবরই বলে এসেছে, তার পরমাণু কার্যক্রম শান্তিপূর্ণ ও বেসামরিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত। তবে ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে একতরফাভাবে ওই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেন।
শান্তি প্রচেষ্টায় নতুন ধাক্কা
গত সপ্তাহান্তে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জামাতা জ্যারেড কুশনারের সফরের কথা ছিল। কিন্তু ট্রাম্প সেই সফর বাতিল করেন। এরপর থেকেই শান্তি আলোচনার সম্ভাবনা কমে যায়।
সপ্তাহান্তে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি দুই দফায় ইসলামাবাদে যান। তিনি ওমানেও সফর করেন। সোমবার তিনি রাশিয়ায় গিয়ে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে দীর্ঘদিনের মিত্র রাশিয়ার কাছ থেকে সমর্থনের বার্তা পান তিনি।
হরমুজে সংকট, তেলের দাম আবার ঊর্ধ্বমুখী
দুই পক্ষের অবস্থান এখনো অনেক দূরে থাকায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম আবার বাড়তে শুরু করেছে। মঙ্গলবার এশিয়ার শুরুর লেনদেনে তেলের দাম আরও ঊর্ধ্বমুখী হয়।
বাজার বিশ্লেষক ফাওয়াদ রাজাকজাদা বলেন, তেল ব্যবসায়ীদের কাছে এখন রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাস্তবে কতটা অপরিশোধিত তেল চলাচল করছে। তার মতে, বর্তমানে সেই প্রবাহ এখনও সীমিত।
জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের কারণে ইরানি তেলবাহী অন্তত ছয়টি ট্যাংকারকে আবার ইরানে ফিরে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। এতে যুদ্ধের কারণে নৌ চলাচলের ওপর যে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে, তা আরও স্পষ্ট হয়েছে।
আরো পড়ুন : ইরানকে সমর্থনের অভিযোগে ৬৯ জনের নাগরিকত্ব বাতিল করল বাহরাইন
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তেহরানের ভাষায়, ইরান-সংশ্লিষ্ট ট্যাংকার আটক করা “সমুদ্রে দস্যুতা ও সশস্ত্র ডাকাতিকে বৈধতা দেওয়ার” শামিল।
যুদ্ধের আগে সাধারণত প্রতিদিন ১২৫ থেকে ১৪০টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করত। তবে জাহাজ-ট্র্যাকিং ও স্যাটেলাইট তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় মাত্র সাতটি জাহাজ ওই পথ ব্যবহার করেছে। এর কোনোটি বৈশ্বিক বাজারের জন্য তেল বহন করছিল না।
ঘরে-বাইরে চাপের মুখে ট্রাম্প
জনসমর্থন কমতে থাকায় ট্রাম্প এখন দেশে যুদ্ধ শেষ করার চাপের মুখে আছেন। এই যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন জনগণের সামনে তার ব্যাখ্যাও একাধিকবার বদলেছে বলে সমালোচনা রয়েছে। রাশিয়ায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের কোনো লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি বলেই ট্রাম্প এখন আলোচনার অনুরোধ করছেন।
ইরানের প্রস্তাব কী ছিল
ইরানের জ্যেষ্ঠ কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আরাকচি ইসলামাবাদে যে প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছিলেন, সেটি ধাপে ধাপে আলোচনার পরিকল্পনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। প্রস্তাব অনুযায়ী, শুরুতে পরমাণু ইস্যু বাদ রাখা হবে।
প্রথম ধাপে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে এবং ওয়াশিংটন যেন আবার যুদ্ধ শুরু করতে না পারে, সে বিষয়ে নিশ্চয়তা দিতে হবে।
এরপর আলোচনা হবে ইরানের সমুদ্র বাণিজ্যের ওপর মার্কিন নৌ অবরোধ ও হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নিয়ে। ইরান চায়, এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ আবার খুলে দেওয়া হোক, তবে তা তেহরানের নিয়ন্ত্রণের অধীনেই থাকবে।
সবশেষে পরমাণু কর্মসূচিসহ অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি বিরোধ নিয়ে আলোচনা করতে চায় ইরান। এর মধ্যে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো না কোনো স্বীকৃতিও চায় তেহরান।
সব মিলিয়ে, ইরানের নতুন প্রস্তাব যুদ্ধ থামানোর একটি পথ দেখালেও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তা এখনো গ্রহণযোগ্য নয়। পরমাণু কর্মসূচি, হরমুজ প্রণালি, নৌ অবরোধ এবং নিরাপত্তা নিশ্চয়তা-এই চার ইস্যুতে সমঝোতা না হলে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংকট দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম।
সূত্র: রয়টার্স