{{ news.section.title }}
হিজবুল্লাহর নতুন অস্ত্র 'ফাইবার-অপটিক' ড্রোন
লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি সেনা ও সাঁজোয়া যান লক্ষ্য করে নতুন ধরনের ছোট ড্রোনের ব্যবহার বাড়িয়েছে হিজবুল্লাহ। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা বলছেন, এগুলো সাধারণ ড্রোন নয়; এগুলো ফাইবার-অপটিক কেব্ল দিয়ে নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরকবাহী FPV ড্রোন। আকারে ছোট, খরচে কম এবং ইলেকট্রনিক জ্যামিংয়ে অকেজো করা যায় না-এই তিন বৈশিষ্ট্যের কারণে এগুলো ইসরায়েলি বাহিনীর জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, হিজবুল্লাহ সাম্প্রতিক সংঘাতে উত্তর ইসরায়েল ও দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি সেনাদের বিরুদ্ধে এ ধরনের ড্রোন ব্যবহার শুরু করেছে।
ফাইবার-অপটিক ড্রোনের সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো, এগুলো সাধারণ রেডিও সিগন্যাল বা জিপিএসের ওপর নির্ভর করে না। ড্রোনটির পেছনে অত্যন্ত চিকন ফাইবার-অপটিক কেব্ল খুলতে থাকে, যা সরাসরি অপারেটরের কনসোলের সঙ্গে যুক্ত থাকে। ফলে ড্রোন থেকে পাঠানো ভিডিও এবং অপারেটরের নির্দেশনা কেব্লের মাধ্যমেই আদান-প্রদান হয়। এ কারণে প্রচলিত ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার বা সিগন্যাল জ্যামিং প্রযুক্তি দিয়ে এগুলো থামানো প্রায় অসম্ভব। এপি ও ওয়াশিংটন পোস্টের এপি-ভিত্তিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই কেব্ল অনেকটা ডেন্টাল ফ্লসের মতো চিকন এবং প্রায় অদৃশ্য হওয়ায় তা শনাক্ত করাও কঠিন।
ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে শেখা কৌশল
এই ড্রোন প্রযুক্তি নতুন হলেও যুদ্ধক্ষেত্রে এর ব্যাপক ব্যবহার প্রথম দেখা যায় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে। ইউক্রেন ও রাশিয়া উভয় পক্ষই ছোট FPV ড্রোনকে ট্যাংক, সাঁজোয়া যান, সেনা অবস্থান ও সরবরাহ লাইনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে। রেডিও-নিয়ন্ত্রিত ড্রোন জ্যামিংয়ে পড়ে গেলে বিকল্প হিসেবে ফাইবার-অপটিক ড্রোনের ব্যবহার বাড়ে। এখন সেই প্রযুক্তিই মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ করেছে বলে মনে করছেন সামরিক বিশ্লেষকেরা।
রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের ড্রোন বিশেষজ্ঞ রবার্ট টোলাস্ট এপিকে বলেছেন, দক্ষ অপারেটরের হাতে এই ড্রোন “অত্যন্ত প্রাণঘাতী” হতে পারে। কারণ এগুলো খুব নিচু দিয়ে উড়ে লক্ষ্যবস্তুর কাছে পৌঁছাতে পারে এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সেনারা অনেক সময় বুঝতেই পারেন না যে ড্রোনটি আসছে। কিছু ক্ষেত্রে ফাইবার-অপটিক কেব্ল ৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত দীর্ঘ হতে পারে বলে তিনি জানান।
ইসরায়েলি বাহিনীর ক্ষয়ক্ষতি
সাম্প্রতিক হামলাগুলোতে এই ড্রোনের কার্যকারিতা স্পষ্ট হয়েছে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ লেবাননের তাইবেহ এলাকায় বিস্ফোরকবাহী একটি ফাইবার-অপটিক ড্রোন ইসরায়েলি সাঁজোয়া ইউনিটে আঘাত হানে। এতে ইসরায়েলি সেনা ইদান ফুকস নিহত হন এবং আরও ছয়জন আহত হন বলে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ইয়েনেটের বরাত দিয়ে জানানো হয়। উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার পৌঁছানোর পর হিজবুল্লাহ আরও দুটি ড্রোন ছোড়ে, যার একটি হেলিকপ্টারের কাছাকাছি বিস্ফোরিত হয়।
