চীনে যাচ্ছেন আব্বাস আরাগচি - কূটনীতিতে নতুন বার্তা

চীনে যাচ্ছেন আব্বাস আরাগচি - কূটনীতিতে নতুন বার্তা
ছবির ক্যাপশান, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি | ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকা এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার আশঙ্কার মধ্যেই চীন সফরে যাচ্ছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সফরে তিনি চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করবেন।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও সফরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের ঘোষণায় বলা হয়েছে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যেদ আব্বাস আরাগচি আমন্ত্রণে ৬ মে চীন সফর করবেন। চীনা কমিউনিস্ট পার্টির পলিটব্যুরো সদস্য ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই তার সঙ্গে বৈঠক করবেন।

 

ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবির বরাতে আনাদোলু এজেন্সি জানিয়েছে, আরাগচি মঙ্গলবার বেইজিংয়ের উদ্দেশে রওনা দেবেন। তেহরানের ভাষ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে চলমান কূটনৈতিক পরামর্শের অংশ হিসেবেই এই সফর হচ্ছে। তবে সময়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ হরমুজ প্রণালি, মার্কিন নৌ অবরোধ, ইরানের পাল্টা অবস্থান এবং যুদ্ধবিরতি নিয়ে অনিশ্চয়তা এখন আঞ্চলিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে।

 

চীন ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক অংশীদার। বিশেষ করে জ্বালানি, বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ইস্যুতে বেইজিং দীর্ঘদিন ধরে তেহরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইরানি তেল কেনার অভিযোগে কয়েকটি চীনা কোম্পানির ওপর যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এর জবাবে বেইজিং মার্কিন নিষেধাজ্ঞাকে অন্য দেশের ওপর নিজেদের আইন চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা বলে সমালোচনা করেছে। তাই আরাগচির সফরে ইরানি তেল, নিষেধাজ্ঞা এবং বাণিজ্যিক লেনদেনের নিরাপত্তা নিয়েও আলোচনা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

 

সফরটি এমন সময়ে হচ্ছে, যখন হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা দ্রুত বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ বজায় রেখেছে। অন্যদিকে ইরান বলছে, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা তাদের নিয়ন্ত্রণে এবং বিদেশি সামরিক বাহিনী সেখানে প্রবেশের চেষ্টা করলে কঠোর জবাব দেওয়া হবে। চীনও এই সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতিসংঘে চীনের রাষ্ট্রদূত ফু কং ইরান যুদ্ধবিরতি ধরে রাখার জরুরি প্রয়োজনের কথা বলেছেন এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি ইরানকে জাহাজ চলাচলের ওপর কড়াকড়ি প্রত্যাহার এবং যুক্তরাষ্ট্রকে নৌ অবরোধ শেষ করার আহ্বান জানান।

 

চীনের এই অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ, কারণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ বা অচল থাকলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কা লাগে। বিশ্বের তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের উল্লেখযোগ্য অংশ এই পথ দিয়ে যায়। চীন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি আমদানিকারক দেশ হওয়ায় হরমুজে অচলাবস্থা বেইজিংয়ের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্যও বড় ঝুঁকি। ফলে আরাগচি-ওয়াং বৈঠকে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও জ্বালানি সরবরাহের বিষয়টি গুরুত্ব পেতে পারে।

 

এর আগে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গেও পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেছেন। টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৯ এপ্রিল দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ফোনালাপে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। অর্থাৎ তেহরান এখন বড় আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সক্রিয় কূটনৈতিক যোগাযোগ চালাচ্ছে।

 

বিশ্লেষকদের মতে, চীন সফরের মাধ্যমে ইরান কয়েকটি বার্তা দিতে চাইছে। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের চাপ সত্ত্বেও তেহরান আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন নয়। দ্বিতীয়ত, হরমুজ ও নিষেধাজ্ঞা ইস্যুতে চীনের মতো বড় শক্তির কূটনৈতিক সমর্থন পেতে চায় ইরান। তৃতীয়ত, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে পরোক্ষ আলোচনা চলছে, তার পাশাপাশি তেহরান বেইজিং, মস্কো, নয়াদিল্লি ও অন্যান্য প্রভাবশালী রাজধানীর সঙ্গে সমন্বয় বাড়াতে চাইছে।

 

অন্যদিকে বেইজিংয়ের জন্যও এই বৈঠক তাৎপর্যপূর্ণ। চীন নিজেকে মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা রক্ষার পক্ষে দায়িত্বশীল শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টানাপোড়েনের মধ্যেও বেইজিং চাইবে না হরমুজ সংকট দীর্ঘায়িত হয়ে তেলের দাম আরও বাড়িয়ে দিক। রয়টার্স জানিয়েছে, চলতি মাসের শেষ দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফরের কথা রয়েছে; তার আগে হরমুজ সংকট সমাধান না হলে বিষয়টি ওয়াশিংটন-বেইজিং আলোচনাতেও বড় ইস্যু হতে পারে।


সম্পর্কিত নিউজ