ইরান ইস্যুতে মার্কিন কর্মকর্তাদের ওপর ইসরায়েলের নজরদারি!

ইরান ইস্যুতে মার্কিন কর্মকর্তাদের ওপর ইসরায়েলের নজরদারি!
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক তৎপরতা এবং সম্ভাব্য সমঝোতা প্রচেষ্টার মধ্যে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের সম্পর্ক নতুন করে আলোচনায় এসেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর একাধিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে চলমান আলোচনায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের প্রকৃত অবস্থান ও কৌশল সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তাদের তৎপরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে।

মার্কিন সংবাদপত্র নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে গোয়েন্দা মূল্যায়নের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইসরায়েলের গোয়েন্দা কার্যক্রম এমন মাত্রায় পৌঁছেছে যে তা যুক্তরাষ্ট্রের কিছু প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের গোয়েন্দা তৎপরতার সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশেষ করে ইরান-সম্পর্কিত আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান আগেভাগে জানার জন্য বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন কর্মকর্তাকে নজরদারির আওতায় আনার চেষ্টা হয়েছে।

 

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ট্রাম্প প্রশাসনের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ, প্রতিরক্ষা নীতিবিষয়ক শীর্ষ কর্মকর্তা এলব্রিজ কোলবি এবং পেন্টাগনের আরও কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করেছে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের একটি অংশের মতে, ইরানকে কেন্দ্র করে দুই মিত্র দেশের মধ্যে কৌশলগত মতপার্থক্য বাড়ার পরই এসব তৎপরতা জোরদার হয়েছে।

 

এদিকে এনবিসি নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি গুপ্তচরবৃত্তির সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের ভেতরে উদ্বেগের মাত্রা বেড়েছে। এমনকি মার্কিন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা (ডিআইএ) সম্প্রতি ইসরায়েলকে ঘিরে পাল্টা গোয়েন্দা সতর্কতার স্তর ‘হাই’ থেকে বাড়িয়ে ‘ক্রিটিক্যাল’ বা সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত করেছে বলে দাবি করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের মতে, বহু বছর ধরে দুই দেশ একে অপরের ওপর সীমিত পর্যায়ে গোয়েন্দা নজরদারি চালালেও সাম্প্রতিক কার্যক্রম স্বাভাবিক মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে।

 

মার্কিন কর্মকর্তাদের অভিযোগ, কিছু ক্ষেত্রে মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মীদের যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর নজরদারির চেষ্টার ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে। যদিও এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই এখনো সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে ইসরায়েল আনুষ্ঠানিকভাবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ওয়াশিংটনে অবস্থিত ইসরায়েলি দূতাবাসের এক মুখপাত্র বলেছেন, “ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি প্রতিষ্ঠান বা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোনো গুপ্তচরবৃত্তি পরিচালনা করে না।” একইভাবে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকেও কিছু অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে বর্ণনা করা হয়েছে।

 

বিশ্লেষকদের মতে, এই উত্তেজনার পেছনে অন্যতম কারণ হলো ইরান প্রশ্নে ট্রাম্প প্রশাসন ও ইসরায়েল সরকারের মধ্যে ক্রমবর্ধমান মতপার্থক্য। সাম্প্রতিক সময়ে ওয়াশিংটন তেহরানের সঙ্গে একটি সম্ভাব্য সমঝোতার পথ খুঁজছে, যাতে যুদ্ধবিরতি টিকিয়ে রাখা যায় এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানো সম্ভব হয়। তবে ইসরায়েলের নিরাপত্তা মহলের একটি অংশ আশঙ্কা করছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের কোনো নতুন সমঝোতা হলে তা তেহরানের আঞ্চলিক প্রভাব আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

 

এর আগেও যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলি গোয়েন্দা তৎপরতা নিয়ে বিতর্ক দেখা গেছে। সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল ১৯৮০-এর দশকে মার্কিন নৌবাহিনীর গোয়েন্দা বিশ্লেষক জনাথন পোলার্ডের মামলা। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের গোপন নথি ইসরায়েলের কাছে সরবরাহ করার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন এবং প্রায় তিন দশক কারাভোগ করেন। সেই ঘটনা দুই দেশের সম্পর্কের ইতিহাসে অন্যতম বড় গোয়েন্দা কেলেঙ্কারি হিসেবে বিবেচিত হয়।

 

তবে গোয়েন্দা বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, শুধু ইসরায়েল নয়, বিশ্বের প্রায় সব বড় শক্তিই মিত্র দেশগুলোর ওপর নজরদারি চালিয়ে থাকে। ২০১৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার (এনএসএ) সাবেক কর্মী ও তথ্যফাঁসকারী এডওয়ার্ড স্নোডেন প্রকাশিত নথিতে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র নিজেও মিত্র দেশগুলোর শীর্ষ নেতাদের যোগাযোগ পর্যবেক্ষণ করেছিল। সেই তালিকায় ছিলেন জার্মানির সাবেক চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেলসহ ইউরোপের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা।

 

বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কৌশলগত দূরত্ব কতটা বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক সংঘাত, যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়ন এবং তেহরানের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তির আলোচনার মধ্যেই এই গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ সামনে এসেছে। ফলে দুই ঘনিষ্ঠ মিত্রের মধ্যে পারস্পরিক আস্থার বিষয়টি আবারও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।

 

কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, অভিযোগগুলোর সত্যতা যাই হোক না কেন, ঘটনাটি স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ইরান ইস্যুতে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের মধ্যে নীতিগত পার্থক্য আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। আর সেই কারণেই গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের প্রতিযোগিতা এখন মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে পরিণত হয়েছে।


সম্পর্কিত নিউজ