টাইমস অব ইসরায়েল জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হিজবুল্লাহ কয়েকটি ভিডিও প্রকাশ করেছে, যেখানে ছোট FPV ড্রোনকে দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি ট্যাংক ও সামরিক যান লক্ষ্য করে আঘাত করতে দেখা যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব ড্রোনের কিছু ফাইবার-অপটিক কেব্ল দিয়ে পরিচালিত, ফলে সেগুলো ইলেকট্রনিক জ্যামিংয়ের বিরুদ্ধে কার্যত সুরক্ষিত।
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৬ এপ্রিলের এক হামলায় একজন ইসরায়েলি সেনা নিহত এবং ছয়জন আহত হওয়ার পর ২৮ এপ্রিলও হিজবুল্লাহ দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি সেনাদের লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালায়। যুদ্ধবিরতির পরও এই হামলা-পাল্টা হামলা ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ সীমান্ত পরিস্থিতিকে আবারও উত্তপ্ত করে তুলেছে।
কেন ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য কঠিন
ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মূলত রকেট, ক্ষেপণাস্ত্র, বড় ড্রোন ও দূরপাল্লার হামলা ঠেকাতে তৈরি। আয়রন ডোমের মতো ব্যবস্থা রকেট প্রতিরোধে কার্যকর হলেও ছোট, নিচু দিয়ে উড়া, স্বল্পপাল্লার FPV ড্রোন শনাক্ত করা ভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ। সাবেক ইসরায়েলি এয়ার ডিফেন্স কমান্ডার রান কোচাভ এপিকে বলেছেন, এই ড্রোনগুলো খুব ছোট, নিচু দিয়ে দ্রুত উড়ে এবং শনাক্ত হওয়ার পরও ট্র্যাক করা কঠিন। তার মতে, ইসরায়েল বহু বছর রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষায় জোর দিয়েছে, কিন্তু ছোট ড্রোনকে অগ্রাধিকার দেয়নি।
ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের বিশেষজ্ঞ আরিয়ে আভিরাম ডনকে বলেছেন, ফাইবার-অপটিক ড্রোন রেডিও সিগন্যাল পাঠায় না এবং রেডিও নির্দেশনাও নেয় না। ফলে ইলেকট্রনিক গোয়েন্দা সরঞ্জাম দিয়ে সেগুলোর সিগন্যাল ধরা যায় না এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধের মাধ্যমে ব্লকও করা যায় না। এতে সেনারা রাডার বা চোখে দেখার ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হন, যা অনেক সময় খুব দেরিতে কাজ করে।
খরচ কম, প্রভাব বড়
ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তাদের ধারণা, হিজবুল্লাহর এসব ড্রোন স্থানীয়ভাবে তৈরি হতে পারে। এগুলো বানাতে বাজারে পাওয়া বেসামরিক ড্রোন, অল্প পরিমাণ বিস্ফোরক এবং সহজলভ্য স্বচ্ছ ফাইবার-অপটিক তার লাগে। একজন ইসরায়েলি কর্মকর্তা এপিকে বলেছেন, প্রতিটি ড্রোনের খরচ প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ ডলারের মধ্যে হতে পারে। অর্থাৎ কয়েকশ ডলারের একটি ড্রোন দিয়ে লাখো ডলারের সামরিক যান, সেনা অবস্থান বা প্রতিরক্ষা সরঞ্জামে আঘাত করা সম্ভব হচ্ছে।
