ফিলিপাইনে ৭.৮ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প, সুনামি সতর্কতায় উপকূলজুড়ে

ফিলিপাইনে ৭.৮ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প, সুনামি সতর্কতায় উপকূলজুড়ে
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

ফিলিপাইনের দক্ষিণাঞ্চলে আঘাত হেনেছে ৭ দশমিক ৮ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প। সোমবার (৮ জুন) স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ৩৭ মিনিটে মিন্দানাও দ্বীপের সারাঙ্গানি উপকূলের কাছে এই ভূমিকম্প আঘাত হানে। শক্তিশালী কম্পনে অন্তত একজন নিহত এবং চারজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছে কর্তৃপক্ষ।

মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানায়, ভূমিকম্পটির কেন্দ্র ছিল মিন্দানাওয়ের জেনারেল সান্তোস সিটির কাছাকাছি সমুদ্র এলাকায়। প্রাথমিকভাবে ভূমিকম্পের মাত্রা ৮.২ বলে ধারণা করা হলেও পরে তা সংশোধন করে ৭.৮ নির্ধারণ করা হয়। ভূমিকম্পটি অগভীর গভীরতায় সংঘটিত হওয়ায় এর প্রভাব ব্যাপকভাবে অনুভূত হয়েছে।

 

ভূমিকম্পের পরপরই ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার কিছু অংশে সুনামি সতর্কতা জারি করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্যাসিফিক সুনামি ওয়ার্নিং সেন্টার সতর্ক করে জানায়, ফিলিপাইনের কিছু উপকূলে ৩ মিটার পর্যন্ত উচ্চতার সুনামি তরঙ্গ আঘাত হানতে পারে। পাশাপাশি ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার কিছু এলাকায় ১ মিটার পর্যন্ত ঢেউয়ের আশঙ্কা রয়েছে। জাপান, তাইওয়ান, গুয়াম এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় কয়েকটি দ্বীপাঞ্চলের জন্যও সতর্কতা জারি করা হয়।

 

পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট Ferdinand Marcos Jr. জরুরি উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম জোরদারের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি দেশবাসীকে সুনামি সতর্কবার্তা অবহেলা না করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “জীবন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো অবস্থাতেই ঝুঁকি নেওয়া যাবে না।” প্রেসিডেন্টের নির্দেশে অফিস অব সিভিল ডিফেন্স এবং ন্যাশনাল ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট কাউন্সিল মাঠপর্যায়ে উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করেছে।

 

ফিলিপাইনের ভূকম্পন পর্যবেক্ষণ সংস্থা ফিভলকস (PHIVOLCS) সারাঙ্গানি, দাভাও অক্সিডেন্টাল, সুলু, তাউই-তাউইসহ অন্তত নয়টি উপকূলীয় প্রদেশের বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ ও উঁচু স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, প্রথম সুনামি তরঙ্গ আঘাত হানার পরও কয়েক ঘণ্টা ধরে বিপজ্জনক ঢেউ অব্যাহত থাকতে পারে।

 

ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জেনারেল সান্তোস ও আশপাশের এলাকা। স্থানীয় গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, জেনারেল সান্তোস সিটিতে একটি তিনতলা জোলিবি (Jollibee) রেস্তোরাঁ ভবনের অংশ ধসে পড়েছে। এছাড়া বিভিন্ন আবাসিক ভবন, স্কুল ও বাণিজ্যিক স্থাপনায় ফাটল এবং আংশিক ধসের ঘটনা ঘটেছে। বহু এলাকায় বিদ্যুৎ ও টেলিযোগাযোগ সেবা সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

 

প্রাদেশিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মিন্দানাওয়ের কয়েকটি এলাকায় স্কুল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ভূমিকম্পের সময় অনেক শিক্ষার্থী ও শিক্ষক আতঙ্কে ভবন থেকে বের হয়ে খোলা স্থানে আশ্রয় নেন। কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভবনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে প্রাথমিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

স্থানীয় পুলিশ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বহু ভবনে ফাটল দেখা দিয়েছে এবং কিছু এলাকায় সড়ক ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উদ্ধারকারী দল ধসে পড়া স্থাপনাগুলোতে আটকা পড়াদের খোঁজে তল্লাশি চালাচ্ছে।

 

ভূমিকম্পের পর একাধিক শক্তিশালী আফটারশক বা পরাঘাত অনুভূত হয়েছে, যার মধ্যে কয়েকটির মাত্রা ৬-এর বেশি ছিল। ফলে আতঙ্ক আরও বেড়ে যায় এবং উপকূলীয় অঞ্চল থেকে হাজার হাজার মানুষকে সরিয়ে নেওয়া শুরু হয়। এদিকে ইউএস ন্যাশনাল সুনামি ওয়ার্নিং সেন্টার জানিয়েছে, এই ভূমিকম্পের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে সুনামির কোনো ঝুঁকি নেই। তবে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশের জন্য পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

 

বিশ্বের সবচেয়ে ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলগুলোর একটি ‘প্যাসিফিক রিং অব ফায়ার’-এ অবস্থিত ফিলিপাইন। এ কারণে দেশটিতে প্রায়ই শক্তিশালী ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনা ঘটে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাম্প্রতিক এই ভূমিকম্পটি দেশটির সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যতম শক্তিশালী কম্পন, যার পূর্ণ ক্ষয়ক্ষতির চিত্র জানতে আরও সময় লাগবে।


সম্পর্কিত নিউজ