কাতার ও ইসরায়েলকে প্যাট্রিয়টসহ ৫০০ কোটি ডলারের উন্নত অস্ত্রশস্ত্র দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

কাতার ও ইসরায়েলকে প্যাট্রিয়টসহ ৫০০ কোটি ডলারের উন্নত অস্ত্রশস্ত্র দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র
ছবির ক্যাপশান, কাতারের কাছে ৪০০ কোটি ডলারের প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রি করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র | ছবি: এএফপি

ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনা ও মধ্যপ্রাচ্যে ভঙ্গুর নিরাপত্তা পরিস্থিতির মধ্যে কাতার, ইসরায়েলসহ আঞ্চলিক মিত্রদের কাছে ৮৬০ কোটি ডলারের বেশি সামরিক সরঞ্জাম বিক্রির অনুমোদন দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। শুক্রবার মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এই সামরিক বিক্রির বিষয়ে কংগ্রেসকে অবহিত করে। অনুমোদিত প্যাকেজের মধ্যে কাতারের জন্য ৪ দশমিক ০১ বিলিয়ন ডলারের প্যাট্রিয়ট আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পুনঃসরবরাহ সেবা এবং ইসরায়েলের জন্য প্রায় ৯৯২ দশমিক ৪ মিলিয়ন ডলারের নির্ভুল লক্ষ্যভেদী অস্ত্রব্যবস্থা রয়েছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু কাতার ও ইসরায়েল নয়; একই দিনে কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের জন্যও অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। কুয়েতকে ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের Integrated Battle Command System বা সমন্বিত যুদ্ধ কমান্ড ব্যবস্থা দেওয়ার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাতের জন্যও উন্নত নির্ভুল লক্ষ্যভেদী অস্ত্র অনুমোদনের কথা জানানো হয়েছে। সব মিলিয়ে এই সামরিক বিক্রি ৮ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি।

 

কাতারের জন্য প্যাট্রিয়ট, ইসরায়েলের জন্য প্রিসিশন অস্ত্র

কাতারের জন্য অনুমোদিত ৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের প্যাট্রিয়ট প্যাকেজ মূলত আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা সক্ষমতা পুনরায় শক্তিশালী করার জন্য। প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থা সাধারণত শত্রুপক্ষের বিমান, ক্রুজ মিসাইল ও ব্যালিস্টিক মিসাইল ঠেকাতে ব্যবহৃত হয়। উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরান-সংক্রান্ত উত্তেজনা, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঝুঁকি এবং মার্কিন ঘাঁটি সুরক্ষার বিবেচনায় কাতারের জন্য এ ধরনের ব্যবস্থা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কাতারে যুক্তরাষ্ট্রের আল-উদেইদ বিমানঘাঁটি রয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক কার্যক্রমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

 

ইসরায়েলের জন্য অনুমোদিত অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে Advanced Precision Kill Weapon System বা APKWS। এনডিটিভি ও ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের জন্য সর্বোচ্চ ১০ হাজার APKWS-II All-Up Rounds অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যার মূল্য প্রায় ৯৯২ দশমিক ৪ মিলিয়ন ডলার। এই অস্ত্রব্যবস্থা মূলত সাধারণ রকেটকে লেজার-নির্দেশিত নির্ভুল অস্ত্রে রূপান্তর করতে ব্যবহৃত হয়। এর প্রধান ঠিকাদার হিসেবে BAE Systems-এর নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

 

কেন এখন এই অস্ত্র বিক্রি

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব অস্ত্র বিক্রি যুক্তরাষ্ট্রের “পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা” লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করবে। ওয়াশিংটন বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানো আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য জরুরি। তবে সময়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী সামরিক অভিযান শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে উত্তেজনা বেড়েছে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও সেটি ভঙ্গুর, আর ইরান, হরমুজ প্রণালি, উপসাগরীয় ঘাঁটি ও আকাশ প্রতিরক্ষাকে ঘিরে নতুন নিরাপত্তা বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।

 

রয়টার্স জানিয়েছে, এই অস্ত্র অনুমোদন এমন সময়ে হলো, যখন ইরানের সঙ্গে সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র মজুত, মিত্রদের প্রতিরক্ষা চাহিদা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা কৌশলকে নতুন চাপের মুখে ফেলেছে। বিশেষ করে ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও নির্ভুল হামলার অস্ত্রের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন মিত্ররা আকাশ প্রতিরক্ষা ও দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল অস্ত্রব্যবস্থার দিকে বেশি ঝুঁকছে।

 