এই খরচ-সুবিধার ভারসাম্যই যুদ্ধক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন আনছে। হিজবুল্লাহর মতো গোষ্ঠীর জন্য এটি কার্যকর, কারণ খুব বেশি ব্যয় ছাড়াই তারা ইসরায়েলের উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারছে। একই সঙ্গে ড্রোন অপারেটররা লক্ষ্যবস্তুর ওপর সরাসরি ক্যামেরা ভিউ পায়, ফলে শেষ মুহূর্তে দিক পরিবর্তন করে আঘাত করার সুযোগ থাকে।
ইসরায়েলের পাল্টা ব্যবস্থা
ইসরায়েলি বাহিনী এখন এই নতুন হুমকির বিরুদ্ধে দ্রুত প্রতিরক্ষাব্যবস্থা খুঁজছে। এপি জানিয়েছে, সেনারা সাময়িকভাবে সাঁজোয়া যান ও সামরিক সরঞ্জামের ওপর জাল, খাঁচা বা protective cage বসাচ্ছে, যাতে ড্রোন সরাসরি আঘাত করতে না পারে। তবে এগুলো তাৎক্ষণিক মাঠপর্যায়ের সমাধান; দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তিগত প্রতিরক্ষা এখনো পুরোপুরি তৈরি হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের ড্রোন ঠেকাতে দুটি পথ আছে-ড্রোনটি লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছানোর আগেই শারীরিকভাবে ধ্বংস করা, অথবা প্রায় অদৃশ্য ফাইবার কেব্ল কেটে দেওয়া। কিন্তু ছোট আকার, নিচু উড্ডয়ন, দ্রুত গতি এবং স্বল্প সতর্কতার কারণে দুটি পদ্ধতিই কঠিন।
যুদ্ধবিরতির মধ্যেও উত্তেজনা
লেবানন সীমান্তে সংঘাত আবারও বাড়ছে। দ্য গার্ডিয়ানের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি হামলা এবং হিজবুল্লাহর পাল্টা হামলা চলছে। ইসরায়েল বলছে, হিজবুল্লাহ এখনও তাদের উত্তর সীমান্তের জন্য বড় হুমকি। অন্যদিকে হিজবুল্লাহ দাবি করছে, তারা দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি সেনা উপস্থিতি ও হামলার জবাব দিচ্ছে।
নিউইয়র্ক পোস্টের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হিজবুল্লাহ শনিবার দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি সেনাদের দিকে রকেট ও বিস্ফোরকবাহী ড্রোন ছোড়ে। এর জবাবে ইসরায়েল ৫০টির বেশি হিজবুল্লাহ স্থাপনায় বিমান হামলা চালায়। যুক্তরাষ্ট্রও ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের আহ্বান জানিয়েছে।
যুদ্ধের ধরনে নতুন বাস্তবতা
ফাইবার-অপটিক ড্রোনের ব্যবহার শুধু লেবানন সীমান্তের ঘটনা নয়; এটি আধুনিক যুদ্ধের নতুন বাস্তবতা তুলে ধরছে। আগে উন্নত প্রযুক্তি মানেই রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনীর একচেটিয়া সুবিধা ছিল। এখন বাজারে পাওয়া যন্ত্রাংশ, সস্তা ড্রোন, ক্যামেরা, বিস্ফোরক এবং ফাইবার-অপটিক কেব্ল দিয়েই অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো উন্নত সেনাবাহিনীকে চ্যালেঞ্জ করতে পারছে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হিজবুল্লাহর FPV ড্রোন হামলা ইসরায়েলি বাহিনীর জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে এবং ইসরায়েলের ভেতরে সামরিক প্রস্তুতি নিয়ে সমালোচনা বাড়ছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইসরায়েলি সেনারা লেবাননে নিজেদের যানবাহনে অস্থায়ী জাল বা নেটিং ব্যবহার করছে, কারণ কার্যকর প্রযুক্তিগত সমাধান এখনও পুরোপুরি পাওয়া যায়নি।
তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা