ইসরাইল প্রকাশ করল শীর্ষ ১০ ‘ইহুদিবিদ্বেষী’ প্রভাবশালীর তালিকা

ইসরাইল প্রকাশ করল শীর্ষ ১০ ‘ইহুদিবিদ্বেষী’ প্রভাবশালীর তালিকা
ছবির ক্যাপশান, ইসরাইল প্রকাশ করল শীর্ষ ১০ ‘ইহুদিবিদ্বেষী’ প্রভাবশালীর তালিকা

ইসরাইলের ডায়াসপোরা অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড কমব্যাটিং অ্যান্টিসেমিটিজম মন্ত্রণালয় ২০২৫ সালের জন্য বিশ্বের শীর্ষ ১০ ‘ইহুদিবিদ্বেষী ও জায়নবাদবিরোধী’ প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকা প্রকাশ করেছে। মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, তালিকায় এমন ব্যক্তিদের রাখা হয়েছে, যাদের আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক বা সরকারি পদ নেই, কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও জনপরিসরে বড় অনুসারীভিত্তি থাকায় তারা জনমত প্রভাবিত করতে সক্ষম।

ইসরাইলি গণমাধ্যম ওয়াইনেট জানিয়েছে, হলোকাস্ট স্মরণ দিবসের আগে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বৈশ্বিক ইহুদিবিদ্বেষ বৃদ্ধির দাবি করে এই তালিকা দেওয়া হয়েছে।

 

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডের ‘তীব্রতা’ এবং তাদের প্রভাবের পরিধি বিবেচনা করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের দাবি, তালিকাভুক্ত ব্যক্তিরা ইহুদি, ইসরাইল বা উভয়কে ঘিরে ইহুদিবিদ্বেষী বক্তব্য, ষড়যন্ত্রতত্ত্ব বা ভুল তথ্য ছড়িয়েছেন। তবে সমালোচকদের অভিযোগ, এই তালিকায় ইসরাইলি নীতির সমালোচনা এবং প্রকৃত ইহুদিবিদ্বেষকে একসঙ্গে দেখানোর প্রবণতা রয়েছে। ওয়াইনেটের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তালিকায় গ্রেটা থানবার্গ, টাকার কার্লসন, নিক ফুয়েন্তেস ও ক্যান্ডাস ওয়েন্সের নাম রয়েছে।

 

তালিকার শীর্ষে রয়েছেন মার্কিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ড্যান বিলজেরিয়ান। দ্বিতীয় স্থানে রাখা হয়েছে সুইডিশ জলবায়ু আন্দোলনকর্মী গ্রেটা থানবার্গকে। ইসরাইলি মন্ত্রণালয়ের দাবি, গ্রেটা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরাইলবিরোধী প্রচারণার একটি গুরুত্বপূর্ণ মুখে পরিণত হয়েছেন এবং গাজা যুদ্ধ নিয়ে ‘genocide’, ‘siege’ ও ‘mass starvation’ ধরনের শব্দ ব্যবহার করেছেন। তবে এসব শব্দ ব্যবহারকেই ইহুদিবিদ্বেষের প্রমাণ হিসেবে দেখানো নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কুইন্সি ইনস্টিটিউটের Responsible Statecraft লিখেছে, ইসরাইলি প্রতিবেদনে অনেক ক্ষেত্রে ‘anti-Israeli’ ও ‘antisemitic’ শব্দ একসঙ্গে বা কাছাকাছি অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে।

 

তালিকায় মার্কিন ব্যক্তিত্বদের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি। আরটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১০ জনের মধ্যে ৬ জনই যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক। এর মধ্যে রয়েছেন রক্ষণশীল সাংবাদিক টাকার কার্লসন, মন্তব্যকারি ক্যান্ডাস ওয়েন্স এবং অতি-ডানপন্থী কর্মী নিক ফুয়েন্তেস। ব্রিটিশ-ফিলিস্তিনি সাংবাদিক আবদেল বারি আতওয়ানও তালিকায় পঞ্চম স্থানে রয়েছেন বলে আরটি জানিয়েছে।

 

তালিকায় থাকা আবদেল বারি আতওয়ান এই প্রতিবেদনের কঠোর সমালোচনা করেছেন। আরটিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ইসরাইলি সরকার রাষ্ট্রীয় নীতির সমালোচনা এবং ইহুদিবিদ্বেষকে এক করে ফেলছে। তার ভাষায়, “আমরা লেবানন, ইরান, ইয়েমেন ও গাজার বিরুদ্ধে ইসরাইলি যুদ্ধের বিরোধী।” তিনি আরও বলেন, “ইসরাইল সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। তাই ইসরাইলের সমালোচনা করলেই কাউকে ইহুদিবিদ্বেষী বলা খুবই ভীতিকর।”

 

এই তালিকা প্রকাশ এমন এক সময়ে হলো, যখন যুক্তরাষ্ট্রে ইসরাইল সম্পর্কে জনমত দ্রুত বদলে যাচ্ছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২০২৬ সালের মার্চের জরিপ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ৬০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক এখন ইসরাইল সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেন, যা আগের বছরের ৫৩ শতাংশের তুলনায় বেশি। একই জরিপে দেখা গেছে, ৫৯ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর আন্তর্জাতিক বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতার ওপর কম বা কোনো আস্থা রাখেন না। জরিপটি ২৩ থেকে ২৯ মার্চ ৩ হাজার ৫০৭ জন মার্কিন প্রাপ্তবয়স্কের ওপর পরিচালিত হয়।

 

পিউর তথ্য অনুযায়ী, ইসরাইলের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব বিশেষভাবে তরুণদের মধ্যে বেশি। ডেমোক্র্যাট ও ডেমোক্র্যাট-ঘেঁষা ভোটারদের মধ্যে ৮০ শতাংশের ইসরাইল সম্পর্কে বিরূপ ধারণা রয়েছে। রিপাবলিকানদের মধ্যে এখনো বেশি মানুষ ইসরাইলকে ইতিবাচকভাবে দেখলেও ১৮ থেকে ৪৯ বছর বয়সী রিপাবলিকানদের ৫৭ শতাংশ ইসরাইল সম্পর্কে নেতিবাচক মত দিয়েছেন। ফলে ইসরাইলের এই তালিকাকে শুধু ইহুদিবিদ্বেষবিরোধী পদক্ষেপ হিসেবে নয়, বরং দ্রুত বদলে যাওয়া আন্তর্জাতিক ও মার্কিন জনমতের প্রেক্ষাপটেও দেখা হচ্ছে।

 

বিশ্লেষকদের মতে, ইসরাইলি সরকারের এই পদক্ষেপ জনমত নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা কি না, তা নিয়ে বিতর্ক থাকবে। কারণ একদিকে প্রকৃত ইহুদিবিদ্বেষ মোকাবিলা একটি গুরুতর ও বৈধ উদ্বেগ, অন্যদিকে গাজা, লেবানন, ইরান বা ফিলিস্তিনি অধিকার নিয়ে ইসরাইলি নীতির সমালোচনাকে একই শ্রেণিতে ফেলা হলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। Responsible Statecraft-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের আলাদা এক প্রতিবেদনে ইসরাইলি রাজনীতিক ও গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে ইহুদিবিদ্বেষের সংজ্ঞা অতিরিক্তভাবে বিস্তৃত করার অভিযোগও তোলা হয়েছে।

সূত্র: ওয়াইনেট নিউজ


সম্পর্কিত নিউজ