{{ news.section.title }}
পাসপোর্টে আবারও যুক্ত হচ্ছে ‘একসেপ্ট ইসরায়েল’
বাংলাদেশি পাসপোর্টে আবারও যুক্ত হচ্ছে ‘একসেপ্ট ইসরায়েল’ বা ‘ইসরায়েল ব্যতীত’ শব্দবন্ধ। সামনে যেসব নতুন পাসপোর্ট ইস্যু করা হবে, সেগুলোতে আগের মতোই এই শব্দবন্ধ থাকবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। একই সঙ্গে পাসপোর্টের ভিসা পেইজগুলোতে বাংলাদেশের জাতীয় ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, দর্শনীয় স্থান ও জনমানসের প্রতিচ্ছবি তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
রোববার (২৪ মে) সচিবালয়ে গণমাধ্যম কেন্দ্রে বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট রিপোর্টার্স ফোরাম-বিএসআরএফ আয়োজিত ‘বিএসআরএফ সংলাপ’-এ সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিএসআরএফ সভাপতি মাসউদুল হক। সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক উবায়দুল্লাহ বাদল। এ সময় প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদও উপস্থিত ছিলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সামনে যে পাসপোর্টগুলো ইস্যু করা হবে, সেখানে আগের মতোই ‘একসেপ্ট ইসরায়েল’ যুক্ত করা হবে। এটি সরকারের সিদ্ধান্ত এবং বাংলাদেশের গণমানুষের চাহিদার প্রতিফলন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
পাসপোর্টে কী লেখা ফিরতে পারে
বাংলাদেশি পাসপোর্টে আগে লেখা থাকত-“This passport is valid for all countries of the world except Israel.” অর্থাৎ এই পাসপোর্ট বিশ্বের সব দেশের জন্য বৈধ, ইসরায়েল ব্যতীত। ২০২১ সালে নতুন ই-পাসপোর্টে এই বাক্য থেকে ‘except Israel’ শব্দ দুটি বাদ দেওয়া হয়। তখন পাসপোর্টে লেখা হয়-“This passport is valid for all countries of the world.”
সে সময় পাসপোর্ট অধিদপ্তরের তৎকালীন মহাপরিচালক জানিয়েছিলেন, আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার যুক্তিতে নতুন ই-পাসপোর্টে ‘except Israel’ শব্দ দুটি বাদ দেওয়া হয়েছিল এবং এর সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের কোনো সম্পর্ক নেই।
তবে ওই সিদ্ধান্ত নিয়ে দেশে নানা আলোচনা তৈরি হয়। কারণ স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশ ফিলিস্তিনের পক্ষে এবং ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক না রাখার নীতি অনুসরণ করে আসছে। আনাদোলু এজেন্সির ২০২১ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশে ইসরায়েলি দূতাবাস নেই, দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক বাণিজ্য সম্পর্কও নেই, আর ঢাকায় ফিলিস্তিন দূতাবাস দীর্ঘদিন ধরে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
২০২৫ সালের নির্দেশনা, এবার পূর্ণ বাস্তবায়নের পথে
পাসপোর্টে ‘একসেপ্ট ইসরায়েল’ শব্দবন্ধ পুনর্বহালের উদ্যোগ নতুন নয়। ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ১৩ এপ্রিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপসচিব নিলিমা আফরোজ স্বাক্ষরিত এক নোটিশে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরকে আগের নিয়ম অনুযায়ী বাংলাদেশি পাসপোর্টে ‘except Israel’ clause পুনর্বহালের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছিল।
প্রথম আলোর ইংরেজি সংস্করণের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ৭ এপ্রিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি চিঠিতে পাসপোর্ট অধিদপ্তরকে আগের মতো ‘except Israel’ শব্দবন্ধ ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে সেই সিদ্ধান্ত মূলত কূটনৈতিক পাসপোর্টের বাইরে ব্যাপকভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। বর্তমান সরকার এখন সব শ্রেণির পাসপোর্টে এটি কার্যকর করার উদ্যোগ নিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন নির্দেশনার আলোকে ধাপে ধাপে নতুন ইস্যু করা পাসপোর্টে এই শব্দবন্ধ যুক্ত হবে। যাদের হাতে বর্তমানে বৈধ পাসপোর্ট আছে, তাদের তাৎক্ষণিকভাবে আলাদা কোনো জটিলতায় পড়তে হবে না; পাসপোর্টের মেয়াদ শেষে নবায়নের সময় তারা নতুন নকশার পাসপোর্ট পাবেন।