কংগ্রেসকে অবহিত করা হয়েছে, তবে বিতর্ক থাকবে

মার্কিন আইনে বড় অঙ্কের বিদেশি সামরিক বিক্রির ক্ষেত্রে সাধারণত কংগ্রেসকে অবহিত করা হয়। আইনপ্রণেতারা চাইলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আপত্তি তুলতে পারেন। তবে রয়টার্স জানিয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের জন্য ৮ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের সামরিক বিক্রির ক্ষেত্রে প্রচলিত কংগ্রেসীয় পর্যালোচনা প্রক্রিয়া পাশ কাটিয়েছে বা দ্রুততর জরুরি পথ ব্যবহার করেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও চলমান ইরান যুদ্ধ ও মার্কিন-ইসরায়েলি সামরিক কার্যক্রমের জরুরি পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করেছেন।

 

এ ধরনের পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি করতে পারে। কারণ ইসরায়েলের কাছে অস্ত্র বিক্রি গাজা যুদ্ধ ও মানবাধিকার ইস্যুতে আগেই সমালোচনার মুখে রয়েছে। একই সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়েও মার্কিন কংগ্রেসে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন ওঠে। তবে ট্রাম্প প্রশাসন বলছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে মিত্রদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোই প্রধান অগ্রাধিকার।

 

প্যাট্রিয়ট কেন কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ

প্যাট্রিয়ট হলো যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এটি বহু বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও এশিয়ায় মার্কিন ও মিত্র বাহিনীর প্রতিরক্ষায় ব্যবহৃত হচ্ছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে প্যাট্রিয়টের বৈশ্বিক চাহিদা আরও বেড়েছে। রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, Lockheed Martin প্যাট্রিয়ট PAC-3 ইন্টারসেপ্টর উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে, কারণ মিত্র দেশগুলোর চাহিদা দ্রুত বাড়ছে।

 

কাতারের ক্ষেত্রে প্যাট্রিয়ট পুনঃসরবরাহ সেবা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটি, জ্বালানি অবকাঠামো এবং বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরান-সংক্রান্ত যেকোনো সংঘাতে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। কাতার নিজেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে উন্নত সামরিক সরঞ্জাম কেনার আগ্রহ দেখিয়েছে। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র কাতারের কাছে প্রায় ১ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলারের MQ-9B ড্রোন বিক্রির প্রাথমিক অনুমোদন দেয়।

 

ইসরায়েলের জন্য অস্ত্র সহায়তা অব্যাহত

ইসরায়েলের কাছে নতুন করে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের প্রিসিশন অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন ওয়াশিংটনের ধারাবাহিক সামরিক সহায়তার অংশ। এর আগেও ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের জন্য ৬ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি সম্ভাব্য সামরিক বিক্রির অনুমোদন দেয়। তখন তিনটি আলাদা চুক্তির আওতায় ইসরায়েলের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছিল।

 

নতুন অনুমোদিত APKWS ধরনের অস্ত্র তুলনামূলকভাবে ছোট লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে নির্ভুল হামলায় ব্যবহৃত হতে পারে। লেজার-নির্দেশিত হওয়ায় এগুলো প্রচলিত রকেটের তুলনায় বেশি নির্ভুল। তবে মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে দাবি করে আসছে, ইসরায়েলের কাছে অস্ত্র বিক্রির ক্ষেত্রে বেসামরিক হতাহতের ঝুঁকি ও আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের প্রশ্ন বিবেচনা করা উচিত।

 

আঞ্চলিক বার্তা

এই অস্ত্র অনুমোদনের মাধ্যমে ওয়াশিংটন মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের কাছে দুটি বার্তা দিতে চাইছে। প্রথমত, ইরানকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনার মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্র তাদের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি ধরে রাখছে। দ্বিতীয়ত, আকাশ প্রতিরক্ষা, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ও নির্ভুল হামলার সক্ষমতা বাড়িয়ে আঞ্চলিক মিত্রদের ইরানের চাপ মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে।

 

তবে এই সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্যে অস্ত্র প্রতিযোগিতাকে আরও বাড়াতে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে। ইরান এই পদক্ষেপকে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী নীতি হিসেবে দেখাতে পারে। অন্যদিকে কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইসরায়েলের মতো দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার ওপর আরও নির্ভরশীল হয়ে পড়বে।

 

ইরান উত্তেজনার মধ্যেই কাতার, ইসরায়েল, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের জন্য ৮৬০ কোটি ডলারের বেশি অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশলের নতুন ইঙ্গিত দিচ্ছে। কাতার প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা সহায়তা পাচ্ছে, ইসরায়েল পাচ্ছে নির্ভুল লক্ষ্যভেদী অস্ত্র, আর কুয়েত পাচ্ছে সমন্বিত যুদ্ধ কমান্ড ব্যবস্থা। ওয়াশিংটন বলছে, এটি মিত্রদের নিরাপত্তা জোরদারের পদক্ষেপ। তবে সমালোচকদের মতে, যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে নতুন অস্ত্র ঢালার ফলে উত্তেজনা আরও বাড়ার ঝুঁকিও থেকে যাচ্ছে।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স


সম্পর্কিত নিউজ