বাংলাদেশি জাহাজকে হরমুজ প্রণালি পার হতে দিচ্ছে না কেন ইরান?

বাংলাদেশি জাহাজকে হরমুজ প্রণালি পার হতে দিচ্ছে না কেন ইরান?
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনার প্রভাব এবার সরাসরি পড়েছে বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজ ‘বাংলার জয়যাত্রার’ ওপর। ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কোরের অনুমতি না পাওয়ায় জাহাজটি হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে পারছে না। কয়েক দফা চেষ্টা করেও অনুমতি না মেলায় জাহাজটি বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি বন্দরের কাছাকাছি অবস্থান করছে বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান রোববার রাতে তুরস্কে এক বৈঠকে ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ খাতিবজাদহর কাছে বিষয়টি তুলে ধরেন। বৈঠকে তিনি বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজটির হরমুজ প্রণালি নিরাপদে পার হওয়ার বিষয়ে ইরানের সহায়তা চান। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, আন্তালিয়া ডিপ্লোম্যাসি ফোরামের ফাঁকে এই বৈঠক হয় এবং সেখানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, হরমুজ পার হওয়ার অনুমতি পাওয়া ছয় দেশের মধ্যে বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করায় ঢাকা ইরানের প্রতি কৃতজ্ঞ ছিল।

 

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে খোঁজ নেন এবং ইরানের যথাযথ কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার কথা জানান। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই নেতা এ বিষয়ে যোগাযোগ অব্যাহত রাখার বিষয়ে একমত হয়েছেন। এর আগে ৫ এপ্রিল ঢাকায় ইরানের রাষ্ট্রদূত জালিল রাহিমী জাহানাবাদীর সঙ্গেও বৈঠক করেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ওই বৈঠকেও ‘বাংলার জয়যাত্রা’ এবং বাংলাদেশগামী আরেকটি অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজের নিরাপদ পারাপারে সহায়তা চাওয়া হয়।

 

জাহাজটি বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের মালিকানাধীন। তবে এটি সিঙ্গাপুরভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান ভাড়ায় নিয়ে পরিচালনা করছে। জাহাজটির নাবিকরা সবাই বাংলাদেশি। এটি প্রায় ৩৭ হাজার টন সার নিয়ে হরমুজ প্রণালি পার হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউন ও ডারবানে যাওয়ার কথা ছিল। আপনার দেওয়া তথ্যে উল্লেখ আছে, দুই দফা চেষ্টা করেও ইরানি নৌবাহিনী ও আইআরজিসির অনুমতি না পাওয়ায় জাহাজটি পার হতে পারেনি।

 

এর আগে ইরান ঘোষণা দিয়েছিল, বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশের জাহাজ হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করতে পারবে। গত ১ এপ্রিল ঢাকায় ইরানের রাষ্ট্রদূতও বাংলাদেশি জাহাজকে সহায়তার আশ্বাস দেন। কিন্তু বাস্তবে ‘বাংলার জয়যাত্রা’ হরমুজের দিকে রওনা হলেও অনুমতি না পেয়ে ফিরে আসে। ডেইলি সানের প্রতিবেদনে জাহাজটির চিফ ইঞ্জিনিয়ার রাশেদুল হাসান বলেন, ইরানের ঘোষণার পর জাহাজটি নোঙর তুলে যাত্রা শুরু করেছিল, কিন্তু আইআরজিসির অনুমতি না মেলায় ফিরে যেতে হয়।

 

প্রথম আলোর ইংরেজি সংস্করণও জানিয়েছে, শুক্রবার রাতে বাংলাদেশ সময় ১১টা ৫০ মিনিটে জাহাজটি পারস্য উপসাগর থেকে হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশ করে এবং রাত ৩টার দিকে প্রণালি অতিক্রম করার কথা ছিল। কিন্তু ইরানি বাহিনীর নির্দেশে জাহাজটি ফিরে যায়। বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক বলেন, ইরানের অনুমতি না পাওয়ায় জাহাজটি আগের অবস্থানে ফিরে যাচ্ছে।

 

এই সংকটের সঙ্গে আঞ্চলিক কূটনীতির জটিলতাও যুক্ত হয়েছে। ঢাকার কূটনৈতিক সূত্রগুলোর ধারণা, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল হামলা এবং আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর বাংলাদেশের সরকারি বিবৃতি নিয়ে তেহরানের অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। আপনার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় ইরানের রাষ্ট্রদূত জালিল রাহিমী জাহানাবাদী প্রকাশ্যে বলেছেন, বাংলাদেশের বিবৃতিতে তেহরান সন্তুষ্ট নয়। তিনি মনে করেন, জাতিসংঘ ও ওআইসির সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ ইরানে আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে আরও স্পষ্ট অবস্থান নিতে পারত।

 

বাংলাদেশ সরকার ১ মার্চ এক বিবৃতিতে ইরানের পাল্টা হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের নিন্দা জানায়। তবে ওই বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইলের নাম উল্লেখ করা হয়নি এবং ইরানে হামলার বিষয়েও সরাসরি নিন্দা ছিল না। পরে সমালোচনার মুখে ২ মার্চ আরেকটি বিবৃতি দিয়ে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন উল্লেখ করে ইরানের জনগণের প্রতি শোক প্রকাশ করে ঢাকা। এই অবস্থান নিয়েই তেহরানের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো মনে করছে।

 

হরমুজ প্রণালি বৈশ্বিক জ্বালানি ও বাণিজ্য পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। সাম্প্রতিক যুদ্ধ ও নৌ অবরোধের কারণে ইরান এই জলপথে জাহাজ চলাচলে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। একই কারণে ক্যামেন আইল্যান্ডের পতাকাবাহী আরেকটি জাহাজ, যা সৌদি আরবের জুয়াইমাহ টার্মিনাল থেকে অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড ওয়েল নিয়ে চট্টগ্রামে আসার কথা ছিল, সেটিও ইরানের অনুমতি না পাওয়ায় বাংলাদেশে আসতে পারেনি বলে জানা গেছে।

 

বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি শুধু একটি জাহাজ আটকে পড়ার ঘটনা নয়; এটি জ্বালানি, আমদানি-রপ্তানি, নৌনিরাপত্তা এবং কূটনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত বড় সংকেত। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের জলপথে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে তার প্রভাব পণ্য পরিবহন, জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক শিপিং ব্যয়ের ওপর পড়তে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ঘিরে অনিশ্চয়তা বাড়লে বাংলাদেশগামী তেলবাহী জাহাজগুলোও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

 

তবে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন এখনো আশাবাদী। বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক বলেছেন, কূটনৈতিক চ্যানেলে জোর তৎপরতা চলছে এবং দ্রুতই জাহাজটি হরমুজ পার হওয়ার অনুমতি পাবে বলে তারা আশা করছেন।

সূত্র: বিবিসি বাংলা


সম্পর্কিত নিউজ