{{ news.section.title }}
তেলের দাম ১৪০ ডলারে তুলতে চায় ইরান, জানালেন গালিবাফ
ইরানের তেল রপ্তানি ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ কার্যকর হচ্ছে-ওয়াশিংটনের এমন দাবি নাকচ করে দিয়েছেন দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের বক্তব্যকে ব্যঙ্গ করে তিনি বলেছেন, তিন দিন পেরিয়ে গেলেও ইরানের কোনো তেলকূপ বিস্ফোরিত হয়নি। বরং অবরোধের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দামই বেড়ে ১২০ ডলারের ওপরে উঠেছে। তার ভাষায়, পরবর্তী লক্ষ্য ১৪০ ডলার।
বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে গালিবাফ বলেন, “তিন দিন হয়ে গেছে, কোনো কূপ বিস্ফোরিত হয়নি। চাইলে আমরা এটি ৩০ দিন পর্যন্ত বাড়াতে পারি এবং এখান থেকে কূপটির লাইভস্ট্রিম করতে পারি।” তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন বেসেন্টের মতো ব্যক্তিদের কাছ থেকে “বাজে পরামর্শ” পাচ্ছে, যারা অবরোধের তত্ত্ব ছড়াচ্ছেন এবং এর ফলে তেলের দাম ১২০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে। গালিবাফের পোস্টে আরও লেখা ছিল, “পরবর্তী লক্ষ্য ১৪০। সমস্যাটা তত্ত্বে নয়, মানসিকতায়।” আল জাজিরার লাইভ আপডেটেও গালিবাফের এই মন্তব্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
গালিবাফের এই প্রতিক্রিয়া আসে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্যের পর। গত রোববার ফক্স নিউজে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প দাবি করেন, মার্কিন অবরোধের কারণে ইরানের তেল রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেলে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়ে দেশটির তেল পাইপলাইন ও ভূগর্ভস্থ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তিনি বলেন, ইরানের হাতে হয়তো “প্রায় তিন দিন” সময় আছে, এরপর তেল অবকাঠামোয় বিস্ফোরণের মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালও ট্রাম্পের এই মন্তব্য নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি কী
ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি হলো, ইরানের বন্দর ও তেল রপ্তানি রুটে চাপ বাড়ালে তেহরানের আয় কমবে এবং দেশটি আলোচনায় ফিরতে বাধ্য হবে। রয়টার্স জানিয়েছে, মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসে শেভরনসহ বড় জ্বালানি কোম্পানির নির্বাহীদের সঙ্গে বৈঠক করেন ট্রাম্প। বৈঠকে ইরানের ওপর সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি অবরোধ, বৈশ্বিক তেলবাজার, দেশীয় উৎপাদন, প্রাকৃতিক গ্যাস, তেলের আগাম বাজার ও জাহাজ চলাচল নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট, চিফ অব স্টাফ সুজি ওয়াইলস, বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার উপস্থিত ছিলেন বলে রয়টার্স জানায়।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অবরোধ দীর্ঘ হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে-এমন আশঙ্কায় ট্রাম্প প্রশাসন মার্কিন ভোক্তাদের ওপর চাপ কমানোর পথ খুঁজছে। যুক্তরাষ্ট্র দেশীয় জ্বালানি উৎপাদন বাড়ানো, কৌশলগত রিজার্ভ থেকে তেল ছাড়ার মতো পদক্ষেপ এবং রিফাইনারি-সংক্রান্ত নীতিতে ছাড় দেওয়ার বিষয়ও বিবেচনা করছে। তবে এসব সত্ত্বেও ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৫ ডলারের ওপরে অবস্থান করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তেলের বাজারে কেন অস্থিরতা
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কেন্দ্রে আছে হরমুজ প্রণালি। বৈশ্বিক তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের বড় অংশ এই পথ দিয়ে যায়। ফলে প্রণালিতে সামরিক উত্তেজনা, জাহাজ চলাচলে বাধা, বন্দর অবরোধ বা হামলার আশঙ্কা থাকলেই বাজারে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
দ্য গার্ডিয়ানের বাজার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প ইরানের বন্দর অবরোধ বজায় রাখার ঘোষণা দেওয়ার পর তেলের দাম ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি ওঠে। ব্রেন্ট ক্রুড ১২০ ডলারের দিকে এগিয়ে যায় এবং আর্থিক বাজারে উদ্বেগ তৈরি হয়। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, হরমুজ প্রণালিতে টানা অস্থিরতা শুধু জ্বালানির দাম নয়, বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে।
