{{ news.section.title }}
খামেনির জানাজায় ৭০টির বেশি দেশের প্রতিনিধি, হরমুজ প্রণালিতে বন্ধুরাষ্ট্রদের ছাড় দেবে ইরান
ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির রাষ্ট্রীয় শোক ও দাফন অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণকে কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে তুলে ধরেছে তেহরান। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, ৭০টির বেশি দেশের প্রতিনিধি খামেনির প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ইরানে এসেছেন। তাঁর ভাষায়, এই উপস্থিতি শুধু শোক প্রকাশ নয়, বরং ইরানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ইতিহাসে একটি ‘চিরস্থায়ী স্মৃতি’ হয়ে থাকবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে আরাগচি বলেন, খামেনির প্রতি সম্মান জানাতে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রতিনিধি দল তেহরানে এসেছে। তিনি বিশেষভাবে আরব দেশগুলোর প্রতিনিধিদের উপস্থিতির কথা উল্লেখ করে বলেন, কঠিন সময়ে বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর এই সংহতি ইরানি জনগণের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর মতে, এই সফরগুলো ভবিষ্যতে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদার করতে সহায়ক হবে।
তেহরানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় অনুষ্ঠিত দাফন অনুষ্ঠানে দেশটির শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সামরিক কর্মকর্তা, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব এবং হাজার হাজার সাধারণ মানুষ অংশ নেন। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বিদেশি প্রতিনিধি দলগুলোর জন্যও বিশেষ প্রটোকল অনুসরণ করা হয় বলে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, সাম্প্রতিক আঞ্চলিক সংঘাত এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এতগুলো দেশের প্রতিনিধির উপস্থিতিকে তেহরান কূটনৈতিক সমর্থনের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার কয়েকটি দেশের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণকে ইরান ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখছে।
এদিকে চীনে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত আবদুর রেজা রহমানি ফাজলি জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালি ব্যবহারকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর জন্য নতুন সার্ভিস ফি চালুর পরিকল্পনা করছে তেহরান। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এটি কোনো টোল বা রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের ব্যবস্থা নয়; বরং নিরাপদ নৌ-চলাচল, পরিবেশ সুরক্ষা এবং সামুদ্রিক ব্যবস্থাপনার ব্যয় মেটানোর জন্য একটি প্রশাসনিক উদ্যোগ।
বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড পিস ফোরামে বক্তব্য দিতে গিয়ে রাষ্ট্রদূত বলেন, হরমুজ প্রণালির একটি বড় অংশ ইরানের জলসীমার মধ্যে অবস্থিত। ফলে সেখানে নৌ-নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, জাহাজ চলাচল তদারকি এবং সামুদ্রিক পরিবেশ রক্ষার দায়িত্বও ইরানের ওপর বর্তায়। তিনি বলেন, বিপুলসংখ্যক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ফলে পরিবেশগত চাপ বাড়ছে এবং সেই বাস্তবতা বিবেচনায় নতুন ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।
রাষ্ট্রদূত আরও জানান, চলমান সংকটের সময় যেসব দেশ ইরানের পাশে থেকেছে, ভবিষ্যতে সার্ভিস ফি কার্যকর হলে তাদের জন্য বিশেষ সুবিধা বা ছাড় দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। তাঁর ভাষায়, ‘কঠিন সময়ে যারা বন্ধু হিসেবে পাশে দাঁড়িয়েছে, তাদের প্রতি ইরান কৃতজ্ঞ থাকবে।’
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র নতুন সার্ভিস ফি আরোপের সম্ভাবনার বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে। ওয়াশিংটনের অবস্থান হলো, হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক নৌপথ এবং সেখানে জাহাজ চলাচল আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় অবাধ থাকা উচিত। যদিও এ বিষয়ে ইরান এখন পর্যন্ত নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসার কোনো ইঙ্গিত দেয়নি।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত প্রাথমিক সমঝোতা অনুযায়ী, প্রথম ৬০ দিন হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অতিরিক্ত ফি নেওয়া হবে না। তবে ওই সময়সীমা শেষ হওয়ার পর কী ধরনের নীতিমালা কার্যকর হবে, সে বিষয়ে এখনও আনুষ্ঠানিক কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রকাশ করা হয়নি।
রাষ্ট্রদূত ফাজলি বলেন, নতুন ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়নে ওমানের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে ইরান। দুই দেশ নিরাপদ নৌ-চলাচল, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়ে যৌথ কাঠামো তৈরির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছে। তাঁর মতে, আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমেই হরমুজ প্রণালির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহন করা হয়। ফলে এ জলপথে যেকোনো নীতিগত পরিবর্তন বা নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, শিপিং খাত এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে খামেনির দাফন অনুষ্ঠানে বিদেশি প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণকে ইরান কূটনৈতিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরছে, অন্যদিকে হরমুজ প্রণালি ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন অবস্থান জানিয়ে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি রাজনীতিতে নিজেদের প্রভাব আরও সুসংহত করার চেষ্টা করছে। তবে সার্ভিস ফি কার্যকর হবে কি না, কীভাবে বাস্তবায়ন হবে এবং আন্তর্জাতিক মহল সেটিকে কীভাবে গ্রহণ করবে-তা এখনো অনেকটাই অনিশ্চিত।