{{ news.section.title }}
ভেনেজুয়েলায় ভয়াবহ ভূমিকম্পে মৃত বেড়ে ৫,১১৯
দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় গত ২৪ জুন আঘাত হানা পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের এক মাস পরও বাড়ছে প্রাণহানির সংখ্যা। দেশটির সরকারের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫ হাজার ১১৯ জনে পৌঁছেছে। শুক্রবারের তুলনায় আরও ৫০ জনের মরদেহ উদ্ধার হওয়ায় এই সংখ্যা বেড়েছে। আহতের সংখ্যা ১৬ হাজার ৭৪০ জন এবং এখনো বহু মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, যদিও নিখোঁজের কোনো আনুষ্ঠানিক সংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি।
ভেনেজুয়েলার পার্লামেন্টের সভাপতি হোর্হে রদ্রিগেজ টেলিগ্রামে জানান, উদ্ধারকাজ অব্যাহত থাকায় ধ্বংসস্তূপ থেকে নতুন করে মরদেহ উদ্ধার হচ্ছে। এ কারণে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আহতদের সংখ্যা গত কয়েক দিন ধরে অপরিবর্তিত রয়েছে।
এক মিনিটেরও কম সময়ে দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প
গত ২৪ জুন স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় ভেনেজুয়েলায় মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (USGS) প্রথম ভূমিকম্পের মাত্রা ৭.২ এবং দ্বিতীয়টির মাত্রা ৭.৫ রেকর্ড করে। মাত্র এক মিনিটেরও কম সময়ের ব্যবধানে সংঘটিত এই দুটি ভূমিকম্পকে দেশটির সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত লা গুয়াইরা
রাজধানী কারাকাস সংলগ্ন উপকূলীয় লা গুয়াইরা (La Guaira) রাজ্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেখানে শত শত বহুতল ভবন ধসে পড়েছে এবং বহু আবাসিক এলাকা কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এছাড়া কারাকাস ও আশপাশের এলাকাতেও বহু ভবন, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ভূমিকম্পে ৮৫৬টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে ১৯০টি সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে। এছাড়া অসংখ্য সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ লাইন, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোও ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে।
এক হাজারের বেশি আফটারশক
ভূমিকম্পের পর থেকে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৩৩১টিরও বেশি আফটারশক বা পরাঘাত রেকর্ড করা হয়েছে। ফলে উদ্ধারকাজ বারবার ব্যাহত হচ্ছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলো আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নিরাপত্তার কারণে অনেক এলাকায় উদ্ধারকারী দলকে কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে।
হাজারো মানুষ এখনো গৃহহীন
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ১৭ হাজার ৯০৭ জন মানুষ তাদের বসতবাড়ি হারিয়েছেন। তারা বর্তমানে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র, স্কুল, ক্রীড়া কমপ্লেক্স এবং সরকারি ভবনে অবস্থান করছেন। অনেক পরিবার এখনো বিশুদ্ধ পানি, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্যসেবা এবং পর্যাপ্ত খাদ্যের সংকটে রয়েছে।
এদিকে উদ্ধারকারী দল ইতোমধ্যে ৬ হাজার ৪৬২ জনকে জীবিত উদ্ধার করেছে। তবে ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো অনেক মানুষ আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
উদ্ধার তৎপরতা নিয়ে বাড়ছে সমালোচনা
ভূমিকম্প-পরবর্তী উদ্ধার তৎপরতা নিয়ে ভেনেজুয়েলার সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনাও বাড়ছে। রয়টার্স জানিয়েছে, সেনাবাহিনীর মোতায়েন, উদ্ধার সরঞ্জামের ঘাটতি এবং সমন্বয়হীনতার কারণে দুর্ঘটনার প্রথম কয়েক ঘণ্টায় উদ্ধার অভিযান মারাত্মকভাবে বিলম্বিত হয়। অনেক এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেদের উদ্যোগেই খালি হাতে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে জীবিত ও মৃতদের উদ্ধার করেন।
এদিকে দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে সরকারি ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রমের ধীরগতিকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। অনেক ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার অভিযোগ করেছে, ভূমিকম্পের পর প্রথম দিকে তারা পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তা পাননি।
পুনর্গঠনে বড় চ্যালেঞ্জ
ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বলেছে, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর পুনর্গঠনে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে। সরকার আন্তর্জাতিক সহায়তা ও বিদেশে আটকে থাকা রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ চেয়েছে, যাতে পুনর্গঠন, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা এবং অবকাঠামো পুনর্বাসনের কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক ইতিহাসে এটি সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোর একটি। উদ্ধার অভিযান শেষ না হওয়া পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন ও অবকাঠামো পুনর্গঠন দেশটির জন্য একটি বড় অর্থনৈতিক ও মানবিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।