আরো পড়ুন : বিশ্ববাজারে তেলের দাম ১২০ ডলার, যুদ্ধ শুরুর পর সর্বোচ্চ
অন্যদিকে, মার্কিন প্রশাসনের দাবি-অবরোধ ইরানের অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করছে। নিউইয়র্ক পোস্টের প্রতিবেদনে ট্রাম্পের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, তিনি মনে করেন অবরোধ বোমা হামলার চেয়েও কার্যকর হতে পারে এবং ইরান পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি ছাড়ার আগ পর্যন্ত এই চাপ বজায় থাকবে। একই প্রতিবেদনে ইরানের খার্গ দ্বীপের গুরুত্বও উল্লেখ করা হয়েছে, ইরানের তেল রপ্তানির বড় অংশ এই রপ্তানি কেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল।
গালিবাফের পাল্টা বার্তা
গালিবাফের বক্তব্যে দুটি বার্তা স্পষ্ট। প্রথমত, তিনি দেখাতে চেয়েছেন যে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধে ইরানের তেল অবকাঠামো ভেঙে পড়ছে-এমন দাবি অতিরঞ্জিত। দ্বিতীয়ত, তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, অবরোধ দীর্ঘ হলে ক্ষতি শুধু ইরানের নয়, বিশ্ববাজারেও তেলের দাম বাড়বে এবং পশ্চিমা ভোক্তারাও এর চাপ অনুভব করবে।
ইরানের স্পিকার হিসেবে গালিবাফ শুধু রাজনৈতিক ব্যক্তি নন, তিনি ইরানের নিরাপত্তা ও রাষ্ট্র কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবশালী মুখ। ব্রিটানিকার প্রোফাইলে বলা হয়েছে, তিনি ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং এর আগে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের বিমানবাহিনীর কমান্ডার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রধান ও তেহরানের মেয়র ছিলেন।
তার এই মন্তব্য তাই শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতিক্রিয়া নয়, এটি তেহরানের রাজনৈতিক অবস্থানেরও প্রতিফলন। ইরান বোঝাতে চাইছে, যুক্তরাষ্ট্র যত বেশি অবরোধ চাপাবে, বিশ্ববাজারে তেলের দাম তত বাড়বে-এতে ইরান নয়, বরং আমদানিনির্ভর দেশ ও পশ্চিমা ভোক্তারাই বড় চাপের মুখে পড়বে।
ওয়াশিংটনের কৌশল: সামরিক হামলার বদলে অর্থনৈতিক চাপ
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের ওপর সরাসরি সামরিক চাপের পাশাপাশি অর্থনৈতিক অবরোধকে বড় কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের বন্দর অবরোধ দীর্ঘায়িত করার প্রস্তুতি নিতে ট্রাম্প তার সহযোগীদের নির্দেশ দিয়েছেন। প্রশাসনের হিসাব, সরাসরি হামলা আবার শুরু করলে সংঘাত আরও ছড়াতে পারে, আবার দ্রুত পিছু হটলে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল দেখাতে পারে। তাই অবরোধ বজায় রেখে ইরানের তেল রপ্তানি ও অর্থনীতিতে চাপ বাড়ানোকে আপাতত কার্যকর পথ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে এই কৌশলের বড় ঝুঁকি হলো জ্বালানি বাজার। যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের তেল রপ্তানি দীর্ঘ সময় আটকে রাখে এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিরাপদ না থাকে, তাহলে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম আরও বাড়তে পারে। গালিবাফের “পরবর্তী লক্ষ্য ১৪০” মন্তব্য সেই আশঙ্কাকেই রাজনৈতিক ভাষায় সামনে এনেছে।
বাজার ও ভূরাজনীতির দ্বিমুখী চাপ
তেলের দাম ১২০ ডলারের ওপরে ওঠা শুধু ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের প্রশ্ন নয়, এটি বিশ্ব অর্থনীতির জন্যও বড় ঝুঁকি। জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়ে, শিল্প উৎপাদন খরচ বাড়ে, খাদ্যপণ্য ও সার বাজারে চাপ তৈরি হয় এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তার জীবনযাত্রার খরচ বাড়ে।
এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও পরিস্থিতি জটিল। একদিকে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের ওপর “সর্বোচ্চ চাপ” বজায় রাখতে চাইছে, অন্যদিকে মার্কিন ভোটারদের কাছে গ্যাসোলিনের দাম রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চ তেলের দাম মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য উদ্বেগ তৈরি করছে।
গালিবাফের ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের নতুন রাজনৈতিক মাত্রা তুলে ধরেছে। ওয়াশিংটন বলছে, অবরোধ ইরানের তেল রপ্তানি ও অবকাঠামোর ওপর চাপ তৈরি করছে। তেহরান বলছে, সেই চাপের গল্প অতিরঞ্জিত; বরং অবরোধের ফলেই বিশ্ববাজারে তেলের দাম ১২০ ডলার ছাড়িয়েছে এবং ১৪০ ডলারের ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে।