{{ news.section.title }}
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সমঝোতা ভেস্তে দিতে চায় ইসরায়েল: এরদোয়ান
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) ভেস্তে দিতে ইসরায়েল সক্রিয়ভাবে চেষ্টা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার এই সুযোগ নষ্ট করতে দেওয়া যাবে না এবং ‘যুদ্ধপিপাসু’ ইসরায়েলি সরকারকে আবারও পুরো অঞ্চলকে সংঘাতের দিকে ঠেলে দেওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত নয়।
শনিবার (৪ জুলাই) ইস্তাম্বুলে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের উপস্থিতিতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে এরদোয়ান বলেন, তুরস্ক খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করছে কীভাবে ইসরায়েলি প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া সমঝোতাকে নস্যাৎ করার চেষ্টা করছে। তাঁর ভাষায়, ‘বর্তমান ইসরায়েলি সরকার যুদ্ধে আসক্ত। তাদের আমাদের ভূখণ্ডকে আবারও বারুদ, রক্ত ও অস্থিরতার মধ্যে ঠেলে দেওয়ার সুযোগ দেওয়া যাবে না।’
এরদোয়ান বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠা তখনই সম্ভব হবে, যখন আঞ্চলিক দেশগুলো নিজেরাই সেই প্রক্রিয়ার নেতৃত্ব দেবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বাইরের শক্তির ওপর নির্ভর করে নয়, বরং তুরস্ক, পাকিস্তান, কাতার এবং অঞ্চলের অন্যান্য দেশের সমন্বিত উদ্যোগেই স্থায়ী সমাধান সম্ভব। তাঁর মতে, আঞ্চলিক বাস্তবতা উপেক্ষা করে কোনো শান্তি উদ্যোগ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।
তুর্কি প্রেসিডেন্ট অভিযোগ করেন, ইসরায়েল কেবল ইরানের সঙ্গে হওয়া সমঝোতাই নয়, গাজা, লেবানন ও সিরিয়াকে ঘিরেও উত্তেজনা বাড়িয়ে চলেছে। তাঁর দাবি, সামরিক অভিযান ও ধারাবাহিক হামলার মাধ্যমে ইসরায়েল এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করতে চাইছে, যাতে কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ব্যর্থ হয়ে আবারও যুদ্ধ শুরু হয়।
এরদোয়ান এর আগেও একাধিকবার অভিযোগ করেছিলেন, ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান কূটনৈতিক আলোচনা ব্যাহত করা। তাঁর মতে, আলোচনার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপের আগে কিংবা চলাকালে সংঘাত বাড়ানোর প্রবণতা প্রমাণ করে যে, ইসরায়েলের একটি অংশ কূটনৈতিক সমাধানের পরিবর্তে সামরিক উত্তেজনাকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
সম্প্রতি কাতারের মধ্যস্থতায় এবং পাকিস্তানের কূটনৈতিক সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। ওই সমঝোতার আওতায় ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি, হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক নৌচলাচল পুনরায় চালু, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পরবর্তী আলোচনা এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর বিষয়ে উভয় পক্ষ নীতিগতভাবে সম্মত হয়। আন্তর্জাতিক মহল এই সমঝোতাকে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত কমানোর গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে স্বাগত জানায়।
তবে সমঝোতা স্বাক্ষরের পরও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। গত সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি ও উপসাগরীয় অঞ্চলে একাধিক নিরাপত্তা ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আবারও পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটে। এর ফলে যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ছোট পরিসরের সামরিক সংঘর্ষও চলমান কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
এরদোয়ান বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের জনগণ বহু বছর ধরে যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি ও মানবিক সংকটের ভার বহন করছে। তাই নতুন করে কোনো সংঘাতের পরিবর্তে কূটনীতি ও সংলাপের পথেই এগোতে হবে। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, যারা শান্তি চায়, তাদের উচিত চলমান আলোচনাকে সমর্থন করা এবং যেকোনো ধরনের উসকানিমূলক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফও আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় সংলাপের গুরুত্ব তুলে ধরেন। দুই নেতা তুরস্ক-পাকিস্তান সম্পর্ক আরও জোরদার করার পাশাপাশি জ্বালানি, প্রতিরক্ষা, পরিবহন, তথ্যপ্রযুক্তি এবং বাণিজ্য খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে একমত হন। উভয় দেশ আগামী বছরগুলোতে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এরদোয়ানের এই বক্তব্য শুধু ইসরায়েলের সমালোচনা নয়; বরং মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে তুরস্কের অবস্থানও স্পষ্ট করেছে। ন্যাটোর সদস্য হওয়া সত্ত্বেও আঙ্কারা একদিকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখছে, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগও অব্যাহত রেখেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনায় তুরস্ক ভবিষ্যতেও একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক ভূমিকা পালন করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।