পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মিরে ২৬ দিনের অচলাবস্থা, ৩৮ দফা দাবিতে আন্দোলন ঘিরে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ

পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মিরে ২৬ দিনের অচলাবস্থা, ৩৮ দফা দাবিতে আন্দোলন ঘিরে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

পাকিস্তান-শাসিত আজাদ জম্মু ও কাশ্মিরে (এজেকে) ৩৮ দফা দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন টানা ২৬ দিনে গড়িয়েছে। এই সময়জুড়ে চলা ধর্মঘট, অবরোধ, লংমার্চ ও অসহযোগ কর্মসূচিতে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে পুরো অঞ্চল। রাজধানী মুজাফফরাবাদসহ রাওয়ালকোট, মিরপুর, কোটলি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শহরে দোকানপাট, গণপরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সরকারি সেবার বড় অংশ স্থবির হয়ে পড়েছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পাকিস্তান সরকার কঠোর অবস্থান নেওয়ায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষ আরও তীব্র হয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত অন্তত ২০ জন বেসামরিক নাগরিক এবং চারজন পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন। তবে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া সংগঠন জয়েন্ট আওয়ামি অ্যাকশন কমিটি (JAAC) দাবি করেছে, প্রকৃত নিহতের সংখ্যা ৩০ জনেরও বেশি।

 

বর্তমান সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জয়েন্ট আওয়ামি অ্যাকশন কমিটি (JAAC), যা ব্যবসায়ী, আইনজীবী, শিক্ষার্থী, পরিবহন শ্রমিক ও বিভিন্ন নাগরিক সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত একটি জোট। ২০২৩ সালে সংগঠনটি গঠিত হলেও চলতি বছরের ৯ জুন আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়। এর কয়েক দিন আগে পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মির সরকার সংগঠনটিকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এরপর থেকেই অঞ্চলজুড়ে ব্যাপক ধরপাকড়, অভিযান এবং নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি বাড়ানো হয়।


আন্দোলনের অন্যতম প্রধান দাবি হলো, আগামী ২৭ জুলাই অনুষ্ঠেয় আজাদ কাশ্মির আইনসভা নির্বাচনে পাকিস্তানের বিভিন্ন শহরে বসবাসরত কাশ্মিরি শরণার্থীদের জন্য সংরক্ষিত ১২টি আসন বাতিল করা। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, এই আসনগুলো এমন ব্যক্তিদের রাজনৈতিক ক্ষমতা দিচ্ছে, যারা আজাদ কাশ্মিরে বসবাসই করেন না। তাদের মতে, স্থানীয় জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের পরিবর্তে বাইরের মানুষের প্রভাব অঞ্চলটির রাজনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট করছে। তবে পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মিরের সুপ্রিম কোর্ট সম্প্রতি রায়ে জানিয়েছে, এই সংরক্ষিত আসনগুলো সাংবিধানিকভাবে সুরক্ষিত এবং সংবিধান সংশোধন ছাড়া এগুলো বাতিল করা সম্ভব নয়।


শুধু রাজনৈতিক দাবি নয়, আন্দোলনকারীরা বিদ্যুতের মূল্য হ্রাস, কাশ্মিরে উৎপাদিত বিদ্যুতের ওপর স্থানীয় জনগণের অগ্রাধিকার, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণ, সরকারি ব্যয় কমানো, ভিআইপি সংস্কৃতি বন্ধ, প্রশাসনিক বৈষম্য দূরীকরণ এবং স্থানীয় জনগণের জন্য অধিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করাসহ মোট ৩৮ দফা দাবি উত্থাপন করেছে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, আজাদ কাশ্মিরে উৎপাদিত বিদ্যুৎ দেশের অন্যান্য অংশে কম দামে সরবরাহ করা হলেও স্থানীয় বাসিন্দাদের বেশি দাম গুনতে হচ্ছে।


গত কয়েক সপ্তাহে রাওয়ালকোট, মুজাফফরাবাদ ও আশপাশের এলাকায় সংঘর্ষে বহু মানুষ হতাহত হয়েছেন। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে বেসামরিক নাগরিকের পাশাপাশি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যও রয়েছেন। পুলিশের দাবি, কিছু বিক্ষোভকারী আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করেছে এবং সরকারি স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করেছেন, নিরাপত্তা বাহিনী অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করেছে এবং নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছে।


সংঘাতের পর থেকে পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মিরজুড়ে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বহু এলাকায় কারফিউ জারি, মোবাইল ইন্টারনেট ও যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ, সড়ক অবরোধ এবং অতিরিক্ত আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ব্যাংকিং সেবা, এটিএম, জ্বালানি সরবরাহ, খাদ্যপণ্য পরিবহন এবং চিকিৎসাসেবাও ব্যাহত হয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা চরম দুর্ভোগের মুখে পড়েছে।


এদিকে পাকিস্তান প্রশাসন আন্দোলনের অন্যতম নেতা শওকত নওয়াজ মিরকে গ্রেপ্তার করেছে। তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ, সহিংসতায় উসকানি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর অভিযোগ আনা হয়েছে। এর আগে তাঁর অবস্থান জানাতে তথ্য দিলে এক কোটি পাকিস্তানি রুপি পুরস্কার ঘোষণা করেছিল কর্তৃপক্ষ। আন্দোলনের আরও কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধেও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।


মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মিরে আন্দোলন দমনে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি বলেছে, বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইন প্রয়োগ, নির্বিচারে গ্রেপ্তার এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশে বাধা দেওয়ার ঘটনা মানবাধিকারের জন্য উদ্বেগজনক। তারা ইসলামাবাদের প্রতি সংলাপের মাধ্যমে সংকট সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে।


পাকিস্তান সরকার অবশ্য দাবি করছে, ৩৮ দফা দাবির মধ্যে অধিকাংশ বিষয়ে ইতোমধ্যেই ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং মাত্র দুটি সাংবিধানিক বিষয় নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। তবে আন্দোলনকারীরা বলছেন, লিখিত ও কার্যকর সিদ্ধান্ত ছাড়া তারা আন্দোলন প্রত্যাহার করবেন না। তাদের অভিযোগ, পূর্বের প্রতিশ্রুতিগুলোও বাস্তবায়ন করা হয়নি।


এদিকে ইউরোপ, যুক্তরাজ্য, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আমেরিকায় বসবাসরত প্রবাসী কাশ্মিরিরাও পাকিস্তানের বিভিন্ন দূতাবাস ও কনস্যুলেটের সামনে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করছেন। তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি পরিস্থিতির দিকে নজর দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ বন্ধের দাবি তুলেছেন।


বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মিরের এই আন্দোলন শুধু অর্থনৈতিক দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি ধীরে ধীরে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, সাংবিধানিক কাঠামো, স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন এবং ইসলামাবাদের প্রশাসনিক নীতির বিরুদ্ধে বৃহত্তর জনঅসন্তোষে রূপ নিয়েছে। আগামী ২৭ জুলাইয়ের আইনসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে এই সংকট আরও জটিল হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।


সম্পর্কিত নিউজ