{{ news.section.title }}
ঘানায় ভয়াবহ বন্যায় মৃত বেড়ে ৩৪, বাস্তুচ্যুত প্রায় ৯০ হাজার
পশ্চিম আফ্রিকার দেশ ঘানায় কয়েক দিনের টানা ভারী বৃষ্টিতে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ৩৪ জনে দাঁড়িয়েছে। দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, উদ্ধার অভিযান এখনো অব্যাহত থাকায় নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান মিললে প্রাণহানির সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। ইতোমধ্যে প্রায় ৯০ হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। দেশের সাতটি অঞ্চল ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে রাজধানী আক্রা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে।
ঘানার জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা (NADMO)-এর পরিদর্শন বিভাগের পরিচালক রিচার্ড অ্যামো ইয়ার্তে স্থানীয় গণমাধ্যমকে জানান, এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া ৩৪ জনের মৃত্যুর মধ্যে ১২ জনই রাজধানী আক্রা থেকে। তবে বিভিন্ন এলাকা থেকে এখনও নিখোঁজের খবর পাওয়া যাচ্ছে। নিখোঁজদের বিষয়ে যাচাই-বাছাই চলছে এবং ধ্বংসস্তূপ ও প্লাবিত এলাকা থেকে উদ্ধারকাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত মৃত্যুর সংখ্যা বলা সম্ভব নয়।
টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণের পর সোমবার থেকে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হতে শুরু করে। অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ বৃষ্টির পানি জমে রাজধানী আক্রা, তেমা এবং আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যায়। বহু প্রধান সড়ক, সেতু ও আবাসিক এলাকা ডুবে যাওয়ায় উদ্ধারকারী দলগুলোর চলাচলও ব্যাহত হয়। অনেক এলাকায় নৌকা ব্যবহার করে বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, বন্যায় সাতটি অঞ্চলের মোট ৮৯ হাজার ৭৩৬ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সবচেয়ে বেশি বাস্তুচ্যুত হয়েছেন গ্রেটার আক্রা অঞ্চলের বাসিন্দারা। সেখানে ৫৪ হাজার ৭১২ জনকে ঘর ছাড়তে হয়েছে। সেন্ট্রাল অঞ্চলে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন ২১ হাজার ৮৮২ জন। এছাড়া ভোল্টা, ওয়েস্টার্ন, ওয়েস্টার্ন নর্থ, আশান্তি ও ইস্টার্ন অঞ্চলও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইস্টার্ন অঞ্চলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তুলনামূলক কম হলেও অনেক পরিবার তাদের ঘরবাড়ি হারিয়েছে।
উদ্ধারকর্মীরা বলছেন, অনেক এলাকায় এখনো কোমরসমান পানি জমে রয়েছে। ডুবে যাওয়া বাড়ি, ভেসে যাওয়া যানবাহন এবং ধসে পড়া দেয়ালের কারণে অনুসন্ধান অভিযান অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকায় অনেক জায়গায় রাতের উদ্ধার অভিযান সীমিত রাখতে হচ্ছে।
স্থানীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, আক্রার বিভিন্ন এলাকায় মানুষ ছাদের ওপর, স্কুল ভবন ও উপাসনালয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। বহু পরিবার প্রয়োজনীয় খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও ওষুধের সংকটে রয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানীয় জল, কম্বল ও জরুরি চিকিৎসা সামগ্রী বিতরণ শুরু করেছে।
দেশটির ফায়ার সার্ভিস, সেনাবাহিনী, পুলিশ এবং স্বেচ্ছাসেবীরা যৌথভাবে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করছে। প্লাবিত অনেক এলাকায় সাধারণ মানুষও উদ্ধারকাজে অংশ নিচ্ছেন। যেসব এলাকায় ভারী যন্ত্রপাতি পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না, সেখানে হাতে-কলমে উদ্ধার তৎপরতা চালানো হচ্ছে।
বন্যার কারণে বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও সরকারি অফিস সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে। রাজধানীর বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে জরুরি সেবা পৌঁছে দিতে সমস্যার মুখে পড়তে হয় প্রশাসনকে। অনেক স্থানে গাড়ি পানিতে ডুবে গেছে এবং শত শত যানবাহন আটকা পড়ে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত নগরায়ণ, অপরিকল্পিত নির্মাণ, নর্দমা ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং জলাশয় ভরাটের কারণে আক্রায় প্রায় প্রতি বছরই ভয়াবহ জলাবদ্ধতা ও বন্যার সৃষ্টি হয়। অল্প সময়ের ভারী বর্ষণেও রাজধানীর বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ার ঘটনা এখন প্রায় নিয়মিত হয়ে উঠেছে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO) দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছে যে আফ্রিকার অনেক দেশ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে চরম আবহাওয়ার ঝুঁকির মুখে রয়েছে। যদিও বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে আফ্রিকার অবদান খুবই কম, তবুও জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রভাবগুলোর একটি এই মহাদেশকে বহন করতে হচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পশ্চিম আফ্রিকাজুড়ে বন্যা, আকস্মিক ভারী বৃষ্টি এবং ভূমিধসের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
ঘানার আবহাওয়া অধিদপ্তর আরও ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে। ফলে উদ্ধারকাজের পাশাপাশি নতুন করে প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। কর্তৃপক্ষ নিচু এলাকা, নদীতীর এবং ঝুঁকিপূর্ণ বসতিতে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ঘানার রাজধানী আক্রায় বন্যা এখন শুধু মৌসুমি দুর্যোগ নয়, বরং নগর পরিকল্পনা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতার একটি জটিল সংকটে পরিণত হয়েছে। পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, জলাধার সংরক্ষণ এবং দুর্যোগ প্রস্তুতি জোরদার না করলে ভবিষ্যতে এ ধরনের বন্যায় প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
এদিকে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকায় কর্তৃপক্ষ আশঙ্কা করছে, প্লাবিত ভবন, ডুবে যাওয়া যানবাহন এবং ধ্বংসস্তূপ থেকে আরও মরদেহ উদ্ধার হতে পারে। ফলে ঘানার সাম্প্রতিক এই বন্যায় মৃতের সংখ্যা বর্তমান হিসাবের চেয়েও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তারা।
তথ্যসূত্র: আনাদোলু এজেন্সি