{{ news.section.title }}
পশ্চিমবঙ্গে কট্টর হিন্দুত্ববাদ বিজেপির ভূমিধস জয়ের পিছনে যে পাঁচ কারণ?
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বড় পালাবদলের ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়েছে। টানা প্রায় দেড় দশক ক্ষমতায় থাকা তৃণমূল কংগ্রেস বড় ধাক্কার মুখে পড়েছে, আর প্রথমবারের মতো রাজ্য সরকার গঠনের পথে এগিয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টি, বিজেপি।
নির্বাচন কমিশনের হালনাগাদ ফলাফলে ২৯৪ আসনের বিধানসভায় বিজেপি ২০৬টি আসনে এগিয়ে বা জয়ী হয়েছে। অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেসের আসন দাঁড়িয়েছে ৮১টিতে। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ১৪৮ আসন, সেখানে বিজেপির অবস্থান অনেকটাই নিরাপদ।
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির আসন ছিল ৭৭। তার আগের নির্বাচনে দলটির অবস্থান ছিল আরও দুর্বল। এবার সেই অবস্থান থেকে সরাসরি ক্ষমতার দরজায় পৌঁছে যাওয়া শুধু একটি নির্বাচনী জয় নয়, বরং রাজ্যের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে যাওয়ার ইঙ্গিত। বিজেপির অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন ও নির্বাচনী প্রচারের ধরন বিশ্লেষণ করলে এই বড় জয়ের পেছনে পাঁচটি কারণ সামনে আসে।
প্রথম কারণ নারী ভোট। বিজেপি নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের নারী সংরক্ষণ বিলের উদ্যোগ নারী ভোটারদের মধ্যে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে বলে দলটির দাবি। প্রচারে বিজেপি বারবার তুলে ধরেছে, বিরোধীরা নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রশ্নে আন্তরিক নয়। পশ্চিমবঙ্গে নারী ও পুরুষ ভোটারের সংখ্যা প্রায় সমান হওয়ায় নারী ভোটের সামান্য পরিবর্তনও বহু আসনের ফল বদলে দিতে পারে। দলীয় হিসাব অনুযায়ী, বিজেপির পক্ষে নারী ভোট অন্তত ৫ শতাংশ বেড়েছে। এই বাড়তি সমর্থন কয়েকটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনে বড় ব্যবধান তৈরি করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
দ্বিতীয় কারণ সরকারি কর্মচারী ও চাকরিপ্রার্থীদের ক্ষোভ। পশ্চিমবঙ্গে সরকারি চাকরি, বেতন কাঠামো, শূন্যপদ ও নিয়োগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ ছিল। বিজেপি সেই ক্ষোভকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগিয়েছে। ক্ষমতায় এলে ৪৫ দিনের মধ্যে সপ্তম বেতন কমিশন কার্যকর এবং শূন্যপদ পূরণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দলটি। সরকারি কর্মচারী, অবসরপ্রাপ্ত কর্মী, চাকরিপ্রার্থী ও তাদের পরিবার মিলিয়ে বড় একটি ভোটব্যাংকের ওপর এর প্রভাব পড়েছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। রাজ্যে সার্ভিস ভোটারের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য, যা এই ইস্যুকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করেছে।
তৃতীয় কারণ কেন্দ্রীয় উন্নয়নকে সামনে রেখে প্রচার। বিজেপি পুরো নির্বাচনী লড়াইকে অনেকাংশে ‘মোদি বনাম মমতা’ কাঠামোয় নিয়ে যায়। কেন্দ্রীয় প্রকল্প বাস্তবায়নে বাধা, অবকাঠামোর ঘাটতি, কর্মসংস্থান ও নগর উন্নয়নের প্রশ্নে তৃণমূল সরকারকে আক্রমণ করে দলটি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একাধিক জনসভা, কেন্দ্রীয় প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি এবং তরুণ ভোটারদের লক্ষ্য করে সোশ্যাল মিডিয়া প্রচার বিজেপির পক্ষে পরিবেশ তৈরি করে। ২০ থেকে ২৯ বছর বয়সী বিপুলসংখ্যক ভোটার এবং নতুন ভোটারদের কাছে পরিবর্তনের বার্তা পৌঁছে দিতে বিজেপি সংগঠিত প্রচারণা চালায়।
চতুর্থ কারণ নিরাপত্তা, কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন ও সরকারবিরোধী ক্ষোভ। পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক সহিংসতা দীর্ঘদিনের আলোচিত বিষয়। নির্বাচন ঘিরে কেন্দ্রীয় বাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতি অনেক ভোটারের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ তৈরি করেছে বলে বিজেপির দাবি। পাশাপাশি আরজি কর ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডসহ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বিজেপি তৃণমূল সরকারকে চাপে রাখে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ প্রচারে এই ইস্যুগুলো বারবার সামনে আনেন। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের মাঠপর্যায়ের সংগঠিত প্রচারও বিজেপির ভোটসংগ্রহে ভূমিকা রেখেছে বলে দলীয় সূত্রের দাবি।
পঞ্চম কারণ ভোটার তালিকা সংশোধন ও বহিরাগত ইস্যু। ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্ক এই নির্বাচনে বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে ওঠে। বিজেপি দাবি করে, ভুয়া ও বহিরাগত ভোটারদের উপস্থিতি রাজ্যের নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করছিল। নির্বাচন-পূর্ব তালিকা সংশোধনে ২৭ লাখের বেশি নাম বাদ পড়ার বিষয়টি নিয়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হলেও বিজেপি এটিকে ‘স্বচ্ছ ভোটার তালিকা’র দাবি হিসেবে প্রচার করে। বিরোধীরা এ নিয়ে আপত্তি তুললেও বিজেপির সমর্থকরা এটিকে সুষ্ঠু নির্বাচনের পূর্বশর্ত হিসেবে দেখেছে।
এই ফল পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। তৃণমূল কংগ্রেসের দীর্ঘ শাসনের পর বিজেপির এমন উত্থান শুধু রাজ্যের ক্ষমতার পালাবদল নয়, জাতীয় রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেবে। তবে নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত ফর্ম-২০ প্রকাশের পর আসনভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ ফল আরও স্পষ্ট হবে।