ভিসা পেইজে থাকবে বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি
শুধু ‘একসেপ্ট ইসরায়েল’ নয়, পাসপোর্টের ভিসা পেইজের নকশায়ও পরিবর্তন আনার কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, পাসপোর্টে এমন কিছু ছবি ধারণ করা হবে, যাতে বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি ও প্রতিনিধিত্ব ফুটে ওঠে। জাতীয় স্মৃতিসৌধ, টাঙ্গুয়ার হাওর, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতসহ দেশের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও দর্শনীয় স্থানগুলোকে নির্মোহভাবে উপস্থাপনের কথা বলেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, পাসপোর্টে কোনো দলীয় চিন্তা বা রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থাকবে না। জাতীয় বিষয়গুলোকে দলীয়করণ বা রাজনৈতিকভাবে উপস্থাপনের বাইরে রাখা হবে-এটি সরকারের অঙ্গীকার।
প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান ই-পাসপোর্টের প্রতিটি পেইজে বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনা ও প্রতীকের ওয়াটারমার্ক রয়েছে। নতুন নকশায় ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা ব্যক্তির নামে নামকরণ করা স্থাপনা ও প্রতিষ্ঠানের ছবি বাদ দিয়ে নতুন ছবি যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানিয়েছে।
মুদ্রাতেও বীরশ্রেষ্ঠদের ছবি আসতে পারে
সংলাপে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, ভবিষ্যতে মুদ্রায় বীরশ্রেষ্ঠদের ছবি দেখা যেতে পারে। তবে তিনি স্পষ্ট করেন, মুদ্রার বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় প্রতীক ও নকশায় জাতীয় বীর, ঐতিহ্য ও জনগণের সাংস্কৃতিক চেতনার প্রতিফলন ঘটানোর দিকেই সরকার মনোযোগ দিচ্ছে।
রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক তাৎপর্য
পাসপোর্টে ‘ইসরায়েল ব্যতীত’ শব্দবন্ধ ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্তকে শুধু একটি প্রশাসনিক পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকেরা। এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অবস্থান, ফিলিস্তিন ইস্যুতে জনমত এবং পাসপোর্টের প্রতীকী ভাষার সঙ্গে সম্পর্কিত। ২০২১ সালে শব্দবন্ধটি বাদ দেওয়া হলেও বাংলাদেশ সরকার সে সময়ও জানিয়েছিল, ইসরায়েল বিষয়ে দেশের অবস্থান পরিবর্তন হয়নি।
আনাদোলু এজেন্সির প্রতিবেদনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ মন্তব্য করেছিলেন, পাসপোর্ট থেকে শব্দ বাদ দেওয়া বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের নৈতিক অবস্থানকে বদলে দেবে না। তার মতে, বাংলাদেশ বরাবরই ফিলিস্তিনের পক্ষে অবস্থান জানিয়ে এসেছে।
বর্তমান সিদ্ধান্ত সেই পুরোনো অবস্থানের দৃশ্যমান প্রতিফলন হিসেবে দেখা যেতে পারে। তবে নতুন নকশা কবে থেকে পুরোপুরি কার্যকর হবে, সব ধরনের পাসপোর্টে একই সময়ে পরিবর্তন আসবে কি না এবং পাসপোর্ট অধিদপ্তর কীভাবে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সাজাবে-এসব বিষয়ে এখনো বিস্তারিত আনুষ্ঠানিক রোডম্যাপ প্রকাশ হয়নি।
বাংলাদেশি পাসপোর্টে ‘একসেপ্ট ইসরায়েল’ পুনর্বহাল এবং পাসপোর্টের ভিসা পেইজে জাতীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতিফলন যুক্ত করার উদ্যোগ পাসপোর্ট ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সরকার বলছে, নতুন নকশায় দলীয় বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক উপস্থাপনা নয়; বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক পরিচয়, ঐতিহ্য, দর্শনীয় স্থান ও সাংস্কৃতিক চেতনাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
নতুন পাসপোর্ট ইস্যু শুরু হলে পরিবর্তনটি ধাপে ধাপে নাগরিকদের হাতে পৌঁছাবে। আর বর্তমান পাসপোর্টধারীদের জন্য তাৎক্ষণিক কোনো আলাদা জটিলতা তৈরি হবে না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানানো হয়েছে।